পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জে একটি ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে স্থানীয় সাংবাদিক লালন সরকারকে বেধড়ক মারধরের অভিযোগ পাওয়া গেছে। তাকে মারধর করে আহত অবস্থায় থানায় তুলে দেওয়া হয়। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থা থেকে তাকে চাঁদাবাজির মামলায় গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়। গত শুক্রবারের ঘটনায় লালন সরকারকে পরদিন শনিবার আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
এ ঘটনায় উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক আসাদুজ্জামান সুমন, তার বড় ভাই জাহেদুজ্জামান রাসেল, মুশফিকুর রহমান লিমনসহ প্রায় ৫০ জনের বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ করেছেন তিনি।
এ ঘটনায় লালন সরকারের স্ত্রী শারমিন গত শনিবার রাতে দেবীগঞ্জ থানায় অভিযোগ দিতে গেলে পুলিশ তা গ্রহণ করেনি বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। লালন সরকার আজকের বসুন্ধরা নামক পত্রিকার হয়ে কাজ করতেন। এখন ফেসবুকে একটি পেজ চালান।
ভুক্তভোগী লালন সরকার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত শুক্রবার (২৪ জুলাই) রাত সাড়ে ১০টার দিকে আসাদুজ্জামান সুমন মোবাইল ফোনে লালনকে দেখা করতে ডাকেন। পরে পায়রা চত্বরসংলগ্ন এনএন স্কুল মাঠের গোলপোস্টের পাশে কয়েকজনের সঙ্গে অবস্থানকালে সুমন, রাসেলসহ প্রায় ৫০ জন তাকে ঘিরে ফেলেন।
লালনের দাবি, হামলার সময় পৌর বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক রেজাউল ইসলাম লিটন, সাদেকুজ্জামান হীরা, দেবীগঞ্জ কলেজ শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক খালিদ মাহমুদ সৈকত, যুগ্ম আহ্বায়ক আসিফ ফয়সাল চৌধুরী শোভনসহ আরও কয়েকজনকে তিনি শনাক্ত করতে পেরেছেন।
জানা গেছে, সম্প্রতি ‘জুলাই দেবীগঞ্জ’ নামে একটি ফেসবুক আইডি থেকে ছাত্রদল নেতা আসাদুজ্জামান সুমনের দুই ভাই আপিপ লিয়ন ও মুশফিকুর রহমান লিমনকে নিয়ে একটি পোস্ট দেওয়া হয়। সেখানে এক ভাইকে ‘উবনরমধহল’ নামের একটি ফেসবুক পেজের অ্যাডমিন এবং অন্য ভাইকে ২০২২ সালে ছাত্রলীগের নেতা হিসেবে দাবি করা হয়।
ভুক্তভোগীর অভিযোগ, ওই ফেসবুক আইডিটি তিনি পরিচালনা করেন এমন অভিযোগ তুলে তার ওপর হামলা চালানো হয়। তবে লালনের দাবি, আইডিটি কে পরিচালনা করেন সে বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না।
লালন সরকারের অভিযোগ, হামলার সময় তাকে মাটিতে ফেলে এলোপাতাড়ি লাথি ও ঘুষি মারা হয়। একপর্যায়ে তিনি পানি চাইলে পানি দেখিয়েও পান করতে দেওয়া হয়নি। সুমন ও রাসেল তার গলায় পা দিয়ে চেপে ধরেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি। এতে তার গলা, দুই হাত, দুই উরু ও পিঠে গুরুতর আঘাত লাগে। ডান কান থেকে রক্ত বের হয় এবং জিহ্বা কেটে যায়।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, হামলার সময় তার দুটি স্মার্টফোন, একটি ফিচার ফোন, ড্রাইভিং লাইসেন্স ও মোটরসাইকেলের স্মার্ট কার্ড ছিনিয়ে নেওয়া হয়।
লালনের দাবি, মারধরের একপর্যায়ে তাকে একটি ভ্যানে করে দেবীগঞ্জ থানায় নেওয়া হয়। পরে প্রায় শতাধিক ব্যক্তি থানায় গিয়ে তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির মামলা নেওয়ার জন্য মব তৈরি করে ওসির ওপর চাপ সৃষ্টি করেন।
লালনের স্ত্রী শারমিন বলেন, ‘আমার স্বামীকে যেভাবে মারধর করা হয়েছে, আর কিছুক্ষণ দেরি হলে তিনি মারা যেতে পারতেন। রাত আড়াইটা পর্যন্ত তাকে হাসপাতালে নিতে পারিনি। পরে পুলিশের সহযোগিতায় হাসপাতালে নেওয়া হয়। এরপর জানতে পারি, তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির মামলা হয়েছে। হাসপাতাল থেকেই তাকে ওই মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়। চাঁদাবাজির কোনো প্রমাণ কেউ দেখাতে পারেনি। আমি আমার স্বামীর ওপর হামলার বিচার চাই।’
অভিযোগ অস্বীকার করে উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক আসাদুজ্জামান সুমন বলেন, ‘লালন সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে চলেন। তিনি আমাদের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানে গিয়ে ম্যানেজারের কাছে বিভিন্ন হুমকি-ধামকি দিয়ে চাঁদা দাবি করেন। পরে স্থানীয় লোকজন তাকে ধরে থানায় দেয়। আমি সেখানে যাওয়ার পর কোনো মারধরের ঘটনা ঘটেনি।’
এ বিষয়ে জাহিন ট্রেডার্সের ম্যানেজার আবু হানিফ মোবাইলফোনে বলেন, বিষয়টি টাকাপয়সার বিরোধসংক্রান্ত। বিস্তারিত জানাবেন বলে তিনি পরে ফোন কেটে দেন।
দেবীগঞ্জ থানার ওসি মূসা মিয়া বলেন, ‘লালনের বিরুদ্ধে ভয়ভীতি দেখিয়ে চাঁদা দাবির অভিযোগে মামলা হয়েছে।’ তিনি মারধরের অভিযোগ সম্পর্কে বলেন, ‘তার শরীরে এক জায়গায় সামান্য আঁচড়ের দাগ ছিল।’