গল্প

ভারমিলিয়ন

নাজ যখন অডিটোরিয়ামে ঢুকল তখন অনুষ্ঠান কেবল শুরু হয়েছে, শিল্পীদের নাম ঘোষণা চলছে। কয়েক সেকেন্ড লাগল ধাতস্থ হতে। না, বেশ দেরিই করে ফেলেছে আজকে; সামনের দিক প্রায় পুরোটা ভরে গেছে। পেছনের দিকের একটা সিটে বসে পড়ল নাজ। ভ্রু কুঁচকে আছে ওর। কাজলা মেয়েগুলো সারাদিন গাল ফুলিয়ে থাকলেও ওর রিকশা থেকে নামবার অপেক্ষাতেই ছিল বোধ হয়। সুযোগ বুঝে ঝুপ করে মাথা বরাবর ভরা কলসগুলো উপুড় করে দিয়েছে, ওকে বেকায়দায় ফেলে নিশ্চয়ই আড়ালে খিলখিল করে হেসে উঠেছে।

একেবারে বকভেজা হয়ে গেছে নাজ। মেহগনি পাড় হলদে মণিপুরী শাড়িটা লেপ্টে আছে ওর শরীরের সঙ্গে। ইশ, পায়ের দিকের পাড়টায় বেশ কাদা লেগেছে! এ শাড়ি তো সাবান পানিতেও ভেজানো যাবে না। বিরক্তি চেপে এতক্ষণ পর ব্যাগ থেকে ফোনটা বের করে হাতে নিল। হিমি, তানি ওরা যে কোনদিকটায় বসেছে; এই আলো আঁধারীতে এখন কী করে খুঁজবে ওদের? একসঙ্গে বসলে কত ভালো হতো! অতটুকু পথ রিকশায় আসতে আজ যে এতটা সময় লেগে যাবে সেও কি জানত?

ফোনের ক্যামেরায় নিজেকে একঝলক দেখে নেয়। একেবারে ঝড়ের কাক; কুমকুমের ভি শেইপ ভারমিলিয়ন টিপটা হালকা লেপ্টে গেছে, আঙুল দিয়ে যতটা সম্ভব ঠিক করে নিল। ধুর, এই অন্ধকারে কে আর দেখছে ওকে! এদিক ওদিক কয়েকবার ঘাড় ঘুরিয়ে সেও বন্ধুদের দেখতে পেল না। সবার চোখেমুখে কালোর ওপর আলোর পলকা ডট আর অদ্ভুত গাম্ভীর্য; ছটফটানি থামিয়ে সঞ্চালকের দিকে মন দিল নাজ।

‘তবলায় রয়েছেন হামিদুল খান... সরোদে...’

এ নামটা তো অচেনা লাগল। আচ্ছা, পেছনের দিকে ওটা ইমন না? হতেই পারে, ও কি মিস করে একটা অনুষ্ঠানও? আজ স্টেজে নেই মানে অডিয়েন্সে বসেছে। আরেকবার ঘাড় ঘুরিয়ে দেখবে? না থাক, অযথা আদিখ্যেতা! নিজেকে বকে দেয় নাজ।

নাজও স্টেজে থাকে মাঝেমাঝে; সঞ্চালক যখন বলে ওঠে, ‘তানপুরায় রয়েছেন শেহনাজ চৌধুরী’, সে তখন মাথাটা হালকা ঝুঁকিয়ে মাপা হাসি হাসে। বুকের ওপর বেণিতে জড়ানো বেলি নয়তো ঝুলনখোঁপার গাজরা—ওরাও খানিকটা দুলে ওঠে তখন। নিজেকে ঠিক করপোরেট অফিসের নাজ মনে হয় না আর, মনে হয় খুব উঁচু কোনো রাজসভার বেদিতে মধ্যমণি হয়ে বসে আছে।

‘ইয়াদ পিয়া কি আয়ে’ দিয়ে পরিবেশনা শুরু হলো। আজ তানপুরাটা ধরেছে দুই ব্যাচ জুনিয়র এক ছেলে, নামটা কিছুতেই এখন মনে পড়ছে না। বেশ নার্ভাস, ফ্লোরের দিকে তাকিয়ে আছে। নাজের হাসি পায়। তবে তারও এখনো এমন হয়; বুক ঢিপঢিপ, আঙুলের কাঁপাকাঁপি। শেষবার যেদিন নজরুলজয়ন্তী হয়ে গেল, মাধব সারং ধরেছিল ওরা; বাঁ দিকে চোখ যেতেই সরোদ হাতে গভীর আশ্বাসের ভঙ্গিতে তাকিয়ে ছিল কেউ। 

শিরশির করে ওঠে নাজের শরীর; আঁচলটা ভালো করে জড়িয়ে বসে। ‘বইরী কোয়েলিয়া কুক শুনায়ে।’ তন্ময় হতে হতেই পেছন থেকে ডাক এলো, ‘দেখো! এরা আজকেও এসেছে!’

ইমনের আঙুলের দিকে তাকিয়ে নাজ দেখতে পায় ওদের—একজোড়া কোকিল।

‘এরা কি সেই একই জুটি?’

‘হতে পারে!’ শ্রাগ করল ইমন।

পুরোটা সময় কোকিল জুটিটি অডিটোরিয়ামের এ মাথা থেকে ওমাথায় গোত্তা খেল। খুনসুটি থেকে অভিসার পর্ব, তারপর ‘ইয়ে দুখ সহা না যায়ে’ হতে হতে শুভদৃষ্টি, মালাবদল হয়ে গেল। আহা, এ সময় স্টেজে সানাইটা বাজলে হতো! 

ইমন মাথা দুলিয়ে বলল, ‘বেশ হতো।’

ইমন কি একা এসেছে? নাজ এবার ভালো করে দেখবে বলে পেছনে তাকায়। সেই যে মেয়েটা, চেরি রেড হেয়ার যার, বাঁশির মতো নাক, কই এলো না তো আজ? কী যেন নাম, মহুয়া? নাজের মনে থাকে না অত সব। না থাকুক, সে চায়ও না অহেতুক লোকের নাম মনে রেখে নিউরনগুলোকে ক্লান্ত করতে।

তবু একজন নিউরন হাত তুলে বলে উঠল, ‘ললিতা রায়।’

সঙ্গে সঙ্গে আরেকজন বলল, ‘না, লাবণ্য দত্ত!’

নাজ নিরাসক্ত গলায় বলল, ‘সো হোয়াট!’

পেছন থেকে এবার ডাক এলো—‘অ্যাই, রইদ দেখবে? টিকিট আছে আমার কাছে।’

সঙ্গে সঙ্গে নিউরন জুটির কোরাস শুরু হলো—‘প্রেমজ্বালা মোর মনে গো সখী, প্রেমজ্বালা—’

আবার ভ্রু কুঁচকে যায় নাজের। এত বেয়াড়াপনা করবে জানলে এদের কাউকেই সঙ্গে আনত না আজ। পরেরবার কিছুতেই আনবে না, ইমনকেও না। 

সামনেই তাকিয়ে ছিল সে। ঠোঁটের কোণে ভাঁজ পড়ল একবার; ইমন তো ওর সঙ্গে আসেনি! দেখতে দেখতেই আবার ফিরে গেল মূর্ছনায়। ‘পরো সবুজ-ঘাগরি চোলি নীল ওড়না, মাখো অধরে মধুর হাসি, চোখে ছলনা।’ কী সুন্দর গাইছেন কৌশিকী! তবলায় ‘লাউনী’ তালের ঠেকা দিচ্ছেন হামিদুল ভাই; পাক্কা বাজিয়ে, নাজের ফেভারিট।

এই যা, নাম মনে পড়ে গেছে ওর—কাজরী, কাজরী ইসলাম। এত সুন্দর নাম যার তার চুলগুলো কেন অমন আগুনের মতো লাল? ইমনের সঙ্গে যায় এ রঙ? হোক, যেমন খুশি রঙ হোক। 

ইমনেরই গলা ভেসে আসছে বোধ হয়। কী এত বলছে সে? ঠিক আছে কাজরী আসেনি, একা একা সিনেমায় যেতে ভালো লাগবে না, একটা টিকিট রয়ে গেছে বলেই তো নাজকে সেধেছে। কী হয় গেলে? কোনো মারদাঙ্গা, বোম্বাস্টিক সিনেমা নয় যে সে নাক সিঁটকাবে! যেতে পারে কিন্তু যাবেই বা কেন? 

যা বলে বলুক, এবার আর ফিরে তাকাবে না। পাশের ভদ্রমহিলাটি এরই মাঝে দুবার কটমট করে তাকিয়েছে। নাজ সামনের দিকেই চোখমুখ স্থির করে বসে থাকে। তবু একসময় মুখের রেখা নরম হয়ে আসে। খুব অবাক হয়ে দেখতে পায় ওর দুই বাহু, হাতের আঙুলগুলো সরু হতে হতে প্রথমে মেহেদি লতা, তারপর আরও ক্ষীণ হতে হতে হয়ে ধাতব তার হয়ে উঠছে।

তবলার ঠেকা ফিকে হয়ে গেছে কখন ঠিক বুঝে উঠতে পারেনি নাজ। এখন হংসধ্বনি বাজছে তানপুরায়—সা-রে-গা-পা-নি। তারপর বাজল—‘ওগো যেওনা সজনী অভিসারে, নীপবনে এই আঁধারে...’। শেহনাজের আঙুল থেকে তানপুরার তার অন্তরা শেষে সঞ্চারী ছুঁয়েছে, মেহগনি রঙ-মৈরাং পাড় হলদে জমিন তানপুরা।

অডিটোরিয়ামে বৃষ্টি নেমে গেছে, রিমিক ঝিমিক সশব্দ বৃষ্টি। একটা মৃদু শোরগোল শুরু হলেও সবার হাতে হাতে একটা করে ছাতা জুটে যেতেই সেটা থেমে গেল। শুধু যারা যন্ত্র বাজিয়ে যাচ্ছে তারাই আকণ্ঠ ভিজে চলেছে। মণিপুরী তানপুরা, তবলার হামিদুল ভাই, ‘খেয়া পারাপারের’ কৌশিকী, আর পেছনের সারিতে সরোদ—সবাই ভিজে একসা।

শেহনাজ ফিরে তাকাল; একটা টলটলে ঝিল, তার বুক জুড়ে রেশমী জরিন হাওয়া। ওপারেই ইমন একটা উঁচু বেদিতে বসে আছে। তার চারপাশে সব শ্রোতা, কেউ ভিজছে না, সবার মাথার ওপরে একেকটা শামিয়ানা। শুধু ইমন ভিজে গেছে, ওর আঙুল থেকে মীড়ের লহরী ধনুকের মতো পিছলে বেরিয়ে আসছে। এপার থেকে ওপার মীড়ের সেতুতে ক্রমশ রেলিং হয়ে সেঁটে গেছে মৈরাং পাড়।

আরও কিছুক্ষণ পর বৃষ্টি কিছুটা ধরে এলো। বেদি থেকে নেমে আসছে সরোদ। বৃষ্টিছাপ গায়ে মেখে, সেতু পেরিয়ে এপারে আসতে আসতে ঝিলের এপারটাতেও বৃষ্টি থেমে গেছে। তানপুরা তখনো ঝড়ের পাখির মতো আগাগোড়া থরথর কাঁপছিল। একটু উষ্ণতার জন্য সরোদের গা ঘেঁষে দাঁড়াল, তাতেই আরেক পশলায় ভিজল দুজন। 

কোকিল জুটি বেশ অনেকটা সময় রেশমি হাওয়া গায়ে মেখে মধুচন্দ্রিমায় মেতে ছিল। ওরা বিদায় নিতেই হয়তো ঝিলটাও ফিরে যাবে বলে ঠিক করল। এদিকে সংগীতসন্ধ্যা শেষ; স্টেজ, অডিটোরিয়াম সব ফাঁকা হয়ে গেছে। এক এক করে বিদায় নিচ্ছে হারমোনিয়াম, তবলা, পাখোয়াজ। শুধু সরোদ আর তানপুরা তখনো অপেক্ষায় কখন শিবরঞ্জনী বাজবে, আর শেষ পশলা বৃষ্টি নামবে। সে অবধি কিছুটা সময় থেকে যায় ওরা। শেষ পশলার জলে ভারমিলিয়ন টিপটা পুরোপুরি ধুয়ে গেলে সরোদ খানিকটা ঝুঁকে আসবে; চুমু এঁকে দেবে মেহেগনি রঙের কপালে।