জাতীয় নিরাপত্তা ও সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকির কথা উল্লেখ করে বিদেশে তৈরি নতুন মানবাকৃতির (হিউম্যানয়েড) রোবট আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে চার পায়ের রোবট বা ‘রোবট কুকুর’ এবং বিদ্যুৎ রূপান্তরকারী পাওয়ার ইনভার্টারের নতুন আমদানিতেও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে দেশটির ফেডারেল কমিউনিকেশনস কমিশন (এফসিসি)। বিশ্লেষকদের মতে, এই পদক্ষেপের মূল লক্ষ্য চীন, যা বর্তমানে বৈশ্বিক মানবাকৃতির রোবট বাজারে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে।
এফসিসি চেয়ারম্যান ব্রেন্ডন কার মঙ্গলবার জানান, যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহ শৃঙ্খল (সাপ্লাই চেইন) সুরক্ষিত রাখতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, নিষেধাজ্ঞা নতুন সংস্করণের বিদেশি রোবট ও সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে।
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের আগামী সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র সফর এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সম্ভাব্য বৈঠকের আগে ওয়াশিংটনের এই পদক্ষেপ দুই দেশের সম্পর্ককে আরও উত্তপ্ত করে তুলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশ্বের মানবাকৃতির রোবট বাজারের প্রায় ৮৫ শতাংশই বর্তমানে চীনের নিয়ন্ত্রণে। দেশটি দীর্ঘদিন ধরে রোবটিকস ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে রাষ্ট্রীয় নীতিগত সহায়তা দিয়ে উৎপাদন ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়িয়েছে।
নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা পাওয়ার ইনভার্টার সরাসরি বিদ্যুৎ (ডিসি)কে পরিবর্তিত বিদ্যুৎ (এসি)তে রূপান্তর করে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবস্থা, ডেটা সেন্টার এবং গৃহস্থালি যন্ত্রপাতিতে এর ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। ফলে এই সিদ্ধান্তের প্রভাব জ্বালানি ও প্রযুক্তি খাতেও পড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এর আগে চীনা ড্রোনসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিপণ্যের আমদানিতে বিধিনিষেধ আরোপ এবং চীনে উন্নত মার্কিন প্রযুক্তি রপ্তানিতে কড়াকড়ি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে চীনের উন্মুক্ত উৎসের (ওপেন-সোর্স) কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেল ব্যবহারের ওপরও নতুন নিয়ন্ত্রণ আরোপের বিষয়টি বিবেচনা করছে ওয়াশিংটন।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান নিউ আমেরিকার জ্যেষ্ঠ ফেলো স্যাম স্যাকস বলেন, সেপ্টেম্বরে সম্ভাব্য ট্রাম্প-শি বৈঠককে সামনে রেখে দুই দেশের মধ্যে একের পর এক উত্তেজনার বিষয় সামনে আসছে।
মরগান স্ট্যানলির বিশ্লেষকদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে চীনের মানবাকৃতির রোবটের বাজার ১৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।
মর্নিংস্টারের বিশ্লেষক কাংইউশিয়াও লি বলেন, চীনা নির্মাতারা দ্রুত উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি খরচও উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে সক্ষম হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে তাদের প্রবেশ সীমিত করা হলে মার্কিন কোম্পানিগুলো মূল্য প্রতিযোগিতার চাপ থেকে কিছুটা সুরক্ষা পাবে। তবে এতে চীনের সামগ্রিক রোবট শিল্পের অগ্রযাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে ব্যাহত হবে না, কারণ তাদের শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ বাজার ও অন্যান্য রপ্তানি গন্তব্য রয়েছে।
প্রযুক্তি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ওমডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে প্রায় ১৫ হাজার মানবাকৃতির রোবট সরবরাহ করা হয়েছে। এর মধ্যে চীনের ইউনিট্রি ও এজিআইবট—দুটি প্রতিষ্ঠানই ৫ হাজারের বেশি রোবট সরবরাহ করেছে। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের টেসলা ও ফিগার এআইয়ের সরবরাহ ছিল কয়েকশ বা তারও কম।
যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্তের কড়া সমালোচনা করেছে বেইজিং। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিং বলেছেন, জাতীয় নিরাপত্তার ধারণাকে অযথা সম্প্রসারণ করে চীনা কোম্পানিগুলোকে দমন করার চেষ্টা করছে ওয়াশিংটন। তিনি সতর্ক করে বলেন, চীনা প্রতিষ্ঠানের বৈধ অধিকার ও স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেবে বেইজিং।
মাও নিং বলেন, ‘সংরক্ষণবাদ যুক্তরাষ্ট্রকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করবে না। বরং এতে মার্কিন কোম্পানি ও ভোক্তারাই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।’
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন নিষেধাজ্ঞা যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর পারস্পরিক সহযোগিতাকেও বাধাগ্রস্ত করতে পারে। সম্প্রতি এনভিডিয়া যে মানবাকৃতির রোবটের রেফারেন্স ডিজাইন উন্মোচন করেছে, সেখানে চীনের ইউনিট্রির রোবট চ্যাসিস ব্যবহৃত হয়েছে। অন্যদিকে, মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর (পেন্টাগন) সম্প্রতি ইউনিট্রিসহ কয়েকটি চীনা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানকে চীনা সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে। যদিও এই অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে আসছে চীন।