যে আগুন থামাতে পারছে না কেউ, ইউরোপে বাড়ছে মৃত্যুভয়!

ইউরোপজুড়ে চরম আকার ধারণ করেছে দাবানল পরিস্থিতি। ফ্রান্সের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর বোর্দোর দিকে দাবানল ধেয়ে আসায় আজ সোমবার (২৭ জুলাই) এক জরুরি মন্ত্রিসভা বৈঠক ডেকেছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ।

বোর্দোর মেয়র থমাস কাজেনাভ জানিয়েছেন, নতুন করে শুরু হওয়া তাপদাহের কারণে আগুন নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টা আরও জটিল হয়ে পড়েছে। ভয়াবহ এই আগুন এখন বোর্দো শহর থেকে মাত্র ১৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছে। তবে প্রায় ৮ লাখ ৫০ হাজার বাসিন্দার এই শহরটি খালি করার মতো কোনো পরিকল্পনা আপাতত নেই বলে জানান তিনি।

গত এক সপ্তাহ ধরে পুরো ইউরোপজুড়ে বিশেষ করে ফ্রান্স এবং স্পেনে দাবানল ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে দুটি দেশ থেকে ইতিমধ্যে ৩ লাখ ৩০ হাজারের বেশি মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ গত শনিবার (২৫ জুলাই) এক বার্তায় বলেন, ফ্রান্স এই ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে নতুন করে সবকিছু ‘পুনর্নির্মাণ’ করবে এবং প্রয়োজন থাকা পর্যন্ত সরকার জনগণের পাশেই থাকবে।

বোর্দোর চারপাশের এলাকা থেকে ইতিমধ্যে হাজার হাজার মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন্ট নুনেজ জানান, বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত ‘প্রতিকূল’ এবং আগুন বেশ অনিয়মিতভাবে শহরের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। দেশটির আবহাওয়া পূর্বাভাষে সতর্ক করে বলা হয়েছে, মঙ্গলবার থেকে কিছু এলাকায় তাপমাত্রা চরম মাত্রায় পৌঁছে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত হতে পারে।

ফ্রান্সের ন্যাশনাল ফায়ারফাইটার্স ফেডারেশন (এফএনএসপিএফ) জানিয়েছে, দেশটির জিরোন্ডে অঞ্চলের প্রধান দাবানলটি এতটাই ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে যে, এটি একটি নজিরবিহীন ‘পাইরোকিউমুলোনিম্বাস’ বা দৈত্যাকার ‘ফায়ার থান্ডারস্টর্ম’ তৈরি করেছে। নিজস্ব বাতাস ও বজ্রপাতের মাধ্যমে এই আগুনের ঝড় আরও তীব্র হচ্ছে।

সংস্থার মুখপাত্র এরিক ব্রোকার্ডি বলেন, ‘আগুন কীভাবে ছড়াবে তা আমাদের জানা নেই, কারণ আগুনের গতিপথ প্রতিনিয়ত বদলাচ্ছে। সরাসরি গিয়ে এই আগুন নেভানো আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। এটি যেন এক ডেভিড বনাম গোলিয়াথের লড়াই।’

তিনি আরও যোগ করেন, এই আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে হয় অন্তত তিন দিন একটানা ‘মুষলধারে বৃষ্টি’ হতে হবে, নতুবা ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের কৌশল খাটিয়ে আগুনকে সাগরের মতো কোনো জায়গায় নিয়ে যেতে হবে যেখানে গিয়ে এটি নিজে থেকেই নিভে যাবে।

দাবানলে ফ্রান্সে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলেই পুড়ে গেছে প্রায় ৪২ হাজার হেক্টরের বেশি বনভূমি, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ফরাসি ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ বন উজাড়ের ঘটনা। বছরের শুরু থেকে হিসাব করলে পুরো দেশে এ পর্যন্ত প্রায় ৯৮ হাজার হেক্টর বনভূমি ছাই হয়ে গেছে। কেবল ফ্রান্সের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল থেকেই ২ লাখ ২০ হাজারের বেশি মানুষকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

স্পেনেও ভয়াবহ অবস্থা: দাবানলে পুড়েছে ৭৭ হাজার হেক্টর জমি

এদিকে ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা রবিবার (২৬ জুলাই) স্পেনের পূর্ব উপকূলীয় শহর ভ্যালেন্সিয়ার কাছে নতুন করে ছড়িয়ে পড়া একটি দাবানলের বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালাচ্ছেন। সেখানে প্রায় ১৫ হাজার মানুষ নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন।

ভ্যালেন্সিয়ায় কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিনিধি পিলার বার্নাবে জানান, আগুনের তীব্রতা অত্যন্ত মারাত্মক এবং আবহাওয়ার পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। আজ সোমবার প্রভাবিত এলাকা পরিদর্শন করার কথা রয়েছে স্পেনের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ফার্নান্দো গ্র্যান্ডে-মারলাস্কার। তিনি জানান, আগুন ধীরে ধীরে সামনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।

মাদ্রিদের পশ্চিমে অবস্থিত অ্যাভিলা প্রদেশের দুর্ঘটনাকবলিত এলাকা পরিদর্শনের সময় স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ সতর্ক করে বলেন, ‘সামনে অত্যন্ত কঠিন সময় আসছে।’ তিনি জরুরি ভিত্তিতে জলবায়ু সংকট মোকাবেলায় একটি বড় ধরনের সরকারি চুক্তির আহ্বান জানান।

রাজধানী মাদ্রিদের দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত ভিলামান্তা এলাকার একটি জরুরি আশ্রয়কেন্দ্র পরিদর্শনকালে স্পেনের রাজা ষষ্ঠ ফিলিপ জানান, এই দাবানল দেশের প্রাকৃতিক ঐতিহ্যের ‘অপূরণীয়’ ক্ষতি করেছে।

স্পেনের পরিবেশ পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রী সারা আগেসেন রোববার জানিয়েছেন, স্পেনে দাবানলে প্রায় ৭৭ হাজার হেক্টর এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি আরও জানান, অ্যাভিলা অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়া আগুনটি দেশটির সাম্প্রতিক ইতিহাসের বৃহত্তম দাবানল।

বাস্তুচ্যুত বাসিন্দাদের মধ্যে রয়েছেন ৫০ বছর বয়সী ওলগা কঙ্গাচা। মাদ্রিদের পশ্চিমে নিজের গ্রাম রোবলেডো দে চাভেলা থেকে অত্যন্ত তড়িঘড়ি করে তাকে পালিয়ে যেতে হয়েছে। ভিটেমাটি ছাড়ার নির্দেশ পাওয়ার সেই স্মৃতি মনে করে আতঙ্কিত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আমি আতঙ্কে জমে গিয়েছিলাম। কাঁদব নাকি কী করব বুঝতে পারছিলাম না। ওটা এমন একটা মুহূর্ত ছিল যখন আপনি নিজেকে চরম অসহায় বোধ করবেন।’ ওষুধ নিতে রবিবার অল্প সময়ের জন্য বাড়িতে ফিরে তিনি দেখেন, পুরো রাস্তাঘাট জনশূন্য হয়ে পড়েছে এবং তার ঘর ছাইয়ে ঢেকে গেছে।

কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রবল বাতাস মাদ্রিদের কাছের দাবানলগুলোকে দক্ষিণ দিকে ঠেলে দিচ্ছে এবং রাজধানী থেকে কিছুটা দূরে সরিয়ে নিচ্ছে। তবে আগুনের পথে থাকা আরও বেশ কয়েকটি গ্রাম খালি করতে বাধ্য করা হচ্ছে। বর্তমানে মাদ্রিদ ও অ্যাভিলা অঞ্চলের আশপাশের এলাকাগুলো থেকে ৯০০০-এরও বেশি মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

সূত্র: বিবিসি