ঘৃণামূলক প্রচারণার জেরে মালয়েশিয়ায় বন্ধ হচ্ছে রোহিঙ্গা স্কুল

আপডেট : ২৭ জুলাই ২০২৬, ১১:৫০ এএম

মালয়েশিয়ায় অনলাইনে রোহিঙ্গাবিরোধী বিদ্বেষমূলক প্রচারণা ও ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে পড়ার পর দেশজুড়ে একের পর এক রোহিঙ্গা শিশুদের স্কুল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে শিক্ষাবঞ্চিত হওয়ার পাশাপাশি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে হাজারো রোহিঙ্গা পরিবার।

রয়টার্সের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দেশজুড়ে অন্তত নয়টি রোহিঙ্গা স্কুল ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। অনলাইনে রোহিঙ্গাদের লক্ষ্য করে ঘৃণামূলক বক্তব্য ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে পড়ার পর সরকার সম্প্রদায়টির ওপর নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ জোরদার করেছে। এতে প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

মালয়েশিয়ায় বেড়ে ওঠা রোহিঙ্গা অধিকারকর্মী শরিফাহ শাকিরাহ বলেন, 'শিশুরা এতটাই আতঙ্কিত যে তারা ঘর থেকে বের হতেও ভয় পাচ্ছে। আপনি শুধু এক-দুদিনের জন্য কোনো শিশুকে হয়রানি করছেন না, বরং তার মনে দীর্ঘস্থায়ী মানসিক আঘাত তৈরি করছেন।'
 
স্কুল বন্ধ কিংবা বিদ্বেষমূলক প্রচারণা বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাওয়া হলেও মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।

মালয়েশিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে রোহিঙ্গাদের শরণার্থী হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না; তাদের অবৈধ অভিবাসী হিসেবে বিবেচনা করে। তবে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) কাছে নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা প্রায় এক লাখ ২০ হাজার।

মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ মালয়েশিয়া দীর্ঘদিন ধরে মিয়ানমারে নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিল। তবে কোভিড-১৯ মহামারির সময় থেকে জনমতের পরিবর্তন হতে থাকে। সে সময় রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ভাইরাস ছড়ানো, স্থানীয় সংস্কৃতির প্রতি অসম্মান দেখানো এবং চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ানোর অভিযোগ ওঠে।

গত সপ্তাহে পার্লামেন্টে উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী লুকানিসমান আওয়াং সাউনি বলেন, রোহিঙ্গা সম্প্রদায়কে ঘিরে উদ্ভূত বিভিন্ন সমস্যার কারণে মালয়েশিয়ার জনগণ নিজেদের ওপর বাড়তি চাপ অনুভব করছে।

চলতি বছরের মে মাসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মেটার প্ল্যাটফর্ম এবং বাইটড্যান্স-এর টিকটকে রোহিঙ্গাবিরোধী নতুন বিদ্বেষমূলক প্রচারণা শুরু হয়। এর পেছনে একটি রোহিঙ্গা গোষ্ঠীর গবাদিপশু কোরবানিকে ঘিরে পরিচ্ছন্নতা নিয়ে বিতর্ককে কেন্দ্র করে নানা পোস্ট ছড়িয়ে পড়ে।

এরপর সরকারকে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ‘সরিয়ে দেওয়ার’ আহ্বান জানিয়ে একটি অনলাইন আবেদন ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর উদ্বেগ প্রকাশের পর জুনে সেটি সরিয়ে ফেলা হলেও ততক্ষণে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ তাতে স্বাক্ষর করেছিলেন।
 
শরিফাহ শাকিরাহ বলেন, 'এখন যা হচ্ছে, তা কোভিড মহামারির সময়ের চেয়ে অন্তত ১০০ গুণ ভয়াবহ।'

রয়টার্স পর্যালোচনা করা কয়েকটি পোস্টে রোহিঙ্গা শরণার্থী, এমনকি শিশুদের বিরুদ্ধেও সহিংসতার উসকানি দেওয়া হয়েছে। মেটার মালিকানাধীন থ্রেডস-এ একটি আলোচিত বিষয় ছিল ‘লেমপাং রোহিঙ্গা’, যার অর্থ ‘রোহিঙ্গাকে চড় মারো’। আবার কিছু জনপ্রিয় অনলাইন ব্যক্তিত্ব অনুসারীদের রোহিঙ্গা বসতির ভিডিও ধারণ করে কর্তৃপক্ষকে অবস্থান জানাতে উৎসাহিত করেছেন।

তবে অনলাইনের এই প্রচারণার মধ্যেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাইফুদ্দিন নাসুতিওন ইসমাইল গত জুনে বলেন, সরকার ইচ্ছামতো শরণার্থীদের বহিষ্কার করতে পারে না। জাতীয় নিরাপত্তা ও মানবিক মূল্যবোধের মধ্যে ভারসাম্য রেখেই সরকার ব্যবস্থা নেবে। তবে এ বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কিছু জানাননি।

মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করা সংগঠন আর্টিকেল ১৯ বলেছে, অনলাইন প্রচারণার কারণে রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের ওপর নজরদারি বেড়েছে, যার ফলে তদন্ত, অভিযান এবং স্কুল বন্ধের ঘটনা ঘটছে।

সংগঠনটির এক মুখপাত্র বলেন, বিদ্বেষমূলক হামলা মোকাবিলায় মানবাধিকারভিত্তিক কোনো কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নি। বরং সরকারের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা উত্তেজনা ও হয়রানি কমানোর পরিবর্তে পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করছে।

এদিকে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, রোহিঙ্গা ও অন্যান্য শরণার্থীদের লক্ষ্য করে অনলাইনে ঘৃণামূলক বক্তব্য, ভুয়া তথ্য এবং অমানবিক উপস্থাপনা বাড়তে থাকায় তারা উদ্বিগ্ন। সংস্থাটি পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং শরণার্থী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠী উভয়ের ঝুঁকি কমাতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপে সহায়তা অব্যাহত রাখবে। তবে বিবৃতিতে স্কুল বন্ধের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়নি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত