চট্টগ্রামের আনোয়ারায় নির্মাণাধীন চায়না ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোনে (সিইআইজেড) অবকাঠামোসহ মোট বিনিয়োগের পরিমাণ শেষ পর্যন্ত এক বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে যাবে বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি এও জানান, বিশেষ এই শিল্প জোনে কর্মসংস্থান হবে প্রায় এক লাখ লোকের।
গতকাল সোমবার আনোয়ারার বেলচূড়া এলাকায় সিইআইজেড প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। এতে বিশেষ অতিথি ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। এ ছাড়া বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত এইচ ই ইয়াও ওয়েন, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী, চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশনের (সিআরবিসি) ভাইস প্রেসিডেন্ট লি চাংগুইসহ দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়ী নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
অর্থমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে অবকাঠামো উন্নয়নসহ সব ধরনের ব্যয় মিলিয়ে প্রকল্পটিতে শেষ পর্যন্ত এক বিলিয়ন ডলারেরও বেশি বিনিয়োগ হবে।
তিনি বলেন, এই প্রকল্প শুধু আনোয়ারা নয়, পুরো দক্ষিণ চট্টগ্রামের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে এবং শিল্পায়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। একই সঙ্গে এটি ২০৩৪ সালের মধ্যে দেশে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ে তোলার লক্ষ্য অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, সরকার আগামী এক দশকে এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এ অর্থনৈতিক অঞ্চলে এক লাখের বেশি মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। এটি কেবল আনোয়ারায় সীমাবদ্ধ থাকবে না। এর মাধ্যমে শক্তিশালী সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে উঠবে, বিভিন্ন সেবা খাতের বিকাশ ঘটবে এবং কর্মীদের জন্য আবাসনের ব্যবস্থাও করা হচ্ছে।
চীনা রাষ্ট্রদূত এইচ ই ইয়াও ওয়েন বলেন, ‘চট্টগ্রামে চাইনিজ ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোনে এই গ্রাউন্ডব্রেকিং উদ্যোগ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের ফল বাস্তবায়নের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এই নতুন ঐতিহাসিক সূচনালগ্নে চীন বাংলাদেশের সঙ্গে হাত মিলিয়ে দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বকে আরও এগিয়ে নিতে, কৌশলগত সমন্বয় গভীর করতে এবং বাস্তবভিত্তিক সহযোগিতা সম্প্রসারণে প্রস্তুত। দুই দেশের নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ ঐকমত্যকে উন্নয়নের বাস্তব সুফলে রূপ দিতে আমরা একসঙ্গে কাজ করতে চাই।’
বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী বলেন, জুন মাসে প্রধানমন্ত্রীর বেইজিং ও দালিয়ান সফরের পর ৩০টির বেশি চীনা কোম্পানি এ জোনে প্রায় অর্ধ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বাংলাদেশে সাধারণত একটি কারখানা স্থাপন বা প্রয়োজনীয় অনুমোদন নিতে ছয় মাস থেকে এক বছর সময় লেগে যায়। আমরা ইতিমধ্যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছি, আগামী তিন মাসের মধ্যে এমন একটি প্রক্রিয়া চালু করা হবে, যার মাধ্যমে ব্যবসা শুরুর কাজ ১৪ দিনের মধ্যে সম্পন্ন করা সম্ভব হবে। বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশে বহু দশকের অভিজ্ঞতার তুলনায় এটি একটি বাস্তব ও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন।
সিআরবিসি ভাইস প্রেসিডেন্ট লি চাংগুই বলেন, ‘আজ গুরুত্বপুর্ণ এই প্রকল্পটি একটি নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করল, যার সঙ্গে যুক্ত হলো নতুন দায়িত্ব ও প্রত্যাশা। সিইআইজেডের নির্মাণ ও পরিচালনা এগিয়ে নিতে সিআরবিসি সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করবে। দ্বিপক্ষীয় শিল্প সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের একটি আকর্ষণীয় গন্তব্য এবং পারস্পরিক লাভজনক সহযোগিতার একটি মডেল জোন হিসেবে সিইআইজেডকে গড়ে তোলাই আমাদের লক্ষ্য। দুই দেশের অভিন্ন উন্নয়নে আমরা আরও বড় অবদান রাখতে চাই।’
বাংলাদেশ ও চীনের সরকার-টু-সরকার (জিটুজি) উদ্যোগের আওতায় কর্ণফুলী নদীর পূর্ব তীরে প্রায় ৭৮৩ একর জমির ওপর গড়ে তোলা হচ্ছে এ অর্থনৈতিক অঞ্চল। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে প্রকল্পটির বাস্তবায়নকারী সংস্থা বেজা। এ প্রকল্পের আওতায় জেটি সংযোগ সড়ক, অভ্যন্তরীণ সড়ক নেটওয়ার্ক, পানি সংরক্ষণাগার, গ্যাস সঞ্চালন সুবিধা, কেন্দ্রীয় বর্জ্য তরল শোধনাগার (সিইটিপি), বহুমুখী জেটি, কঠিন বর্জ্য সংগ্রহ কেন্দ্র, সীমানাপ্রাচীর এবং বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র নির্মাণ করা হবে।
২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে ২০৩১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাস্তবায়নের জন্য নির্ধারিত এ অবকাঠামো প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় চার হাজার ১৮৯ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারি তহবিল থেকে ব্যয় হবে এক হাজার ৭২২ কোটি টাকা এবং বাকি দুই হাজার ৪৬৭ কোটি টাকা বৈদেশিক ঋণের মাধ্যমে জোগান দেওয়া হবে। এ অর্থায়নের জন্য চীনের এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংকের প্রেফারেনশিয়াল বায়ার্স ক্রেডিট (পিবিসি) সুবিধা ব্যবহারের প্রস্তাব করা হয়েছে।