রাষ্ট্র কি যথেষ্ট সতর্ক

বাংলাদেশ একটি নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে। দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের প্রত্যাশা এবং জনগণের প্রত্যক্ষ সমর্থনের মধ্য দিয়ে যে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সূচনা হয়েছে, তা স্বাভাবিকভাবেই দেশি-বিদেশি বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যখনই বাংলাদেশে জনগণের ভোটের শক্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং একটি জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক শক্তি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে, তখনই নানা ধরনের ষড়যন্ত্র, অপপ্রচার ও অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির আশঙ্কা সামনে এসেছে। এমন প্রেক্ষাপটে মনে করি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নিরাপত্তা আরও জোরদার করা প্রয়োজন। এই পরামর্শকে রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে নয়, বরং রাষ্ট্রের নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। কারণ প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা মানে কেবল একজন ব্যক্তির নিরাপত্তা নয়; বরং রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতা, গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা এবং জনগণের রায়ের সুরক্ষা।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে অতীতে ষড়যন্ত্র, রাজনৈতিক সহিংসতা এবং সাংবিধানিক সংকটের বহু দৃষ্টান্ত রয়েছে। তাই যেকোনো সম্ভাব্য ঝুঁকিকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো পেশাদার গোয়েন্দা তৎপরতা, আধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং সম্ভাব্য সব হুমকির নিরপেক্ষ মূল্যায়নের মাধ্যমে দেশের সাংবিধানিক নেতৃত্বকে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা প্রদান করা। একই সময়ে সদ্য সাবেক রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্কও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তার দায়িত্ব পালন, সিদ্ধান্ত এবং রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন ও সমালোচনা রয়েছে। এসব বিষয়ে মতপার্থক্য থাকতেই পারে, তবে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে অভিযোগের নিষ্পত্তি হওয়া উচিত সংবিধান, আইন এবং প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। বিচারহীন রাজনৈতিক প্রতিশোধ যেমন গ্রহণযোগ্য নয়, তেমনি আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নন এই নীতিই গণতন্ত্রের ভিত্তি।

প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সুসম্পর্ক অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার কখনোই কোনো বহিরাগত প্রভাবের কাছে সমর্পিত হতে পারে না। যদি বিদেশি হস্তক্ষেপ বা প্রভাবের বিষয়ে কোনো অভিযোগ ওঠে, তবে তা অবশ্যই নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই হওয়া উচিত। একই সঙ্গে প্রমাণ ছাড়া কোনো অভিযোগ নিশ্চিত সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করাও গণতান্ত্রিক মানদণ্ডের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কেবল একটি রাজনৈতিক দলের প্রধান নন; তিনি তার পিতা সাবেক রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমানের আধুনিক বাংলাদেশ গড়ার রূপকার। দল মত নির্বিশেষে সব মানুষের কাছে গণতন্ত্র পুনর্গঠন, রাষ্ট্র সংস্কার এবং একটি আধুনিক, জবাবদিহিমূলক বাংলাদেশের স্বপ্নের প্রতীক। দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রতিকূলতা, নির্বাসিত জীবন, ব্যক্তিগত ও পারিবারিক নানা চ্যালেঞ্জ এবং প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিবেশের মধ্য দিয়েও তিনি যে ধৈর্য, সহনশীলতা ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছেন, তা তার নেতৃত্বকে একটি স্বতন্ত্র উচ্চতায় নিয়ে গেছে। প্রতিহিংসার রাজনীতির পরিবর্তে তিনি বারবার প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্র, আইনের শাসন, সুশাসন এবং জনগণের ক্ষমতায়নের বিষয়গুলোকে সামনে এনেছেন। রাষ্ট্র পরিচালনায় তার অগ্রাধিকারগুলোর মধ্যে রয়েছে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান, প্রশাসনিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সুসংহত করা, অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন, প্রযুক্তিনির্ভর রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং জনগণের প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নীতিনির্ধারণ। তিনি এমন একটি বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন, যেখানে নাগরিকের অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং সুশাসন পরস্পরের পরিপূরক হবে। রাষ্ট্র সংস্কারের কর্মপরিকল্পনা, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, নির্বাচনী ব্যবস্থার উন্নয়ন, সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, স্থানীয় সরকারকে আরও কার্যকর করা এবং জনসেবাকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করার মতো উদ্যোগ সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক আশাবাদ সৃষ্টি করেছে। তিনি এমন একটি রাষ্ট্রকাঠামো নির্মাণের কথা চিন্তা করেন, যেখানে সরকারের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান জনগণের কাছে জবাবদিহি করবে এবং রাষ্ট্র পরিচালনার মূল ভিত্তি হবে স্বচ্ছতা, দক্ষতা ও ন্যায়বিচার।

বিশেষ করে তরুণ সমাজের প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গি উল্লেখযোগ্য। তিনি একটি দক্ষ, উদ্ভাবনী ও উদ্যোক্তাবান্ধব বাংলাদেশ গঠনের কথা বলেছেন, যেখানে শিক্ষা, গবেষণা, প্রযুক্তি, স্টার্টআপ, শিল্পায়ন এবং কর্মসংস্থানের মাধ্যমে যুবসমাজ দেশের উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হবে। একই সঙ্গে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে গুণগত উন্নয়ন, ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণ, কৃষি ও শিল্পের আধুনিকায়ন এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের মর্যাদা আরও সুদৃঢ় করার বিষয়েও তিনি গুরুত্বারোপ করেছেন। সাধারণ মানুষের দৃষ্টিতে তার অন্যতম শক্তি হলো সংকটময় পরিস্থিতিতেও ধৈর্য ধরে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা, দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রচিন্তা এবং প্রতিশোধের পরিবর্তে পুনর্গঠন ও সংস্কারের ওপর জোর দেওয়া। জনগণের বিশ্বাস- একটি কার্যকর, আধুনিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ বিনির্মাণে তার নেতৃত্ব ভবিষ্যতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করতে পারে। এ কারণেই তার নিরাপত্তা কেবল একজন রাজনৈতিক নেতার ব্যক্তিগত নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়; বরং রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা, গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা, জনগণের প্রত্যাশা এবং চলমান সংস্কার অভিযাত্রার নিরাপত্তার সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নীতিতে কোনো ধরনের আত্মতুষ্টির স্থান নেই। যারা গণতন্ত্র, স্থিতিশীলতা এবং জনগণের রায়কে দুর্বল করতে চায়, তারা সবসময়ই সুযোগের অপেক্ষায় থাকে। তাই সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর উচিত সম্ভাব্য সব ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক, নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক এবং যেকোনো ধরনের ষড়যন্ত্র মোকাবিলায় সর্বোচ্চ পেশাদারত্ব প্রদর্শন করা। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, কার্যকর প্রতিষ্ঠান এবং আইনের শাসনের ওপর। জাতীয় স্বার্থে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা, সাংবিধানিক নেতৃত্বের নিরাপত্তা এবং জনগণের রায়ের মর্যাদা রক্ষার প্রশ্নে কোনো আপসের সুযোগ নেই। ইতিহাস যেন আর কোনো অন্ধকার অধ্যায়ের পুনরাবৃত্তি না দেখে এই প্রত্যাশাই শান্তিপ্রিয়দের।

লেখক : শিক্ষক ও চেয়ারম্যান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কনস্টিটিউয়েন্ট কলেজ (গভর্নিং বডি)