আকাশের দিকে তাকালে আমাদের বিস্ময় জাগে। সূর্য প্রতিদিন উদিত হয়। আবার অস্ত যায়। রাত আসে। ভোর হয়। ঋতু বদলায়। বৃষ্টি ঝরে। আবার শুকনো মাটি সবুজ হয়ে ওঠে। ক্ষুদ্র একটি বীজ থেকে জন্ম নেয় বিশাল বৃক্ষ। মানুষের হৃদয়ও থেমে থাকে না। বিরামহীনভাবে স্পন্দিত হতে থাকে। এসব কি কেবলই স্বাভাবিক ঘটনা? নাকি এর পেছনে রয়েছে এক সর্বশক্তিমান স্রষ্টার নিখুঁত পরিকল্পনা?
কোরআন মানুষকে শুধু ইবাদতের নির্দেশ দেয়নি। চিন্তা করতেও আহ্বান জানিয়েছে। আল্লাহর সৃষ্টি নিয়ে ভাবতে বলেছে। তার অসংখ্য নিদর্শনের দিকে তাকাতে বলেছে। কারণ যে মানুষ সৃষ্টিজগৎ নিয়ে চিন্তা করে, তার হৃদয়ে ইমান আরও দৃঢ় হয়। মহান আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা বাড়ে। বিনয় জন্ম নেয়। মানুষের জীবন বদলে যায়।
মহান আল্লাহ এই বিশ্বজগৎকে নিছক বিনোদনের জন্য সৃষ্টি করেননি। প্রতিটি সৃষ্টি একটি বার্তা বহন করে। প্রতিটি নিদর্শন মানুষকে তার রবের পরিচয় করিয়ে দেয়। তাই কোরআনে বারবার বলা হয়েছে, এসবের মধ্যে চিন্তাশীল মানুষের জন্য রয়েছে বহু নিদর্শন।
মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেন, ‘বলুন, সব প্রশংসাই আল্লাহর জন্য। আর শান্তি তার বান্দাদের প্রতি, যাদের তিনি মনোনীত করেছেন। আল্লাহ শ্রেষ্ঠ, নাকি যাদের এরা শরিক করে তারা? বরং তিনি (শ্রেষ্ঠ), যিনি আসমানসমূহ ও জমিনকে সৃষ্টি করেছেন এবং তোমাদের জন্য তিনি আসমান থেকে পানি বর্ষণ করেন। অতঃপর তা দ্বারা আমি মনোরম উদ্যান সৃষ্টি করি। তার বৃক্ষাদি উৎপন্ন করার ক্ষমতা তোমাদের নেই। আল্লাহর সঙ্গে কি অন্য কোনো মাবুদ আছে? বরং তারা এমন এক সম্প্রদায়, যারা শিরক করে।’ (সুরা নামল ৫৯-৬০) এই আয়াতগুলো দ্বারা মানুষ উপলব্ধি করতে পারে, এই বিশ্বজগতের একমাত্র স্রষ্টা ও পরিচালনাকারী আল্লাহ।
কোরআনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, এটি মানুষকে অন্ধ অনুসরণ শেখায় না। বরং চিন্তা করতে শেখায়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয় আসমান ও জমিনের সৃষ্টিতে, রাত ও দিনের পরিবর্তনে বোধসম্পন্ন মানুষের জন্য বহু নিদর্শন রয়েছে।’ (সুরা আলে ইমরান ১৯০)
এরপরই তিনি সেই চিন্তাশীল মানুষের পরিচয় দিয়েছেন। তারা দাঁড়িয়ে, বসে, শুয়ে সর্বাবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করে। আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টি নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে। তারপর বলে, ‘হে আমাদের রব! আপনি এসব অনর্থক সৃষ্টি করেননি।’ (সুরা আলে ইমরান ১৯১) এটাই একজন মুমিনের পরিচয়। সে শুধু দেখে না। উপলব্ধি করে। শুধু বিস্মিত হয় না। শিক্ষা গ্রহণ করে।
আকাশের বিশালতা মানুষকে নিজের ক্ষুদ্রতার কথা মনে করিয়ে দেয়। কোটি কোটি নক্ষত্র। অসংখ্য ছায়াপথ। সবকিছু নির্দিষ্ট নিয়মে চলছে। কোথাও বিশৃঙ্খলা নেই। কোথাও সংঘর্ষ নেই। এই শৃঙ্খলা প্রমাণ করে, একজন সর্বজ্ঞ ও সর্বশক্তিমান পরিচালনাকারী আছেন।
সূর্যের দিকে তাকালেও একই শিক্ষা পাওয়া যায়। সূর্য পৃথিবী থেকে সঠিক দূরত্বে রয়েছে। সামান্য পরিবর্তন হলেও পৃথিবীতে জীবন অসম্ভব হয়ে যেত। চাঁদের অবস্থানও নির্ধারিত। এর ফলে জোয়ার-ভাটা সৃষ্টি হয়। পৃথিবীর ভারসাম্য বজায় থাকে। এসব কেবলই কাকতালীয় হতে পারে না।
বৃষ্টিও আল্লাহর এক মহান নিদর্শন। আকাশ থেকে বিশুদ্ধ পানি নেমে আসে। শুকনো জমি প্রাণ ফিরে পায়। ফসল জন্মায়। মানুষ ও প্রাণীর জীবন বেঁচে থাকে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তুমি আল্লাহর রহমতের চিহ্নসমূহের প্রতি দৃষ্টি দাও। কীভাবে তিনি জমিনের মৃত্যুর পর তা জীবিত করেন। নিশ্চয় এভাবেই তিনি মৃতকে জীবিত করেন এবং তিনি সব কিছুর ওপর সর্বশক্তিমান।’ (সুরা রুম ৫০)
মানুষের নিজের শরীরও আল্লাহর এক বিস্ময়কর নিদর্শন। চোখ কীভাবে দেখে। কান কীভাবে শোনে। হৃদপিণ্ড কীভাবে বিরামহীনভাবে কাজ করে। মস্তিষ্ক কীভাবে অসংখ্য তথ্য সংরক্ষণ করে। মানুষ যত গবেষণা করছে, ততই সৃষ্টির বিস্ময় স্পষ্ট হচ্ছে।
মহান আল্লাহ বলেন, ‘পৃথিবীতে রয়েছে দৃঢ় বিশ্বাসীদের জন্য নিদর্শন। আর তোমাদের নিজেদের মধ্যেও রয়েছে। তবুও কি তোমরা দেখবে না?’ (সুরা যারিয়াত ২০-২১) এই আয়াত আমাদের শেখায়, আল্লাহকে চিনতে দূরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। নিজের অস্তিত্বের মধ্যেই তার অসংখ্য নিদর্শন রয়েছে।
প্রাণিজগৎও মানুষের জন্য এক বড় শিক্ষা। ক্ষুদ্র একটি পিঁপড়া নিজের সমাজ গড়ে তোলে। মৌমাছি ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করে। পাখি হাজার মাইল পথ পাড়ি দিয়ে আবার নিজ বাসায় ফিরে আসে। মাছ পানির গভীরে জীবনযাপন করে। প্রত্যেক প্রাণী নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলে। এ সবই মহান আল্লাহর নিখুঁত পরিকল্পনার সাক্ষ্য বহন করে।
সুরা নামলে হজরত সুলাইমান (আ.) ও পিঁপড়ার ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে। একটি ক্ষুদ্র পিঁপড়াও বিপদ বুঝে অন্যদের সতর্ক করেছিল। এতে বোঝা যায়, মহান আল্লাহ তার প্রতিটি সৃষ্টিকে বিশেষ বৈশিষ্ট্য দিয়েছেন। মানুষের উচিত, এসব দেখে শিক্ষা গ্রহণ করা।
ইতিহাসও আল্লাহর নিদর্শনে পরিপূর্ণ। আদ, সামুদ, লুত (আ.)-এর জাতি এবং ফেরাউনের পরিণতি কোরআনে বারবার উল্লেখ করা হয়েছে। তারা শক্তিশালী ছিল। সম্পদশালী ছিল। কিন্তু অহংকার ও অবাধ্যতার কারণে ধ্বংস হয়েছে। আজও তাদের ইতিহাস মানুষকে সতর্ক করে।
মহান আল্লাহর নিদর্শন নিয়ে চিন্তা করলে মানুষের অন্তরে কৃতজ্ঞতা জন্মায়। সে বুঝতে পারে, প্রতিটি নেয়ামত আল্লাহর দান। চোখ, কান, সুস্থতা, পরিবার, খাদ্য, বায়ু, পানি, কোনোটিই মানুষের নিজের অর্জন নয়। সবই মহান রবের অনুগ্রহ।
হজরত সুলাইমান (আ.) বিপুল রাজত্ব লাভ করার পরও অহংকার করেননি। তিনি বলেছিলেন, ‘এটি আমার রবের অনুগ্রহ। তিনি আমাকে পরীক্ষা করছেন, আমি কৃতজ্ঞ হই, না অকৃতজ্ঞ হই।’ (সুরা নামল ৪০) এটাই একজন মুমিনের দৃষ্টিভঙ্গি। নেয়ামত তাকে গর্বিত করে না। বরং আরও বিনয়ী করে।
নিদর্শন নিয়ে চিন্তা মানুষের অন্তরে তাওহিদের বিশ্বাসকে দৃঢ় করে। তখন সে বুঝতে পারে, যিনি সৃষ্টি করেন, রিজিক দেন, জীবন দেন এবং মৃত্যু দেন, ইবাদতের অধিকারও একমাত্র তারই।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-ও মানুষকে আল্লাহর সৃষ্টিজগৎ নিয়ে ভাবতে উৎসাহিত করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘আল্লাহর সৃষ্টি সম্পর্কে চিন্তা করো। কিন্তু আল্লাহর সত্তা সম্পর্কে চিন্তা করো না।’ (শুআবুল ইমান) অর্থাৎ মানুষের চিন্তার ক্ষেত্র হলো আল্লাহর সৃষ্টি। তার অসীম সত্তাকে মানুষের সীমিত জ্ঞান দিয়ে উপলব্ধি করা সম্ভব নয়।
আল্লাহর নিদর্শন থেকে শিক্ষা গ্রহণ না করা মানুষের জন্য বড় ক্ষতি। কোরআনে বলা হয়েছে, অনেক মানুষ আকাশ ও পৃথিবীর অসংখ্য নিদর্শনের পাশ দিয়ে অতিক্রম করে, কিন্তু সেগুলো থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। (সুরা ইউসুফ ১০৫) এটি শুধু অতীতের মানুষের সমস্যা নয়। বর্তমান যুগেও অনেক মানুষ প্রকৃতির বিস্ময় দেখে, কিন্তু স্রষ্টার কথা স্মরণ করে না।
একজন মুমিনের দায়িত্ব হলো, প্রতিদিন মহান আল্লাহর নিদর্শনগুলো নতুন করে দেখা। সূর্যোদয় দেখেও আল্লাহকে স্মরণ করা। বৃষ্টি দেখেও তার শুকরিয়া আদায় করা। সন্তানকে দেখেও তার কুদরত উপলব্ধি করা। অসুস্থতা ও সুস্থতা উভয় অবস্থাতেই তার হেকমত বুঝতে চেষ্টা করা।
নিদর্শন নিয়ে ভাবনা কেবল জ্ঞান বৃদ্ধি করে না। এটি চরিত্রও গড়ে তোলে। মানুষকে বিনয়ী করে। গুনাহ থেকে দূরে রাখে। আখেরাতের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। হৃদয়কে কোমল করে। ইবাদতে মনোযোগী করে।
লেখক : ইসলামি গবেষক