আমলার জালবন্দি মহাকাশ গবেষণা

অ্যাগ্রো-ক্লাইম্যাটিক এনভায়রনমেন্টাল মনিটরিং প্রজেক্টের (এসিইএমপি) সফল সমাপ্তির জন্য ১৯৮৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নাসা থেকে ‘গ্রুপ অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড’ পায় স্পারসো। বাংলাদেশ মহাকাশ গবেষণা ও দূর অনুধাবন প্রতিষ্ঠান (স্পারসো) তাদের ওয়েবসাইটে দুটি অর্জনের কথা উল্লেখ করেছে। যার একটি হলো এই কৃষি ও জলবায়ু-সংক্রান্ত পরিবেশ পর্যবেক্ষণ গবেষণা। অন্যটি প্রতিষ্ঠানটির সাবেক চেয়ারম্যান ড. এ এম চৌধুরীর ১৯৯৮ সালের স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্তি। বিজ্ঞানে অসামান্য কৃতিত্বের জন্য তিনি এ পদক পান।

আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরুর প্রায় ৪৪ বছর অতিক্রম করেছে স্পারসো। অর্ধশতাব্দির কাছাকাছি বয়সের একটি প্রতিষ্ঠানের অর্জনের তালিকা এত ছোট কেন! এর মধ্যে একটি অর্জন প্রতিষ্ঠানটি দলগতভাবে করলেও অন্যটি এসেছে ড. এ এম চৌধুরীর একক কৃতিত্বে। চীন সফর শেষে দেশে ফিরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আকস্মিক স্পারসো পরিদর্শনে যান। প্রতিষ্ঠানের কেউ আগেভাগে প্রধানমন্ত্রীর এই পরিদর্শনের খবর জানতেন না। ফলে তাদের কোনো পূর্বপ্রস্তুতি ছিল না। খুব বেশি সময় প্রধানমন্ত্রী স্পারসোতে ছিলেন না। প্রতিষ্ঠানের কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, প্রধানমন্ত্রী তাদের বিভিন্ন গবেষণাগার ঘুরে দেখেছেন। বিভিন্ন বিষয়ে জানতে চেয়েছেন, তারা জবাব দিয়েছেন। তবে ভেতরের খবর হচ্ছে, এই আকস্মিক পরিদর্শনে প্রধানমন্ত্রী নাকি সন্তুষ্ট হতে পারেননি।

স্পারসোর অন্দরমহলে কান পাতলে শোনা যায় আমলাতন্ত্রই নাকি ধ্বংস করছে এই প্রতিষ্ঠানটিকে। বিজ্ঞানীদের কাজের ক্ষেত্র এই গবেষণা প্রতিষ্ঠানে ২০০৭ সালের পর থেকে ধারাবাহিকভাবে চেয়ারম্যান হিসেবে আমলাদের পাঠানো হচ্ছে। স্পারসোর কর্মকর্তারা বলছেন, চেয়ারম্যান হিসেবে মন্ত্রণালয় থেকে একজন অতিরিক্ত সচিবকে পাঠানো হয়। তিনি এসে গাড়িতে চড়েন, মিটিং করেন, ফাইলপত্রে সই করেন। তারপর একসময় বদলি হয়ে চলে যান। অথচ এই পদে বিজ্ঞানীদের নিয়োগ দেওয়া হলে তারা গবেষণায় জোর দিতেন। সেক্ষেত্রে হয়তো স্পারসো সঠিক পথে এগিয়ে যেত। ৫ বা ১০ বছর পর বাংলাদেশের মহাকাশ গবেষণা একটি জায়গায় হয়তো পৌঁছাতে পারত। এখন স্পারসোর সামনে তেমন কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্য নেই।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা অতিরিক্ত সচিব হওয়ার পর থেকেই ভাবতে শুরু করেন তার সচিব হওয়ার সময় ঘনিয়ে এসেছে। স্পারসোর চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেছেন এমন অনেকেই পরে সচিব হিসেবে দায়িত্বপালন করে চাকরি জীবন শেষ করেছেন। এসব চেয়ারম্যানের মধ্যে অনেকেই ছিলেন, যারা ছাত্রজীবনে বিজ্ঞান বিষয়ে পড়াশোনাও করেননি।

স্পারসোতে পরিদর্শনের সময় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান এবং অন্যদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়। তখন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, বিশেষায়িত এই প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে বিজ্ঞানীরা থাকলে এটি আরও সুচারুরূপে চলত।

স্পারসোর তিনজন বিজ্ঞানী দেশ রূপান্তরকে প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য নিশ্চিত করেছেন। তবে সরকারি চাকরি প্রবিধানমালার কথা উল্লেখ করে কেউ নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি। তারা প্রশ্ন তুলে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও তো বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান। সেখানকার উপাচার্য পদে যদি শিক্ষকের পরিবর্তে প্রশাসক বসানো হয়, তাহলে প্রতিষ্ঠানটি কি ভালোভাবে চলবে?

এই তিনজন বিজ্ঞানীই জানান, স্পারসোর প্রধান কাজই হচ্ছে নানা বিষয়ে গবেষণা। কেউ যদি এখানে এসে সত্যিই কাজ করতে চান, তাহলে বিষয়গুলো বুঝতে বুঝতেই এক-দেড় বছর সময় প্রয়োজন। আর এ সময়ের মধ্যেই তার আবার ফিরে যাওয়ার সময় হয়ে যায়। আর যারা করতে চান না, তাদের কথা তো আলাদা।

স্পারসো সূত্র বলছে, ২০০৭ সালের পর থেকে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যানের পদ চলে যায় আমলাদের দখলে। মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিবকে চেয়ারম্যান হিসেবে পাঠানো হয়। তারা নির্দিষ্ট সময় পার করে আবার মন্ত্রণালয়ে ফিরে যান। সেই ২০০৭ সালে স্পারসো এক বছরে চারজন চেয়ারম্যান পেয়েছিল। প্রতিষ্ঠার পর ১৯৮২ থেকে ২০২৬ পর্যন্ত সেখানে মোট ২৮ বার চেয়ারম্যান বদল হয়েছে। কোনো কোনো বছরে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেছেন দুজন ব্যক্তি। আবার ড. মুজিবুর রহমান হাওলাদারের মতো সমাজবিজ্ঞানের ছাত্র, মো. আব্দুস সামাদের মতো কৃষিবিজ্ঞানীকেও প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান হতে দেখা গেছে। অডিট ক্যাডারের বেগম শাহীন খান এনডিসি, সিভিল ইঞ্জিনিয়ার জিয়াউল হাসান এনডিসিকেও এই পদে দেখা গেছে। স্পারসোর কর্মকর্তারা বলছেন, বেতারে খবর পড়তেন যে মনোয়ারা বেগম, তিনিও একসময় এই প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান ছিলেন।

সূত্র বলছে, সামাজিক মাধ্যমে সমালোচনার জেরে স্পারসো থেকে এর আগে একজন চেয়ারম্যানকে সরিয়ে নেওয়া হয়। ভারত ২০২৩ সালের ২৩ আগস্ট চন্দ্র বিজয়ের ঘোষণা দেয়। তখন দেশের মানুষের দৃষ্টি যায় বাংলাদেশে মহাকাশ গবেষণার দিকে। আলোচিত হয় মো. আব্দুস সামাদের নাম। এই অতিরিক্ত সচিব পড়াশোনা করেছেন কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে। প্রশ্ন ওঠে, কৃষিবিজ্ঞানী কেন মহাকাশ গবেষণার হাল ধরে বসে আছেন। ওই বছর ২৬ অক্টোবর তাকে সরিয়ে নেওয়া হয় সচিবালয়ে। তড়িঘড়ি পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্র মো. রাশিদুল ইসলামকে স্পারসোর চেয়ারম্যানের পদে বসানো হয়। তিনিও একজন অতিরিক্ত সচিব। সেই আমলার হাতেই থেকে যায় স্পারসো।

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী চীন সফর করেছেন, সে দেশের জাতীয় মহাকাশ সংস্থা চায়না ন্যাশনাল স্পেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (সিএনএসএ) বর্তমান প্রশাসক শান ঝংদে একজন খ্যাতিমান যন্ত্রপ্রকৌশলী, গবেষক ও নীতিনির্ধারক। ২০২৫ সালে তিনি সংস্থাটির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি কর্মজীবনে চায়না একাডেমি অব মেশিনারি সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজিতে গবেষক ও শীর্ষ প্রশাসক হিসেবেও দায়িত্বপালন করেন। পরে নানজিং ইউনিভার্সিটি অব অ্যারোনটিক্স অ্যান্ড অ্যাস্ট্রোনটিক্সের প্রেসিডেন্ট এবং পার্টি সেক্রেটারি হন। তার গবেষণার মূল ক্ষেত্র উন্নত উৎপাদন প্রযুক্তি, ইন্টেলিজেন্ট ম্যানুফ্যাকচারিং এবং প্রিসিশন ইঞ্জিনিয়ারিং। সাম্প্রতিক সময়ে চীন মহাকাশ গবেষণায় বিশ্বকে চমকে দেওয়ার মতো সব অগ্রগতি দেখিয়েছে।

প্রতিবেশী দেশ ভারতের ইন্ডিয়ান স্পেস রিসার্চ অর্গানাইজেশনের (ইসরো) বর্তমান প্রধানের নাম ড. ভি. নারায়ণন। তিনি ২০২৫ সালের ১৩ জানুয়ারি ইসরোর চেয়ারম্যান, মহাকাশ দপ্তরের সচিব এবং স্পেস কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পান। ড. নারায়ণন একজন রকেট ও মহাকাশযান প্রপালশন বিশেষজ্ঞ। তিনি ১৯৮৪ সালে ইসরোতে যোগ দেন এবং দীর্ঘদিন ধরে ভারতের রকেট প্রযুক্তি উন্নয়নে কাজ করেছেন। ভারতও মহাকাশ গবেষণায় বিশেষ সাফল্য দেখিয়েছে।

এ সব বিষয়ে জানতে চাইলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এ এ মামুন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘একজন বিজ্ঞানীর যেমন স্পারসোর মতো প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসেবে থাকা উচিত, ঠিক একইভাবে তাকে স্বাধীনভাবে কাজ করার জন্য পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দও দেওয়া উচিত।’