হেপাটাইটিস রোধে প্রতিরোধই সেরা অস্ত্র

হেপাটাইটিস এমন এক রোগ, যা দীর্ঘদিন কোনো লক্ষণ ছাড়াই মানুষের শরীরে থেকে ধীরে ধীরে লিভারকে ধ্বংস করতে পারে। এ কারণেই বলা হয় ‘নীরব মহামারী’। দেশে আনুমানিক ১ কোটি মানুষ হেপাটাইটিস বি বা সি ভাইরাসে আক্রান্ত। অথচ প্রতি ১০ জনের একজনই জানেন না যে তারা এই ভাইরাস বহন করছেন। অজান্তেই তারা অন্যদের সংক্রমিত করছেন এবং নিজেরাও ধীরে ধীরে লিভার সিরোসিস বা লিভার ক্যানসারের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন।

লিভার ও হেপাটাইটিস কী?

লিভার বা যকৃত শরীরের বিপাকক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে। পিত্ত তৈরির মাধ্যমে চর্বি হজমে সহায়তা, খাদ্যের শর্করা, চর্বি ও প্রোটিনের বিপাক সম্পন্ন করা, গ্লাইকোজেন, ভিটামিন এ, ডি, ই, কে, বি১২ এবং আয়রন জমা রাখা, ওষুধ, অ্যালকোহল ও বিভিন্ন বিষাক্ত পদার্থকে ভেঙে শরীরের জন্য নিরাপদ করা, রক্ত জমাট বাঁধতে সহায়তাকারী বিভিন্ন প্রোটিন তৈরি এবং শরীরের বিভিন্ন রোগপ্রতিরোধে ভূমিকা পালন করে। দেহের এ দ্বিতীয় বৃহত্তম অঙ্গ লিভারের প্রদাহ বা সংক্রমণ হেপাটাইটিস নামে অভিহিত। ভাইরাসজনিত হেপাটাইটিসের পাঁচটি ধরন হলো হেপাটাইটিস এ, বি, সি, ডি এবং ই।

হেপাটাইটিস এ (এইচএভি) : দূষিত খাদ্য ও পানির মাধ্যমে ছড়ায়। এর উপসর্গ তীব্র; তবে স্বল্পমেয়াদি, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই লিভারের স্থায়ী ক্ষতি হয় না।

হেপাটাইটিস বি (এইচবিভি) : রক্ত, বীর্য বা অন্যান্য শারীরিক তরলের মাধ্যমে ছড়ায়।  দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে এবং লিভার সিরোসিস বা ক্যানসারের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচিত।

হেপাটাইটিস সি (এইচসিভি) : এটিও প্রধানত রক্তবাহিত। দূষিত রক্ত, ইনজেকশনের সুচের পুনর্ব্যবহার এবং ঝুঁকিপূর্ণ যৌন সম্পর্কের মাধ্যমে ছড়াতে পারে। হেপাটাইটিস সি দীর্ঘমেয়াদি হয় এবং লিভার ক্যানসারের বড় কারণ। টিকা নেই। তবে নতুন অ্যান্টিভাইরাল ওষুধে নিরাময়যোগ্য।

হেপাটাইটিস ডি (এইচডিভি) : হেপাটাইটিস বি ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরেই দেখা যায়। হেপাটাইটিস বি-এর জটিলতাকে বাড়িয়ে তোলে।

হেপাটাইটিস ই (এইচইভি) : এটি হেপাটাইটিস এ-এর মতোই দূষিত খাদ্য ও পানির মাধ্যমে ছড়ায়। তীব্র ও স্বল্পমেয়াদি হয়। গর্ভবতী নারীর মারাত্মক হতে পারে।

লক্ষণ ও উপসর্গ

প্রাথমিক লক্ষণ : জ্বর, ক্ল¬ান্তি, বমি বমি ভাব, বমি, পেটে ব্যথা বা অস্বস্তি, ক্ষুধামান্দ্য, হালকা জ্বর।

গুরুতর লক্ষণ : যখন রোগ আরও বাড়ে, তখন চোখ ও ত্বকের হলুদ ভাব (জন্ডিস), গাঢ় প্রস্রাব এবং ফ্যাকাশে মল দেখা দিতে পারে।

জটিলতার লক্ষণ : লিভার সিরোসিসের ক্ষেত্রে ওজন কমে যাওয়া, পেটে পানি জমা, পা ফোলা, রক্তক্ষরণ এবং মানসিক অবস্থার পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।

রোগ নির্ণয়

রক্ত পরীক্ষা : হেপাটাইটিস বি এইচবিএসএজি এবং হেপাটাইটিস সি অ্যান্টি-এইচসিভি পরীক্ষার মাধ্যমে ভাইরাসের উপস্থিতি নির্ণয় করে।

লিভার ফাংশন টেস্ট : এই পরীক্ষা লিভারের এনজাইম এবং বিলিরুবিনের মাত্রা পরিমাপ করে লিভারের ক্ষতির পরিমাণ বা কার্যকারিতা মূল্যায়ন করে।

আল্ট্রাসনোগ্রাফি : লিভারের আকার, গঠন এবং কোনো অস্বাভাবিকতা যেমন সিরোসিস বা ক্যানসারের লক্ষণ দেখতে সহায়তা করে।

লিভার বায়োপসি : লিভারের টিস্যু নিয়ে পরীক্ষা করে ক্ষতির মাত্রা নির্ণয় করার জন্য।

কারা বেশি ঝুঁকিতে?

রক্ত গ্রহণকারী রোগী, ডায়ালাইসিস রোগী, স্বাস্থ্যকর্মী, যারা ইনজেকশন বা সুচ ভাগাভাগি করেন, ঝুঁকিপূর্ণ যৌন সম্পর্ক, হেপাটাইটিসে আক্রান্ত মায়ের নবজাতক এবং পরিবারের আক্রান্ত সদস্যের সংস্পর্শে থাকা ব্যক্তি।

প্রতিকার

হেপাটাইটিসের প্রতিকার বা চিকিৎসা রোগের প্রকার ও তীব্রতার ওপর নির্ভর করে। হেপাটাইটিস এ ও ই নির্দিষ্ট চিকিৎসার প্রয়োজন হয় না; বিশ্রাম ও সহায়ক চিকিৎসাতেই রোগী সুস্থ হয়ে ওঠেন। হেপাটাইটিস বি সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য না হলেও অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ ভাইরাসের বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করে লিভারের ক্ষতি কমাতে পারে।

হেপাটাইটিসের প্রধান জটিলতা

হেপাটাইটিস বি ও হেপাটাইটিস সি দীর্ঘমেয়াদে গুরুতর জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।

দীর্ঘমেয়াদি হেপাটাইটিস : ছয় মাসের বেশি সময় ভাইরাস শরীরে থেকে গেলে দীর্ঘস্থায়ী হেপাটাইটিসে রূপ নিতে পারে, ধীরে লিভারের কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

লিভার ফাইব্রোসিস : দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহের ফলে লিভারে আঁশযুক্ত টিস্যু তৈরি হয় এবং স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা কমে যায়।

লিভার সিরোসিস : লিভারের স্থায়ী ক্ষতি ও সংকোচন ঘটে। পোর্টাল হাইপারটেনশন, পেটে পানি জমা, পা ফুলে যাওয়া, খাদ্যনালির ভেরিসিস রক্তক্ষরণ এবং এনসেফালোপ্যাথি হতে পারে।

লিভার ক্যানসার : দীর্ঘদিনের হেপাটাইটিস বি ও সি লিভার ক্যানসারের অন্যতম প্রধান কারণ। কখনো কখনো সিরোসিস ছাড়াও ক্যানসার হতে পারে।

লিভার ফেইলিউর : জন্ডিস, রক্ত জমাট বঁাঁধার সমস্যা, বিভ্রান্তি, কোমা এবং মৃত্যুও হতে পারে।

পোর্টাল হাইপারটেনশন : লিভারের ভেতর রক্তচাপ বেড়ে যায়। খাদ্যনালির ভেরিসিস তৈরি হয়ে প্রাণঘাতী রক্তক্ষরণ হতে পারে।

হেপাটিক এনসেফালোপ্যাথি : লিভার বিষাক্ত পদার্থ অপসারণে ব্যর্থ হলে মস্তিষ্ক আক্রান্ত হয়। এতে রোগীর স্মৃতিভ্রংশ, আচরণগত পরিবর্তন, ঘুমের সমস্যা, অচেতনতা ও কোমা হতে পারে।

প্রতিরোধই সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র

হেপাটাইটিস প্রতিরোধ করা সম্ভব, যদি ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ সমন্বিতভাবে উদ্যোগ গ্রহণ করে। হেপাটাইটিস বি-এর নিরাপদ ও কার্যকর টিকা রয়েছে। জন্মের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নবজাতককে প্রথম ডোজ এবং পরবর্তী নির্ধারিত ডোজগুলো সম্পন্ন করলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে সংক্রমণ প্রতিরোধ করা যায়। শতভাগ স্ক্রিনিং করা রক্ত ছাড়া রক্ত গ্রহণ করা উচিত নয়। নিরাপদ ইনজেকশন ও জীবাণুমুক্ত চিকিৎসা সরঞ্জাম ব্যবহার।  স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন ও হাত ধোয়ার অভ্যাস। নিরাপদ যৌন আচরণ এবং ব্যক্তিগত ব্যবহার্য সামগ্রী ভাগাভাগি না করা।