বিজ্ঞান মেলা থেকে কৌশলগত প্রদর্শনী: রোবট প্রযুক্তিতে চীনের উত্থান

আপডেট : ২৪ আগস্ট ২০২৬, ০৩:৩২ পিএম

চীনের রোবট প্রতিযোগিতাকে অনেকেই ‘রোবট অলিম্পিক’ বলে থাকেন। তবে মানুষের অলিম্পিকের সঙ্গে পার্থক্য হলো, এখানে প্রায় সব পদকই যেন যাচ্ছে চীনের দলগুলোর ঘরে।

গত এক দশকে চীনে আয়োজিত বিভিন্ন রোবট প্রতিযোগিতা দেশটির দ্রুত বিকশিত রোবট শিল্পের অগ্রগতির চিত্র তুলে ধরেছে। একই সঙ্গে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং যে খাতকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ শিল্প হিসেবে দেখছেন, সেখানে সাফল্য অর্জনের গুরুত্বও স্পষ্ট হয়েছে।

একসময় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, গবেষক ও শখের প্রযুক্তিপ্রেমীদের উদ্যোগে সীমিত পরিসরে এসব প্রতিযোগিতা আয়োজন করা হতো। এখন সেই রোবট গেমস রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচারিত জাতীয় প্রদর্শনীতে পরিণত হয়েছে। একই সঙ্গে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও এটি হয়ে উঠেছে বাস্তব জীবনে রোবটের ব্যবহারিক সক্ষমতা দেখানোর গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ।

শনিবার বেইজিংয়ে শুরু হয়েছে পাঁচ দিনের বিশ্ব হিউম্যানয়েড রোবট গেমস। এখন পর্যন্ত এটিই এই প্রতিযোগিতার সবচেয়ে বড় আয়োজন।

১৯৯৯-২০১৪: বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠে রোবট প্রতিযোগিতা

চীনে রোবট প্রতিযোগিতার শুরুটা হয়েছিল তুলনামূলক কম বাজেটের আয়োজন দিয়ে। একটি শিল্প সংগঠন ও ফুজিয়ান প্রদেশের স্থানীয় সরকারের সহযোগিতায় এসব প্রতিযোগিতায় মূলত বিশ্ববিদ্যালয়ের দলগুলো অংশ নিত।

তখনকার পরিবেশ ছিল অনেকটা বিজ্ঞান মেলা বা শিক্ষার্থীদের প্রকল্প প্রদর্শনীর মতো। পরবর্তী সময়ে যেসব বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এই খাতে প্রবেশ করে, তাদের উপস্থিতি তখনো তেমন ছিল না।

একটি প্রদর্শনীতে ছোট চাকার ওপর চলা রোবটগুলো ফুটবল খেলত। সংঘর্ষ এড়ানো ও বল খুঁজে বের করার মতো সীমিত কিছু কাজের জন্য রোবটগুলোতে আগে থেকেই প্রোগ্রাম করা অটোমেশন ব্যবহার করা হতো।

২০১৫: রোবট শিল্পে জাতীয় গুরুত্ব

২০১৫ সালে বেইজিংয়ে প্রথম বিশ্ব রোবট সম্মেলন আয়োজন করা হয়। এর মধ্য দিয়ে রোবট শিল্প চীনের জাতীয় অগ্রাধিকারের তালিকায় আরও দৃঢ়ভাবে জায়গা করে নেয়।

এর এক বছর আগে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং রোবট শিল্পকে উন্নত উৎপাদন খাতের ‘মুকুটের রত্ন’ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন বলে চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে।

২০১৫ সালের প্রদর্শনীতে মোবাইল রোবটকে ব্যাডমিন্টন খেলতে দেখা যায়। তারা শাটলককের গতিপথ অনুসরণ করে তা ফিরিয়ে দিতে পারত। দর্শকদের কাছে এটি আকর্ষণীয় প্রদর্শনী হলেও প্রযুক্তিগত দিক থেকে বড় কোনো অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হয়নি।

এ ধরনের রোবটে ২০১০-এর দশকে তৈরি দূরত্ব ও ছবি শনাক্তকারী সেন্সর ব্যবহার করা হতো। কোনো বস্তুর গতিপথ অনুমান করার প্রযুক্তির শিকড় অবশ্য আরও পুরোনো—১৯৯০-এর দশকে ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা গবেষকেরা এ ধরনের প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করেছিলেন।

২০২৩: গবেষণাগার থেকে ঘরের দরজায়

২০২৩ সালের মধ্যে বিশ্ব রোবট সম্মেলন প্রতিষ্ঠিত প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর নতুন উদ্ভাবন প্রদর্শন ও বাজারে আগ্রহ তৈরির গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হয়ে ওঠে।

এই সময়ে চীনের রোবট শিল্পের আরেকটি শক্তি স্পষ্ট হতে থাকে—দামের প্রতিযোগিতা।

চীনা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান শাওমির রোবট কুকুর ‘সাইবারডগ’ প্রদর্শনীতে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি করে। মানুষ স্মার্টফোন হাতে সেটিকে ঘিরে ছবি ও ভিডিও ধারণ করছিলেন।

শখের প্রযুক্তিপ্রেমীদের জন্য তৈরি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে সাইবারডগ বাজারে আসে প্রায় ১ হাজার ৫০০ ডলারে। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন ডায়নামিকসের চার পায়ের রোবট ‘স্পট’-এর দাম ছিল ৭৫ হাজার ডলারের বেশি।

২০২৫-২৬: হোঁচট থেকে বড় অগ্রগতি

২০২৫ সালের এপ্রিলে বেইজিংয়ে বিশ্বের প্রথম রোবট হাফ-ম্যারাথনে মানুষের দৌড়বিদদের পাশাপাশি অংশ নেয় হিউম্যানয়েড রোবট। প্রকৌশলীরা রোবটগুলোর পাশে দৌড়াচ্ছিলেন, যাতে প্রয়োজন হলে হস্তক্ষেপ করতে পারেন।

তবে অংশ নেওয়া রোবটগুলোর খুব অল্প সংখ্যকই দৌড় শেষ করতে পেরেছিল। কেউ কেউ শুরুর লাইনেই পড়ে যায়, আবার কেউ কেউ কয়েক মিটার যাওয়ার পর রেলিংয়ে ধাক্কা খেয়ে থেমে যায়।

এক বছর পর পরিস্থিতি অনেকটাই বদলে যায়। দ্বিতীয় বেইজিং হাফ-ম্যারাথনে ইউনিট্রির এইচ১ রোবট কোনো সহকারী ছাড়াই শেষ পর্যায়ে দ্রুতগতিতে দৌড়ায়।

২০২৬ সালের প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া ১০০টির বেশি রোবট দলের মধ্যে ৪৭টি দৌড় শেষ করতে পেরেছে বলে চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে।

সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে চীনা স্মার্টফোন নির্মাতা অনারের তৈরি ‘ফ্ল্যাশ’ নামের একটি হিউম্যানয়েড রোবট। এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ৫০ মিনিট ২৬ সেকেন্ডে হাফ-ম্যারাথন শেষ করে। মানুষের হাফ-ম্যারাথনের বিশ্ব রেকর্ডের তুলনায় এটি প্রায় সাত মিনিট দ্রুত।

বিশ্লেষক ও প্রযুক্তি খাতের কর্মকর্তারা বলছেন, দ্রুতগতির এই অগ্রগতির পেছনে রয়েছে ক্রমবর্ধমান সরবরাহ ব্যবস্থার প্রতিযোগিতা, সরকারি ভর্তুকি এবং বিভিন্ন যন্ত্রাংশের দাম কমে আসা।

এখানে সরকারের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ২০২১ সালে বেইজিংয়ের রোবট শিল্পের জন্য নেওয়া পাঁচ বছর মেয়াদি পরিকল্পনায় ভর্তুকি, গবেষণায় কর ছাড় এবং অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। লক্ষ্য ছিল চীনকে ‘বিশ্বব্যাপী রোবট প্রযুক্তি উদ্ভাবনের প্রধান উৎস’ হিসেবে গড়ে তোলা।

২০২৬ ও পরবর্তী সময়: এবার রোবটের হাতের পরীক্ষা

২০২৬ সালের বিশ্ব হিউম্যানয়েড রোবট গেমসে নতুন করে যুক্ত হয়েছে রোবটের হাতের দক্ষতা যাচাইয়ের প্রতিযোগিতা।

নির্ভুলতা ও গতির ভিত্তিতে রোবটদের বিচার করা হবে। স্ক্রু শক্ত করে লাগানো, বোতল খোলা এবং চিমটি দিয়ে ছোট পুঁতি তুলে নেওয়ার মতো সূক্ষ্ম কাজ করতে হবে তাদের।

বিশ্লেষকদের মতে, মানুষের মতো স্পর্শ ও সূক্ষ্ম নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে কাজ করতে পারে—এমন রোবট তৈরি করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে জটিল চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো কার্যকর হাত তৈরি করা।

রোবট গেমসে এখন কেবল দৌড় বা প্রদর্শনীর বদলে বাস্তব কাজের দক্ষতাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এর পেছনে রয়েছে দ্রুত বাড়তে থাকা এই শিল্পের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—প্রোটোটাইপ হিসেবে নয়, বাস্তব জীবনের কাজেও রোবটগুলো কতটা কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে, তা প্রমাণ করা।

সূত্র: রয়টার্স

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত