জননিরাপত্তা যেকোনো রাষ্ট্র কিংবা সমাজের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। জননিরাপত্তা ও সামাজিক সুরক্ষার বিষয়ে এই সম্পাদকীয় স্তম্ভেই আমরা লিখেছি, জনগণের জীবন ও অধিকারের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং তাদের ভয়ের হাত থেকে মুক্ত রাখাই যেকোনো নির্বাচিত সরকারের প্রথম ও প্রধান কাজ। ২৬ জুলাই দেশ রূপান্তরে বলা হয়েছে, খুন ও ধর্ষণসহ ছিনতাই এবং ডাকাতির মতো অপরাধ নিয়ন্ত্রণে এবার আসছে পুলিশের ‘সেফ সিটি’ প্রকল্প। এর আওতায় ঢাকা মহানগর, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ জেলা নিয়ে ‘সেফ সিটি’ গঠনে কাজ করছে পুলিশ সদর দপ্তর। সরকারের উচ্চ মহল থেকেও দ্রুত এই প্রকল্প বাস্তবায়নের তাগিদ রয়েছে। এতে কিছু অত্যাধুনিক প্রযুক্তি যুক্ত হতে যাচ্ছে, যা অপরাধী শনাক্তে হবে সহায়ক এই ভাষ্য দায়িত্বশীলদের। আরও বলা হয়েছে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অপরাধী শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করতে সময়, অর্থ ও শ্রম সবই সাশ্রয় হবে।
আমরা এই উদ্যোগকে স্বাগত জানাই। তবে অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে পাশাপাশি এও স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, প্রকল্প গ্রহণ কিংবা প্রণয়নেই দায়িত্ব যেন শেষ হয়ে না যায়। আমাদের অভিজ্ঞতায় আছে, জনকল্যাণ-নিরাপত্তার স্বার্থে আইন প্রণয়ন করা হলেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে এর অপপ্রয়োগ হয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে আইনের কার্যকারিতাই দৃশ্যমান হয়নি। জার্মান কবি, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, দার্শনিক, বিজ্ঞানী, চিত্রশিল্পী, কূটনীতিবিদ ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা ইয়োহান ভল্ফগাং ফন গ্যোটে বলেছেন, ‘চিন্তা, পরিকল্পনা করা সহজ, কাজ কিংবা বাস্তবায়ন করা কঠিন। আর চিন্তা অনুযায়ী কাজ করা পৃথিবীর আরও কঠিন বিষয়।’ ইতিমধ্যে জনস্বার্থ অথবা জনকল্যাণে রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক অনেক সরকারের অনেক চিন্তা ও পরিকল্পনার ছক আমরা দেখেছি, কিন্তু বাস্তবে এর প্রতিফলন ঘটেনি কাক্সিক্ষত মাত্রায় এবং সুফলভোগী হতে পারেনি সাধারণ মানুষ। কাজেই আমরা মনে করি, যদি কার্যত ইতিবাচক প্রতিফলন না ঘটে তাহলে যে নামেই জননিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের প্রকল্প আসুক বা নেওয়া হোক তাতে কিছুই যাবে-আসবে না। মনে রাখতে হবে, বৃক্ষের পরিচয় ফলে।
জানা গেছে, এই প্রকল্পের আওতায় ঢাকাসহ সারা দেশে বাসাবাড়ি-অফিস-কারখানাসহ বিভিন্ন স্থানে কেউ আর ইচ্ছামতো সিসি ক্যামেরা লাগাতে পারবে না। সবাইকে পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশনা মেনে তা বসাতে হবে। কারণ এই প্রযুক্তিতে প্রথমে পুলিশের তালিকাভুক্ত অপরাধীদের যুক্ত করা হবে। তাদের অপরাধ অনুযায়ী ক্যাটাগরি করা হবে। প্রযুক্তি তাদের চলাফেরা নজরদারি করবে নিয়মিত। পুরো প্রক্রিয়াটা পুলিশ সদর দপ্তর থেকে মনিটরিং করা হবে। সন্দেহ নেই, পরিকল্পনাটি অত্যন্ত সুচারু কিন্তু এই বিষয়গুলো অয়োজনসর্বস্ব হয়ে না থাকলেই মঙ্গল। আমরা উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ করছি, অপরাধীরা কৌশল পাল্টে ফের নানাভাবে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। মহানগর-নগর-শহর এলাকায় তুলনামূলকভাবে অপরাধের হার বেশি। আমাদের স্মরণে আছে, এই সরকার, শাসনকালের শুরুতেই জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করেছে। আধুনিক ব্যবস্থাপনা তত্ত্বের দার্শনিক হিসেবে পরিচিত অস্ট্রিয়ান শিক্ষাবিদ পিটার ড্রাকার বলেছেন, ‘সঠিক কাজটি করার নাম কার্যকারিতা আর কাজটি সঠিকভাবে করার নাম দক্ষতা।’ আমরা সরকারের এ দুই-ই দেখতে চাই। আমরা মনে করি, নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সবার আগে জরুরি সরকার ও প্রশাসনের নির্মোহ-অনমনীয় অবস্থান। বাংলাদেশ পুলিশের অনেক অঙ্গীকারমূলক ঘোষণা রয়েছে। এর মধ্যে একটি হলো, ‘পুলিশ আপনার বন্ধু, নিরাপত্তার যেকোনো প্রয়োজনে পুলিশের সহায়তা নিন’। কিন্তু শুনতে অপ্রীতিকর হলেও অসত্য নয়, কোনো কোনো ক্ষেত্রে মানুষ থানা-পুলিশ প্রয়োজন সত্ত্বেও এড়িয়ে চলে। মানুষের এই দৃষ্টিভঙ্গির পেছনে বহুবিদ কারণ বিদ্যমান, যা সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল মহলের অজানা নয়।
আমরা এও মনে করি, আস্থার ভিত যদি মজবুত করা যায় তাহলে পুলিশ-জনতা মিলেই নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করার পথ সুগম হবে। ঢাকা মহানগর, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ জেলা নিয়ে ‘সেফ সিটি’র কার্য অভিজ্ঞতার আলোকে এর পরিসর বাড়ানোর বিষয়টিও আমলে রাখা বাঞ্ছনীয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করায় কোনো ছাড় দেওয়ার অবকাশ নেই। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী প্রতিটি বাহিনীর দায়িত্বশীলের দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা সমভাবেই গুরুত্বপূর্ণ।