প্রখর রোদে ছাতা-মাথায় বসে পড়ি পিরাগ-বোট বা মাদাগাস্কারে প্রচলিত ইঞ্জিনবিহীন নৌকায়। এ বোটট্রিপে আমার সহযাত্রী হচ্ছেন, ফরাসি দেশের নেভি থেকে রিটায়ার করা বান্দা আরিস্তিদ ও তার মরোক্কান বান্ধবী, বেলিড্যান্সে বেজায় পারঙ্গম নারী কাহিনা। ইসপানিয়ার প্রৌঢ় ইঞ্জিনিয়ার থিয়াগো ও তার অল্পবয়সী সুইটহার্ট লারেনা এবং অলবেনিয়া থেকে যুক্তরাষ্টে আগত অভিবাসী আগনেসা।
মাঝিরা বৈঠা হাঁকড়িয়ে মাহাডিরু নদীতে নৌযাত্রার বউনি করে। স্রোত কুণ্ডুলী পাকিয়ে এদিককার গভীর এক দেহে তৈরি করেছে অনেক ডিপ্রেশন। তার ওপর দিয়ে সাবধানে পাড়ি দিতে হলে প্রয়োজন জলদেবতা পেলামানাকে প্রথমে তুষ্ট করা। সুতরাং রিভারগাইড ডাডাডি-তাসা চলমান নৌকা থেকে নদীজলে ছিটিয়ে দেন, তুয়াকাগাছি নামে আখ ও তেঁতুলের ফারমেন্ট করা আরক। নৌকা দারুণভাবে দোলে, আমি বদরপীরের কথা ভাবি, কিন্তু মাদাগাস্কার তার জুরিসডিকশনের বাইরে। মাঝিরা ‘পেলামানা-ইয়ানা-ইয়ানা’ আওয়াজ দিয়ে বেজায় জোরে বৈঠা চালায়, আমি আতঙ্কে চোখ মুদে দোয়া-দুরুদ পাঠ করি। খানিক পর নৌকার দোলাচল শান্ত হয়ে আসলে—কোথা থেকে কানে ভেসে আসে কোনো প্রাণীর ডিট্রেস কল। চোখ খুললে দেখি—পাড়ের কাছে একটি জলেডোবা পাথরের ওপর পেছনের পায়ে ভর দিয়ে জানের ভয়ে আওয়াজ করছে চার-পাঁচটি উদবিড়াল। বিষয় কী?
আগনেসা পাড়ের দিকে আঙুল দিয়ে ইশারা করেন। দেখি—ওখানে বেকুফের মতো মুখ ব্যাদান করে নদীর দিকে নেমে আসছে একটি কুমির। পাশ দিয়ে আরিস্তিদ ও কাহিনার নাও ভেসে যায়, আমি চাপা-চিৎকারে কুমিরের উল্লেখ করি। আরিস্তিদ বাঁকা হেসে ফরাসি ভাষায় কী যেন বলেন, আন্দাজ করি—তার বক্তব্য হচ্ছে, ইউ আর ইন মাদাগাস্কার, এখানে কুমির তো থাকবেই, ডু ইউ রাদার এক্সপেক্ট অ্যা টিকটিকি।
মোহনায় এসে মাহাডিরু নদীটি স্মুদলি ঢুকে পড়ে তিসিরিবিহিনা নদীর স্বেচ্ছায় শুয়ে পড়া শরীরে। ডাডাডি-তাসা শিঙ্গা ফোঁকেন। মাঝিরা উৎসাহের সঙ্গে আওয়াজ দেয়, ‘আনি তিসিরিবিহিনা হজাইয়ে’, অর্থাৎ ‘আমরা ঢুকে পড়েছি তিসিরিবিহিনায়।’ তাদের উল্লাস বৈঠার তোড়ে ব্যাপকভাবে বিস্তারিত হয়। হরেক কিসিমের ধ্বনির কাকাফনিতে সবার সমবেতভাবে গেয়ে ওঠে, ‘আনিনি ফারিতানিনি সানাইয়ে,’ বা ‘এ নদী তীরেই তো আমার জনমভূমি।’ আনমনা তাকিয়ে দেখি—কাটা গাছের আস্ত একটি কাণ্ড নিয়ে মোহনা পাড়ি দিচ্ছে, অজানা এক মাঝি।
তিসিরিবিহিনার জলের বর্ণ মাহাডিরু থেকে তেমন একটা ভিন্ন নয়। তবে তার পাড়ের আকৃতিতে রোদে ঝলমল করে লাইমস্টোনের রকওয়াল। প্রবল স্রোতে এখানে ব্যাপকভাবে বাড়ে নৌকার গতি। তবে দুলুনি তেমন হয় না। আমাদের চোখের সামনে ক্রমাগত লাফিয়ে উঠছে জাম্পিং কার্প জাতীয় কোনো মাছ। মনে হয়, রিভার-ডলফিন তাদের তাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে শিকারের ধান্দায়। তিসিরিবিহিনা নদীতে ডলফিন আছে কি—আগনেসার কাছে জানতে চাই, তিনি লাফানো মাছের দিকে ধুন ধরে চেয়ে থেকে বলেন, ‘আমি একটি বইয়ে পড়েছি, মাদাগাস্কারে পাওয়া গেছে পাঁচ ধরনের রিভার-ডলফিনের জীবাষ্ম।’ নদীর পাড়ের কাছে ডোবাপাথরে পা দিয়ে প্রশ্নবোধক চিহ্নের মতো উঠে দাঁড়ায় তিনটি উদবিড়াল।
আমরা অতিক্রম করে যাই একটি ঘাট। ওখানে নোঙ্গর করা কয়েকখানা সাদামাটা ছইহীন পিরাগ-বোট। যাত্রীরা জলে পা চুবিয়ে তাতে সওয়ার হচ্ছে। একটি ছোট্ট মেয়ে মাথায় প্লাস্টিকের গামলা ভরা ডেগ-ডেকচি নিয়ে অবাক হয়ে আমাদের দেখে। আগনেসা জলের দিকে ইশারা করেন। দেখি—নৌকার কাছেই ভাসছে পোড়ামোড়া কাঠের গুঁড়ির মতো দেখতে একটি কুমির। শরীর ঘামে চিটচিটে হয়ে আছে। এ মুখপোড়াকে দেখে মন থেকে অজু-গোসলের ইরাদা স্রেফ উবে যায়। একঝাঁক মাছ তাদের রুপালি আঁশে রোদের রোশনি মেখে রিলাক্সভাবে ভাসে। আমাদের পিরাগ-বোটগুলো কেবলই স্রোতে ভেসে যায় ভাটির দিকে।
হঠাৎ করে বহতা জলের গতি বিগতভাবে বৃদ্ধি পেল কি না ঠিক বুঝতে পারি না, তবে তিসিরিবিহিনা নদীর প্রশস্ত সারফেস কুণ্ডুলায়িত ঘূর্ণিস্রোতে রীতিমতো ড্রামাটিক হয়ে ওঠে। মনে হয়, একাধিক স্রোতধারা বাঁকা হয়ে ঢলে পড়ছে একে অপরের গায়ে, কোথাও আবার ব্যাপকভাবে বলকে ওঠে ঢেউরাজি দুমড়ে-মুচড়ে তৈরি করছে জলস্তম্ভ। মাঝিরা ঘাবড়ে না গিয়ে দারুণ দক্ষতায় সামাল দিচ্ছে নৌকা আর তাদের এগিয়ে যেতে উৎসাহ দিয়ে ডাডাডি-তাসা থেকে থেকে আওয়াজ দিচ্ছেন, ‘রানো মানান-কাসিনা,’ মাঝিরা সমবেত কণ্ঠে ধুয়া দিচ্ছে, ‘আয়ো আয়ো হেনোয়-ইজাহে,’ বা ‘পবিত্র জলবহতা নদীর হে প্রভু, শুন আমাদের প্রার্থনা।’ চলিষ্ণু পরিবেশে তৈরি হয় এক ধরনের গতিময় সম্মোহন, মোহাবিষ্ট হয়ে আমি শুনি রিভার চ্যান্টিংয়ের কলতান।
আবিষ্ট হয়ে দেখছিলাম পাড়ের চলিষ্ণু দৃশ্যপট। কয়েকটি নিষ্পত্র বৃক্ষে পালকের শুভ্রতা ছড়িয়ে বসে আছে, অনেকগুলো সফেদ-ডানার সারস। হঠাৎ করে যেন ছন্দপতন ঘটে, বিজলি চলে গেলে চকিতে বন্ধ হয়ে যাওয়া ক্যাসেট-প্লেয়ারের মতো নিস্তব্ধ হয়ে যায় মাঝিদের চ্যান্টিং। পাশের নৌকা থেকে লরেনা আর্তনাদ করে ওঠে, ‘অহ দিওসকারাম্বা,’ প্রবল পেইনে গোঙিয়ে উঠে দাঁড়ান থিয়াগো, তার তেড়াবেকা হয়ে হওয়া পায়ের গুছিতে মালিশ করার চেষ্টা করছে লরেনা। ডাডাড়ি-তাসা লাল-গামছা উড়িয়ে বিপদ-সংকেতের জানান দেন, করজোরে তিনি অনুরোধ করেন, ‘মিজানামিজানা,’ বা ‘ভারসাম্য বহাল রাখুন।’ পুরো পরিস্থিতি প্রচুর মেহনতে সামাল দিয়ে, নাওগুলো অতঃপর এসে ভেড়ে রাতুশোয়া ফিশিং ভিলেজের চরে।
নদীচরের বিস্তীর্ণ বালুকাবেলার এক কোণে কোনো কারণে ঘর বেঁধেছেন এক জেলে-পরিবার। ডাডাডি-তাসা তাদের সঙ্গে কথাবার্তা বলে। রাতুশোয়া গ্রামটি কাছেই, বালিয়াড়ির ওপরে। ভোরবিহানে মাছটাছ ধরে, হাটের মেছুনিদের কাছে বিকিবাট্টা করে ছায়ায় বসে জেলে বিশ্রাম করছেন, তার স্ত্রী ব্যস্ত আছেন ঘরকন্নায়, নাড়া দিয়ে তৈরি উরা-মতো কুটির থেকে উঁকি দেয় একটি মুরগি। তাদের কাছ থেকে আমরা কিনে নিই খালুই-ভর্তি কুঁচো-মাছ। জানতে পারি, রাতুশোয়া গ্রামের ফকোনতানি বা ভিলেজ-চিফ চান না ভিন্ন গ্রামের জেলেরা এদিকে মাছ-শিকার করুক, তাই এ পরিবারকে নদীপথে নজরদারির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। নৌকায় ভেসে বেড়ানো পর্যটকরাও প্রকৃতির টানে কখনো-সখনো তাঁবু খাটিয়ে এখানে ক্যাম্পিং করেন।
সামান্য দূরের বালিয়াড়ি নিশানা করে হেঁটে যাই, দেখি, ন্যাটওয়ার্কহীন আইফোন হাতে রাবারের পিলো পেতে বসে আকাশপাতাল ভাবছে লরেনা। পাশে উবু হয়ে থিয়াগো পায়ের মাসোলে মালিশ করছেন সম্ভবত টাইগার-বাম। বিমর্ষমুখে তিনি আমার দিকে তাকিয়ে হাত নাড়েন। আমি লারেনাকে হাই বলি, কিন্তু সে চোখ নামিয়ে নেয়, তার অভিব্যক্তি দেখে মনে হয়, মেয়েটি ভাবছে, হোয়াট অ্যা টেরিবোল ইডিয়ট আই চুজ্ টু ট্রাভেল বাই বোট!
বালিয়াড়ির ওপর দিকের জমিন ছেয়ে আছে লতানো এক ধরনের উদ্ভিদে, তাতে ছোট ছোট সাদা রঙের ফুলও ফুটেছে প্রচুর। আমি ভ্রমরের তালাশে এদিক-ওদিক তাকাই, দেখি—কনুইয়ে ভর দিয়ে শুয়ে কাহিনা বাইনোকুলারে তাকিয়ে আছে। অনুসরণ করি তার দৃষ্টি, লতানো উদ্ভিদের পরিসরে ঘুরে বেড়াচ্ছে ছোট ছোট সবুজ প্যারাকিট বা মুনিয়া। কাহিনা আমাকে শুয়ে পড়ার ইশারা দিয়ে পাস করে দেয় বাইনাকুলারটি। স্পষ্ট হয়ে ওঠে পাখিগুলোর আকার-আকৃতি। ফিসফিসিয়ে সে জানায়, না এগুলো ঠিক প্যারাকিট না, মাদাগাস্কারে প্যারাকিটের কোনো হেবিটাট নেই। এখানকার ছোট্ট এ পাখিগুলোর নাম গ্রে-হেডেড লাভবার্ড। এরা মনোগমাস্ বা জোড় বাঁধে সারা জীবনের জন্য। মাথার ওপর এক জোড়া চিল উড়ে আসলে, ফুড়ুৎ করে একসঙ্গে উড়ে পালায় গোটা বিশেক লাভবার্ড।
উঠে পড়ে ধুলোবালি ঝাড়তে ঝাড়তে জানতে চাই, ‘হোয়ার ডিড ইউ লার্ন অল অ্যাবাউট বার্ডস্, কাহিনা?’ বিস্তারিত জবাব থেকে জড়ো করি, মরক্কোর এ মেয়েটির জীবনসংক্রান্ত কিছু তথ্য। মারাকেশ নগরীর এ নারী মাত্র আঠারো বছর বয়সে ঘর ছাড়ে, নিউজিল্যান্ড থেকে মরক্কোতে বেড়াতে আসা এক যুবকের সঙ্গে। কিছু দিন থিতু হয়েছিল নিউজিল্যান্ডের রিমোট একটি আইল্যান্ডে। তখন অভয়ারণ্যে জুটেছিল, কাকারিকি-কারাকা নামে বিরল প্রজাতির এক ধরনের প্যারাকিটের দেখভাল করার কাজ। বনানীর প্রাকৃতিক পরিসর থেকে এ পাখিটি প্রায় বিলুপ্তই হয়ে গেছে, তবে অভয়ারণ্যের তত্ত্বাবধানে এখনো বেঁচে আছে কম-বেশি চারশর মতো কাকারিকি-কারাকা।
কথাবার্তার একপর্যায়ে জানতে চাই, ‘নিউজিল্যান্ডের পুরুষটি কি তোমার প্রেমিক ছিল, কাহিনা?’ কোনো ভাবনাচিন্তা না করেই সে জবাব দেয়, ‘নট রিয়েলি, হি ওয়াজ মোর অব অ্যা সেক্স এডিক্ট, অ্যা বিট অব অ্যা পারভার্ট টাইপ। বাট ইউ নো হি ওয়াজ মাই ফার্স্ট, ব্যাপারটা ঘটেছিল ষোলো বছর বয়সে, আমি এভাইলেবোল ছিলাম, তাই বারবার সে ফিরে আসছিল আমার জন্ম-শহর মারাকেশে। ধরা পড়ে গেলে প্রিমেরিটাল সেক্সের কারণে ফ্যামিলিতে জব্বর ঝামেলা হয়, আই কুড নট টেইক ইট এনি মোর, ওর সঙ্গে ঘর ছেড়ে তাই পাড়ি দিয়েছিলাম নিউজিল্যান্ডে।’
কাহিনা নদীজলে চুবাতে চায় পদযুগল। তো তাকে ছেড়ে আমি চলে আসি বালুচরের প্রান্তিকে। এদিকটা ঘন গাছপালায় রীতিমতো জঙ্গল হয়ে আছে। ডাডাডি-তাসা এবং আগনেসাকেও এখানে পাওয়া যায়। ধবধবে সাদা সুচালো এক ধরনের অর্কিডে জড়ানো এক বৃক্ষতলে দাঁড়িয়ে আগনেসা ক্যামেরায় ফটাফট স্ন্যাপশট নিচ্ছেন আর ডাডাডি তাকে বোঝানোর চেষ্টা করছেন পরগাছাটির মাহাত্ম। এক্সাইটমেন্ট দেখে বুঝতে পারি, ঝুলে থাকা দৃষ্টিনন্দন ফুলগুলো হচ্ছে তার ইস্পিত কমেট-অর্কিড। এ পুষ্পদলকে কেন ধূমকেতু ফুল নামে ডাকা হয়, আগনেসা তার কোনো সদুত্তর দিতে পারেন না, তবে তিনি উল্লেখ করেন, এটি দর্শনে স্বয়ং ডারউইন শতাধিক বছর আগে উদ্দীপ্ত হয়েছিলেন, সে কারণে তরুবিদরা নাকি এটিকে ডারউইন-অর্কিডও বলে থাকেন।
আমাদের কথাবার্তা আর বেশি দূর আগায় না, তবে ডাডাডি প্রস্তাব করেন, গাছে চড়ে একগুচ্ছ কমেট-অর্কিড ছিঁড়ে আগনেসাকে উপহার দেওয়ার। এতে কেন জানি আগনেসা শুধু উত্যক্তই হন না, রেগেও যান প্রবলভাবে। আমি ইশারায় তাকে সংযত হতে বলি, তো ডাডাডি আমাদের নৌকায় ফিরে যেতে অনুরোধ করে রওয়ানা হন ঘাটের দিকে। বেশ খানিকটা দূরত্ব রক্ষা করে ওদিকে হাঁটতে হাঁটতে জানতে চাই—‘হোয়াট ইজ দ্য ম্যাটার, আগনেসা?’
জবাব দিতে গিয়ে দারুণভাবে ইমোশনাল হয়ে কথা বলেন আগনেসা। তার ইংরেজ বুলি কেমন যেন তালগোল পাকিয়ে যায়। তো মনোযোগ দিয়ে যা বুঝতে পারি, তা হচ্ছে—বনানী থেকে ছিঁড়েখুঁড়ে ফুল-চয়নের সাথে তিনি পুরুষদের অ্যাগ্রেসিভ আচরণের তেমন কোনো তফাত দেখতে পান না। যারা বিনা উসকানিতে ফুল ছিঁড়তে পারে, আকর্ষণীয় নারী দেখলে তাদের মনেও তো জাগতে পারে সেক্সুয়ালি অ্যাবিউস করার আকাঙ্ক্ষা?
আগনেসার কথা শুনে আমি একটু ভেবে প্রতিক্রিয়া জানাই, ‘ইউ মেইড ইয়োর পয়েন্ট, আই আন্ডারস্ট্যান্ড।’ ততক্ষণে আমরা এসে পড়েছি নদীঘাটে। মুখখানা বেজায় করুণ করে আগনেসা ফের বলেন, ‘কমেট-অর্কিডকে বলা হয় ডিপ কানেকশন ও পারফেক্ট হারমনির প্রতীক। এটা ছিঁড়ে দলেমথে কেউ অ্যাবিউস করুক, এটা আমি নিতে পারি না, আই অ্যাম স্যরি।’
মাঝিরা উঠে পড়ছেন নৌকায়। কাহিনাও নায়ে বসে তোয়ালে দিয়ে ঘষে ঘষে শুকিয়ে নিচ্ছে তার পা। তার পাশে বসে আরিস্তিদ জপে জপে শিখে নিচ্ছেন নৌকা ও মাঝির মালাগাছি প্রতিশব্দ—‘লাকানা ও সাম্বো’। আমরাও উঠে পড়ি নৌকায়।
আকাশের তীব্র নীলে লেগেছে গোলাপি ছাপ, তিসিরিবিহিনা নদীর সারফেস কেন জানি হয়ে উঠেছে সম্পূর্ণ নিস্তরঙ্গ, কেপক বা এক ধরনের শ্বেতশিমুলের কোণ ফেটে বাতাবরণে ভাসছে তুলা। ক্রমাগত বৈঠা মারার রিদমিক ধ্বনিপুঞ্জকে উপেক্ষা করে আগনেসা কথা বলেন, ‘হোয়াই ইউ আর সো কোয়াইট?’ বুঝতে পারি, মহিলা কথা বলার মুডে আছেন, তো জানতে চাই, ‘ইউ লাইক অর্কিড, ডু ইউ হ্যাভ এনি ইন ইয়োর হাউস?’
অত্যন্ত অপ্রত্যক্ষভাবে রেসপন্স করেন আগনেসা, ‘মাই লেইট হাজবেন্ড ব্লেস্ড মি উইথ মেনি থিংগস্, তার মারফত আমি পেয়েছি যমজ দুটি সন্তান, দে আর দ্য লাভ অব মাই লাইফ, বাগানে ছোট্ট গ্রিনহাউজ-ওয়ালা আমার পছন্দমতো একটি বাড়িও তিনি জোগাড় করে দিয়েছেন—যেখানে আমি চাষ করছি অর্কিডের। হি গেইভ মি প্রিটিমাচ এভরিথিং একসেপ্ট ওয়ান, দাম্পত্যজীবনে তার কম্পেনি আমি তেমন পাইনি।’
এবার প্রশ্ন না করে পারি না, ‘হোয়াই ওয়ার ইউ ডিপরাইভড অব হিজ কম্পেনি, আগনেসা?’ দিনযাপনের তিক্ততাকে এবার তিনি আর গোপন রাখেন না, সরাসরি জবাব দেন, ‘ইউ আন্ডারস্ট্যান্ড হি ওয়াজ অ্যা কনসালট্যান্ট অব কনসিডারেবোল ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যান্ডিং, ওই কনসালটেন্সি কাজেই তাকে যেতে হতো নানা দেশে—কখনো মেক্সিকো সিটি, কখনো বা ম্যানিলায়। নাউ টু টেল ইউ ট্রুথফুলি—কাজের উসিলায় সে যেসব নগরে সাময়িকভাবে বসবাস করেছে, সুইসাইডের পর তার আইফোন চেক করে আমি জানতে পারি, সব জায়গায়ই সে সাকসেসফুলি জুটিয়েছিল কোনো না কোনো নারী। হি ডিডন্ট হ্যাভ এনি টাইম ফর মি, হি ওয়াজ মোর ইন্টারেস্টেড টু স্ক্রু ইয়াং ওয়োম্যান ইন আদার কান্ট্রিজ।’
পাশের নৌকা থেকে ডাডাডি-তাসা গামছা উড়িয়ে নদীপাড়ে দর্শনীয় কিছুর দিকে ইশারা করেন। ওখানে কেপক গাছের ছত্রছাত্রায় গজিয়েছে মাঝারি মাপের গুচ্ছ গুচ্ছ জুজুবি বৃক্ষ। গাছগুলোতে খেজুরের মতো ঝেপে এসেছে মরচে রঙের ফল। মনে হয়, গিনিপিগ সাইজের কিছু বাদুুর পাতা ঝাঁকিয়ে পেড়ে খাচ্ছে ফলগুলো। পাশ দিয়ে ভেসে যায় আরিস্তিদ ও কাহিনার নৌকা। বাইনোকুলারে চোখ রেখে কাহিনা চাপাস্বরে বলে ওঠে, ‘লুক অ্যাট অল দিস কিউট লেমুর, এ প্রজাতিটি মাইস-লেমুর নামে পরিচিত।’ জীবনে আমি কখনো নৈসর্গিক প্রতিবেশে লেমুর দেখিনি, তাই ইঁদুর টাইপের লেমুর দেখে আমার রোমাঞ্চ হয়। ভাবি আমার এক্সাইটমেন্ট সহযাত্রী আগনেসার সঙ্গে শেয়ার করব, দেখি—মহিলা নীরবে চোখ মুছছেন।
গাছপালার প্রতিফলন কেটে কেটে আমাদের নাওগুলো ভেসে যায়, আর পাড়ের উপবন ফোঁড়ে থেকে থেকে ধ্বনিত হয় কোকিলের কুহু স্বর।