ঢাবি‌তে নীল দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধের দাবি‌তে উপাচা‌র্যের কা‌ছে স্মারকলিপি

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শিক্ষার্থীদের বিপক্ষে অবস্থানকারী, ফ্যাসিবাদকে মদদদাতা এবং বিগত ১৭ বছরে ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থী ও ভিন্নমতের শিক্ষকদের ওপর নিপীড়নকারী শিক্ষকদের সংগঠন নীল দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ও নীল দলের শিক্ষকদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিতে স্মারকলিপি দিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢা‌বি) ফ্যাসিবাদবিরোধী শিক্ষকমণ্ডলী। 

আজ সোমবার (২৭ জুলাই) বি‌কে‌লে ঢা‌বির অধ্যাপক আব্দুল মতিন চৌধুরী ভার্চুয়াল ক্লাসরুমে এ স্মারক‌লি‌পি প্রদান করা হয়। 

এ‌তে বলা হয়, ঢাকা বিশ্ব‌বিদ‌্যালয় দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ হিসেবে সবসময় গণতন্ত্র, মুক্তচিন্তা ও ন্যায়বিচারের পক্ষে নেতৃত্ব দিয়েছে। কিন্তু গত দেড় দশকে তৎকালীন ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের তল্পিবাহক হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ ক্ষুন্ন করার জন্য দায়ী নীল দল। বিশেষ করে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় তাদের ভূমিকা শিক্ষক ও শিক্ষার্থী সমাজে ব্যাপক ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষদ, বিভাগ ও ইনস্টিটিউটে কর্মরত এবং তৎকালীন আওয়ামী ফ্যাসিস্ট সরকারের আজ্ঞাবহ ‘নীল দল’-এর সক্রিয় শিক্ষকরা নগ্নভাবে স্বৈরাচারের পক্ষ নিয়ে শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে অবস্থান করেছেন এবং বিগত বছরগুলোতে সাধারণ শিক্ষার্থী ও ভিন্নমতের শিক্ষকদের নানাভাবে হেনস্তা করেছে।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় নীল দল এবং তাদের অনুসারীদের কর্মকাণ্ডের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি বিষয় এ স্মারক‌লি‌পি‌তে উ‌ল্লেখ করা হয়। সেগু‌লো হল- ২০২৪ সালে ১৬ জুলাই আবু সাঈদ নিহত হওয়ার পর থেকে যখন সারা দেশে শত শত শিক্ষার্থী শহীদ হচ্ছিলেন, তখন ২০২৪ সা‌লের ১ আগস্ট নীল দলের শিক্ষকরা সংবাদ সম্মেলন করে নির্লজ্জভাবে শিক্ষার্থীদের ‘রাষ্ট্রদ্রোহী মহলের ষড়যন্ত্রের ক্রীড়নক’ হিসেবে আখ্যায়িত করে আন্দোলন পরিহার করার আহ্বান জানিয়ে সরাসরি ছাত্রহত্যার পক্ষে অবস্থান নেয়।

পাশাপাশি নীল দলের শিক্ষকরা ৩০ জুলাই সংবাদ সম্মেলন করে, সেসময়ে সংঘটিত গণহত্যার জন্য সরকারের পদত্যাগ দাবি করায় সাদা দলের শিক্ষকদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহীতার অভিযোগ করে মামলা করার হুমকি প্রদান করে।

৩ আগস্ট নীল দলের ব্যানারে তারা একটি র‍্যালি ও মানববন্ধন করে। সেখানে ব্যানারে ‘কোটা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সকল হত্যা, নাশকতা ও ধ্বংসযজ্ঞের দ্রুত বিচার’ দাবি করা হয়। এই মানববন্ধনের মাধ্যমে তারা মূলত শহীদদের রক্তের সাথে বেইমানি করে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদেরই নাশকতার জন্য দায়ী করে।

তারা ব‌লেন, ৩ আগস্ট বিকেলে শহীদ মিনার থেকে এক দফা দাবি ঘোষণার পর ঐদিন রাতে নীল দলের এই শিক্ষকরা গণভবনে গিয়ে তৎকালীন স্বৈরাচারী প্রধানমন্ত্রীকে প্রত্যক্ষভাবে সমর্থন দিয়ে আসে। গণমাধ্যম সূত্রে আমরা জানতে পেরেছি, ওই সভায় নীল দলের কয়েকজন শিক্ষক আন্দোলনকারীদের দেখামাত্র গুলি করার মতো ঘৃণ্য নির্দেশ দেওয়ারও সুপারিশ করেছিল।

এছাড়াও জুলাই আন্দোলনে এই শিক্ষকরা আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের চিহ্নিত করে নির্যাতন করার জন্য ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে পুলিশ ও সন্ত্রাসী ছাত্রলীগকে সরবরাহ করেছিল। কোনো প্রকার পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়াই ১৭ জুলাই সকালে তড়িঘড়ি করে সিন্ডিকেট সভার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করে বিকেলের মধ্যেই শিক্ষার্থীদের হল ছাড়তে বাধ্য করা হয়। সেদিন গায়েবানা জানাজায় পুলিশ ক্যাম্পাসের ভেতরে ঢুকে শিক্ষার্থীদের ওপর রাবার বুলেট ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। ক্যাম্পাস থেকে বের হওয়ার পথগুলোতে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা অবস্থান নিলেও, প্রশাসন ও সিন্ডিকেটে থাকা এই শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের বিন্দুমাত্র নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে বরং তাদের বিপক্ষে অবস্থান নেয়। যার ফলে শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাস ত্যাগ করার সময় হামলার শিকার হয়। 

শিক্ষকরা ব‌লেন, আন্দোলন চলাকালে তৎকালীন উপাচার্য মাকসুদ কামাল শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পরিবর্তে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের চিহ্নিত করে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কারের কথা বলে, যার প্রমাণ হিসেবে তার সঙ্গে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর কথোপকথনের একটি অডিও রেকর্ড আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জমা দেওয়া হয়েছে। একই কথোপকথনে তাকে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের সংঘবদ্ধ ও সক্রিয় থাকার কথা উল্লেখ করতেও শোনা যায়।

২০২৪ সালে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত আমাদের শিক্ষার্থীদের ওপর ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় যখন ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা সশস্ত্র হামলা চালায়, তখন তৎকালীন প্রশাসন ও দায়িত্বে থাকা নীল দলের এই শিক্ষকরা কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ না করে সন্ত্রাসীদের সহায়তা করেছে। সেদিন শিক্ষার্থীরা যখন হলে ফিরছিল, তখন তাদের ওপর নির্যাতন চালানো হলেও এই শিক্ষকরা তাদের রক্ষায় কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ না করে বরং শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের জন্য দোষারোপ করেছে। 

নীল দলের সকল কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা ও নীল দলের চিহ্নিত শিক্ষকদের শা‌স্তি দা‌বি ক‌রে তারা ব‌লেন, বিগত ১৭ বছর ধরে এই শিক্ষকরা বিরোধীদলীয় বা ভিন্নমতের ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা হলে কখনো ব্যবস্থা নেননি, উল্টো তাদের তথ্য সন্ত্রাসীদের কাছে সরবরাহ করেছেন।

বার্ষিক সিনেট অধিবেশনে দাঁড়িয়ে তারা নির্লজ্জভাবে ক্যাম্পাসের অমানবিক ‘গেস্টরুম’ ও ‘গণরুম’ কালচারকে অস্বীকার করেছেন। একই সাথে গেস্টরুম ও গণরুম কালচারের প্রতিবাদ করে সাদা দলের শিক্ষকরা বক্তব্য দিলে নীল দলের শিক্ষকরা অত্যন্ত আপত্তিকর ও আক্রমণাত্মক বক্তব্য দিয়ে সেই যৌক্তিক বক্তব্য এক্সপাঞ্জ করার মতো নজীরবিহীন ঘটনা ঘটিয়েছে। তাছাড়া, ভিন্নমতের শিক্ষকদের তারা নানাভাবে পদে পদে হেনস্তা ও পদোন্নতি বঞ্চিত করেছেন এবং ভিন্নমতকে কখনো বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধা করেননি। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া এবং বিগত ১৭ বছর ধরে ফ্যাসিজমের দোসর হিসেবে কাজ করা আওয়ামী আদর্শে বিশ্বাসী নীল দলের সকল কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা ও নীল দলের চিহ্নিত শিক্ষকদের বিরুদ্ধে দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।