আতঙ্কে ফিলিস্তিনিরা

পশ্চিম তীরে ভয়াবহ তাণ্ডব, ঘর-মসজিদে আগুন

অধ্যুষিত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি সেনাদের প্রত্যক্ষ মদদে উগ্র বসতি স্থাপনকারীরা ব্যাপক তাণ্ডব ও সংঘাত চালিয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি চার ফিলিস্তিনিকে হত্যার পর পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি ঘটেছে। সর্বশেষ ঘটনায় উগ্র বসতি স্থাপনকারীরা অন্তত দুটি মসজিদে আগুন দিয়েছে এবং বহু ফিলিস্তিনিকে তুলে নিয়ে আটক করে রেখেছে।

নাবলুসের নিকটবর্তী তাল শহরে উগ্র বসতি স্থাপনকারীদের অনুপ্রবেশের পর ইসরায়েলি বাহিনীর গুলিতে চার ফিলিস্তিনি নিহত হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে চরম উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ে। এই মুখোমুখি সংঘর্ষে দুই ইসরায়েলিও নিহত হয়েছে। ফলে গোটা পশ্চিম তীরজুড়ে চরম আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে।

ঘটনার শুরু গত শুক্রবারে (২৪ জুলাই)। ওই দিন প্রায় ৩০ জন উগ্র বসতি স্থাপনকারী বেআইনি হভাত গিলাদ বসতির পাশের তাল শহরে জোরপূর্বক প্রবেশ করে। তারা ফিলিস্তিনিদের দুটি বাড়িতে ঢোকার চেষ্টা করলে স্থানীয় বাসিন্দারা তাদের প্রতিরোধ করেন। এ সময় বসতি স্থাপনকারীরা এলোপাতাড়ি গুলি চালাতে শুরু করে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, একজন ফিলিস্তিনি পুরুষ এক উগ্র বসতি স্থাপনকারীর কাছ থেকে রাইফেল ছিনিয়ে নিয়ে তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালান। এরপরই ইসরায়েলি সেনারা ঘটনাস্থলে পৌঁছে ওই ফিলিস্তিনিকে গুলি করে হত্যা করে। পুরো ঘটনায় মোট চার ফিলিস্তিনি নিহত এবং চারজন মারাত্মকভাবে আহত হন। দুই ইসরায়েলি নিহত হওয়ার পর ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী পুরো অধ্যুষিত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন করেছে।

এদিকে দুই ইসরায়েলি হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার অঙ্গীকার করে দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু স্পষ্ট জানিয়েছেন, সশস্ত্র বাহিনী তথাকথিত ‘সন্ত্রাসীদের ঘাঁটিতে আরও বড় ধরনের অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।’

সাংবাদিকদের সামনে তিনি বলেন, ‘আমরা সেনাবাহিনীকে গ্রামগুলোতে প্রবেশ করা, বাড়িঘরে তল্লাশি চালানো, অস্ত্র বাজেয়াপ্ত করা এবং গণগ্রেপ্তার চালানোর স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছি।’

পবিত্র মসজিদে আগুন ও অবমাননা

নাবলুসের দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত কুসরা গ্রামের কাউন্সিল প্রধান আবদেল আজিম ওয়াদি জানান, রবিবারের (২৬ জুলাই) প্রথম প্রহরে উগ্র ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা একটি মসজিদে আগুন ধরিয়ে দেয়। হামলাকারীরা মসজিদের দেয়ালে হিব্রু ভাষায় ‘ইহুদীদের প্রতিশোধ’ এবং নিহত এক ইসরায়েলির নাম লিখে রেখে যায়।

ওয়াদি ফরাসি সংবাদসংস্থা রয়টার্সকে বলেন, ‘২০১১ সাল থেকেই এই গ্রামটি একের পর এক আক্রমণের শিকার হচ্ছে। তবে গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এই ধরনের হিংসাত্মক হামলার মাত্রা বহুগুণ বেড়ে গেছে।’

একইভাবে তুল কারেম শহরের দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত কুর গ্রামের কাছের আরেকটি মসজিদেও আগুন দেওয়ার চেষ্টা চালানো হয়।

গ্রাম কাউন্সিলের সদস্য ফরিদ জিয়াওসি জানান, ভোরে তিনজন উগ্র বসতি স্থাপনকারী মসজিদে আগুন লাগানোর চেষ্টা করেছিল। কিন্তু স্থানীয় মুসল্লিদের তৎপরতায় আগুন মূল প্রাঙ্গণে ছড়ানোর আগেই নিভিয়ে ফেলা সম্ভব হয়। জিয়াওসি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমাদের গ্রামে এটাই এ ধরনের প্রথম হামলা।’ হামলাকারীরা এই মসজিদের দেয়ালেও হিব্রু ভাষায় আক্রোশমূলক গ্রাফিতি একে যায়।

এছাড়া, উত্তর পশ্চিম তীরের নাবলুসের পূর্বে অবস্থিত বেইত ফুরিক শহরে উগ্র বসতি স্থাপনকারীদের একটি বাড়িতে আগুন দেওয়ার দৃশ্য এলাকার সিসিটিভি ক্যামেরায় বন্দি হয়েছে। ফিলিস্তিনিরা দ্রুত আগুন নিয়ন্ত্রণে আনায় বাড়িটি বড় ধরনের ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পায়।

ইসরায়েলি আর্মি রেডিওর তথ্যমতে, ২৪ জুলাইয়ের পর থেকে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডজুড়ে অন্তত ৩০টি বসতি স্থাপনকারী হামলার ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে।

সংবাদমাধ্যমটি দেশটির নিরাপত্তা তথ্যের বরাত দিয়ে জানায়, ২০২৬ সালের প্রথম অর্ধেকের মধ্যেই উগ্র বসতি স্থাপনকারীদের সহিংস হামলা ৬৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৫ সালের শেষভাগে যেখানে ৪০৫টি হামলার ঘটনা ঘটেছিল, সেখানে ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেই রেকর্ড ৬৬০টি সহিংসতার ঘটনা তালিকাভুক্ত হয়েছে।

আল জাজিরার প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ফিলিস্তিনিদের রাত কাটছে চরম আতঙ্কে ও নিঘুমভাবে। পুরো পশ্চিম তীরের মানুষের জীবন অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে। ফিলিস্তিনিরা একদম বিচ্ছিন্ন। আগুন নেভাতে অগ্নিনির্বাপক বাহিনীকে ডাকার উপায় নেই, নেই কোনো উদ্ধার বা সুরক্ষার সুযোগ। ফিলিস্তিনি পুলিশ বা বসতি স্থাপনকারীদের পাহারা দেওয়া ইসরায়েলি বাহিনী- কাউকেই তারা পাশে পাচ্ছে না। নিজেদের ঘরবাড়ি আর প্রিয়জনদের বাঁচাতে রাত জেগে পাহারা দেওয়া ছাড়া তাদের সামনে আর কোনো পথ খোলা নেই। তারা বুঝতে পেরেছে, এই পরিস্থিতিতে তারা একেবারেই একা।’

২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে অধ্যুষিত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বাহিনী ও বসতি স্থাপনকারীদের হামলায় অন্তত ১ হাজার ১৮৫ জন ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন, যার মধ্যে ২৫০ জনই শিশু। কেবল ২০২৬ সালেই এখন পর্যন্ত ৮৭ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ২১ জনকে সরাসরি উগ্র বসতি স্থাপনকারীরা হত্যা করেছে।

ফিলিস্তিনি প্রিজনার্স সোসাইটি জানিয়েছে, চলমান অভিযানে বহু প্রাক্তন ফিলিস্তিনি বন্দিকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। নাবলুস গভর্নরেটে ইসরায়েলি বাহিনীর সামরিক অভিযানের তীব্রতা সবচেয়ে বেশি। বিশেষ করে তাল শহরে ব্যাপক মাত্রায় তল্লাশি এবং জিজ্ঞাসাবাদ চালানো হচ্ছে।

২৪ জুলাই থেকে শুরু করে কেবল তাল শহর থেকেই প্রায় ৮০ জনকে আটক করা হয়েছে। যদিও তাদের বেশিরভাগকে পরবর্তীতে ছেড়ে দেওয়া হয়, তবে এখনও শিশুসহ অন্তত ১৮ জন ফিলিস্তিনি ইসরায়েলি বাহিনীর হেফাজতে রয়েছেন।

সূত্র: আলজাজিরা