পরিমিতি ও সংযমে সুস্থ জীবন

আপডেট : ২৭ জুলাই ২০২৬, ০১:০৩ এএম

মানবজীবনের অন্যতম বড় নিয়ামত সুস্থতা। সুস্থ দেহ ও প্রশান্ত মন ছাড়া ইবাদত, কর্মজীবন, পারিবারিক দায়িত্ব, সমাজসেবাসহ কোনো কিছুই যথাযথভাবে সম্পন্ন করা যায় না। ইসলাম মানুষের জীবনব্যবস্থাকে এমনভাবে পরিচালিত করার শিক্ষা দেয়, যাতে সে দুনিয়া ও আখেরাত উভয় জগতেই কল্যাণ লাভ করতে পারে। এ কারণেই ইসলাম সর্বক্ষেত্রে মধ্যপন্থা ও পরিমিতি অবলম্বনের নির্দেশ দিয়েছে।

প্রখ্যাত ইসলামি চিন্তাবিদ, ফকিহ ও চিকিৎসাবিদ ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) বলেছেন, ‘চারটি কাজ শরীরকে অসুস্থ করে তোলে। অতিরিক্ত কথা বলা, অতিরিক্ত ঘুমানো, অতিরিক্ত খাওয়া এবং অতিরিক্ত সহবাস।’ (জাদুল মাআদ ৪/৩৭৭)

এই বক্তব্য কোনো হাদিস নয়, বরং তার গভীর পর্যবেক্ষণ, চিকিৎসাবিদ্যার অভিজ্ঞতা এবং শরিয়তের সংযমের নীতির আলোকে প্রদত্ত একটি মূল্যবান উপদেশ। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানও এর অনেক দিককে সমর্থন করে।

পরিমিতির নীতি : ইসলাম অতিরঞ্জন বা চরমপন্থাকে সমর্থন করে না। কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা খাও, পান করো। তবে অপচয় করো না।’ এই নীতি শুধু খাদ্যের ক্ষেত্রেই নয়, বরং মানুষের প্রতিটি বৈধ কাজের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। অতিরিক্ততা যেমন ক্ষতিকর, তেমনি অপ্রয়োজনীয় কঠোরতাও কাম্য নয়। একজন মুমিনের জীবন হওয়া উচিত ভারসাম্যপূর্ণ, সংযমী ও নিয়ন্ত্রিত।

অতিরিক্ত কথার ক্ষতি : কথা বলতে পারা গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামত। এর মাধ্যমে মানুষ জ্ঞান আদান-প্রদান করে, সম্পর্ক গড়ে তোলে এবং সত্যের দাওয়াত দেয়। কিন্তু যখন কথা প্রয়োজনের সীমা অতিক্রম করে, তখন তা ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

অতিরিক্ত কথা বলার ফলে মানুষ অজান্তেই গিবত, অপবাদ, মিথ্যা, অহংকার, কটূক্তি কিংবা অর্থহীন আলোচনায় জড়িয়ে পড়ে। এতে যেমন আমল নষ্ট হয়, তেমনি মানসিক অস্থিরতাও বৃদ্ধি পায়। অনেক সম্পর্কের অবনতি ঘটে শুধু জিহ্বার অসংযমের কারণে। তাই রাসুলুল্লাহ (সা.) অপ্রয়োজনীয় কথা থেকে বিরত থাকার শিক্ষা দিয়েছেন। একজন জ্ঞানী ব্যক্তি জানেন কখন কথা বলতে হয়, কতটুকু বলতে হয় এবং কখন নীরব থাকা উত্তম।

অতিরিক্ত ঘুমের অপকারিতা : ঘুম মানুষের শারীরিক ও মানসিক পুনরুজ্জীবনের জন্য অপরিহার্য। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে যেমন শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে, তেমনি অতিরিক্ত ঘুমও নানা সমস্যা সৃষ্টি করে।

অতিরিক্ত ঘুম মানুষের কর্মস্পৃহা কমিয়ে দেয়, অলসতা সৃষ্টি করে এবং সময়ের অপচয় ঘটায়। অনেক সময় ফজরের নামাজ, তাহাজ্জুদ, কোরআন তিলাওয়াত কিংবা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কাজ ব্যাহত হয়। অতিরিক্ত ঘুম মনোযোগ কমিয়ে দেয় এবং দৈনন্দিন জীবনের উৎপাদনশীলতাও হ্রাস করে। ইসলাম তাই এমন জীবনধারা শিক্ষা দেয়, যেখানে বিশ্রাম ও কর্ম উভয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় থাকে।

অতিভোজনের ভয়াবহতা : খাদ্য মানুষের জীবনধারণের জন্য অপরিহার্য। কিন্তু প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাদ্য গ্রহণ শরীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। আজকের পৃথিবীতে স্থূলতা, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ ও ফ্যাটি লিভারের মতো অসংখ্য রোগের অন্যতম কারণ হলো অতিভোজন ও অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস।

রাসুলুল্লাহ (সা.) সংযমী আহারের শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, মানুষের জন্য কয়েক লোকমা যথেষ্ট, যা তার মেরুদণ্ড সোজা রাখে। প্রয়োজন হলে পাকস্থলীর এক-তৃতীয়াংশ খাদ্য, এক-তৃতীয়াংশ পানি এবং

এক-তৃতীয়াংশ শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য খালি রাখার নির্দেশনা দিয়েছেন। এ শিক্ষা শুধু ধর্মীয় নয়, বরং স্বাস্থ্যবিজ্ঞানের দৃষ্টিতেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংযমী খাদ্যাভ্যাস মানুষকে দীর্ঘদিন সুস্থ, কর্মক্ষম ও প্রাণবন্ত রাখে।

দাম্পত্য জীবনে ভারসাম্যের গুরুত্ব : ইসলাম বৈধ দাম্পত্য সম্পর্ককে ইবাদতের মর্যাদা দিয়েছে। স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক ভালোবাসা, স্নেহ ও শারীরিক সম্পর্ক বৈধ এবং সওয়াবের কাজ। তবে যেকোনো বৈধ কাজের মতো এখানেও পরিমিতি বজায় রাখা জরুরি। অতিরিক্ত সহবাস মানুষের শারীরিক শক্তি হ্রাস, ক্লান্তি এবং দৈনন্দিন কর্মক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই দাম্পত্য জীবনে উভয়ের শারীরিক সক্ষমতা, মানসিক অবস্থা ও পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে ভারসাম্য বজায় রাখাই উত্তম। ইসলামের শিক্ষা কখনো দাম্পত্য সম্পর্ককে নিরুৎসাহিত করে না, বরং অতিরিক্ততা থেকে বিরত থাকতে উদ্বুদ্ধ করে।

আধুনিক বিজ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গি : ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.)-এর এই পর্যবেক্ষণ আজকের স্বাস্থ্যবিজ্ঞানেও যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। চিকিৎসাবিদরা বলেন, অতিভোজন বিপাকীয় রোগের ঝুঁকি বাড়ায়, অতিরিক্ত ঘুম হৃদরোগ ও বিষন্নতার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে, অনবরত কথা বলা মানসিক চাপ ও সামাজিক জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে এবং যেকোনো বিষয়ে অতিরিক্ততা শারীরিক ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে। অর্থাৎ শত শত বছর আগে প্রদত্ত তার এই উপদেশ আজও বাস্তব ও প্রাসঙ্গিক।

মুমিনের ভারসাম্যপূর্ণ জীবন : ইসলাম এমন জীবনব্যবস্থা চায়, যেখানে ইবাদত থাকবে, বিশ্রাম থাকবে, কাজ থাকবে, পরিবারকে সময় দেওয়া হবে এবং শরীরের হকও আদায় করা হবে। অতিরিক্ততা যেমন ক্ষতিকর, তেমনি অবহেলাও ক্ষতিকর। একজন মুমিন তার জিহ্বা, পেট, সময় ও প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করেন। এ নিয়ন্ত্রণই তাকওয়ার অন্যতম প্রকাশ।

সুস্থ জীবনের মূল ভিত্তি : ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.)-এর এই মূল্যবান উপদেশ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, সুস্থ জীবনের ভিত্তি হলো সংযম ও ভারসাম্য। অতিরিক্ত কথা, অতিরিক্ত ঘুম, অতিভোজন বা যেকোনো ক্ষেত্রে সীমা অতিক্রম করলে মানুষের শারীরিক, মানসিক ও আধ্যাত্মিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই প্রতিটি কাজে মধ্যপন্থা অবলম্বন করাই ইসলামের সৌন্দর্য এবং সুস্থ জীবনের অন্যতম রহস্য। সংযম, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্যপূর্ণ জীবনই একজন মুমিনকে দুনিয়ায় সুস্থতা এবং আখেরাতে সফলতার পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে সবক্ষেত্রে মধ্যপন্থা অবলম্বনের তৌফিক দান করুন। আমিন।

লেখক : মুহাদ্দিস ও শিক্ষা সচিব, জামিয়া দারুল হিকমাহ, কেওয়া, শ্রীপুর, গাজীপুর

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত