অপরাধ ব্যবস্থাপনা ও বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের ওপরে নজরদারি বাড়াতে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শুরু হয় রাজধানীতে বসবাসরত সাধারণ মানুষের বিভিন্ন ধরনের তথ্য সংগ্রহ। ২০১৬ সালে শুরু হওয়া নাগরিকের তথ্য সংরক্ষণের উদ্যোগটি যে কোনো ধরনের অপরাধ সংঘটনের পর মামলার রহস্য উদ্ঘাটনে সহায়ক হয়। ফলে নানামুখী সমালোচনা থাকলেও উদ্যোগটি প্রশংসা কুড়ায়। এ ছাড়া অপরাধ প্রতিরোধে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) দক্ষতাও বৃদ্ধি পায়। তবে বর্তমানে অপরাধ বাড়লেও সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন ভাড়াটিয়ার তথ্য সংগ্রহে ঢিলেঢালা ভাব রয়েছে পুলিশের। এতে সরকারের ঝুঁকি বাড়ছে বলেও মনে করছেন তাদের অনেকে। এদিকে ভাড়াটিয়ার তথ্য হালনাগাদে কোনো বাসা মালিকের গাফলতি দেখলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে ডিএমপি।
মহানগরে বসবাসরত নাগরিকের তথ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ এবং ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম শুরুর পর তথ্যের বহুবিধ ব্যবহার নিশ্চিতে প্রস্তুত করা হয় সিটিজেন ইনফরমেশন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (সিআইএমএস)। নাগরিক তথ্য সংগ্রহ প্রক্রিয়া ডিজিটালাইড করতে সিআইএমএস অ্যাপসও তৈরি হয়। যার আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় ২০১৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর। জানা গেছে, বর্তমানে সিআইএমএস তথ্যভা-ারে সংরক্ষিত রয়েছে প্রায় এক কোটি নাগরিকের তথ্য। এতে করে গত সরকারের আমলে তথ্য গোপন করে বা ভুল তথ্য দিয়ে বাড়িভাড়া নেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমানে বিষয়টি প্রায় উপেক্ষিত থাকায় রাজধানীতে অপরাধ বাড়ছে। সেই সঙ্গে কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠনগুলোর তৎপরতাও বাড়ছে।
সম্প্রতি ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের প্রকাশ্য কার্যক্রমে বিব্রত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনী। এ ছাড়া চরমপন্থি সংগঠনের কার্যক্রম মনিটরিংয়ের ক্ষেত্রেও অনেকটা শিথিলতা দেখা দিয়েছে বলে জানিয়েছে গোয়েন্দা সংস্থার একটি সূত্র। বাসাবাড়িতে ওঠা নতুন ভাড়াটিয়ার তথ্য সংগ্রহ এবং মেস-বাসাতে অবস্থানরত ব্যক্তিদের তথ্য হালনাগাদ না করার বিষয়টি স্বীকার করেছেন পুলিশের দায়িত্বশীল কয়েকজন কর্মকর্তা।
এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিএমপির এক ঊধ্বর্তন কর্মকর্তা জানান, ‘৫ আগস্ট ২০২৪-এর পর ভাড়াটিয়ার তথ্য সংগ্রহের কাজটি প্রায় বন্ধ রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বাসাবাড়িতে অপরাধের ঘটনা বাড়ায় ডিএমপির কিছু থানা এ বিষয়ে কাজের আগ্রহ দেখালেও সব থানায় তা শুরু হয়নি।’ তিনি বলেন, ডিএমপি সদর দপ্তর থেকে নির্দেশনা থাকলেও ঢিলেঢালা ভাব রয়েছে মাঠপর্যায়ে। রয়েছে বাসার মালিকদের গাফিলতিও। মালিকপক্ষ নিজ উদ্যোগে তথ্য সংগ্রহের কাজটি না করায় পুলিশকেও অপরাধ দমনে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
জানা গেছে, ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ভাড়াটিয়ার তথ্য সংগ্রহ কার্যক্রমে জোর দেয়। তারা বাসাবাড়ি ও মেসে নজরদারি বাড়াতে নতুন কৌশল নেয়। এ ক্ষেত্রে প্রথমে চরমপন্থি সংগঠনের সদস্যদের অবস্থানের কথা জানানো হয়, যা পরে বিএনপি-জামায়তের নেতাকর্মীদের ওপর নজরদারি বাড়ানোর কাজে ব্যবহৃত হয়।
পুলিশের এক ঊধ্বর্তন কর্মকর্তা বলেন, গত প্রায় ১৭ বছর যেভাবে সব কিছু চলেছে, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর সে অবস্থা আর নেই। এ সময়ের পর শীর্ষ সন্ত্রাসীসহ অধিকাংশ অপরাধী জামিনে ছাড়া পাওয়ার পরই আত্মগোপনে চলে গেছে। ফলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর পক্ষে তাদের ওপর মনিটরিং করা কঠিন হয়ে উঠেছে। এ কারণেই রাজধানীতে কদিন পর পর পরিকল্পিতভাবে টার্গেট কিলিংয়ের ঘটনা ঘটছে। ভাড়াটিয়াদের আপডেট তথ্য পুলিশের কাছে থাকলে অপরাধী ও নিষিদ্ধ সংগঠনের সদস্যদের ওপর মনিটরিং করা সুবিধা হতো বলেও তিনি জানান।
এদিকে একাধিক গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, আওয়ামী লীগসহ চরমপন্থি বিভিন্ন কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠনের সদস্যরা জামিনে বেরিয়ে আত্মগোপন করছে। এতে করে দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির আশঙ্কা রয়েছে। ইতিমধ্যে নিষিদ্ধ সংগঠনের মিছিল ও বিক্ষোভসহ চোরাগুপ্তা হামলার সংখ্যা বাড়ছে। দ্রুতই বাসাবাড়ির তথ্য সংগ্রহের কাজটি জোরদার করা না গেলে বড় ধরনের হামলার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। একই সূত্রে জানা গেছে, মাঠপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঢিলেঢালা নজরদারির বিষয়ে গোয়েন্দা সংস্থা থেকে সরকারের উচ্চপর্যায়ে চিঠি দিয়ে সতর্ক করা হয়েছে। পুলিশ অন্যান্য অপরাধীকে গ্রেপ্তারে ‘ক্রাক ডাউন’-এর মতো অভিযান পরিচালনা করলেও নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের ক্ষেত্রে তেমন উদ্যোগ নেই।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সবুজবাগ এলাকার এক বাসিন্দা জানান, গত বছরের মে মাসে ওহাব কলোনিতে বাসা ভাড়া নিয়েছিলাম। সেখানে ছয় মাস থাকার পর আবার বাসা পরিবর্তন করি। কিন্তু কোনো মালিকই তথ্য চায়নি। অথচ ২০২৪-এর ৫ আগস্টের আগে বাসা ভাড়া নিতে গিয়ে বিপাকেই পড়তে হতো। পরিবারের সব সদস্যের ফোন নম্বর পর্যন্ত দিতে হতো। এখন সেসবের কিছুই নেই।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গুলশানের এক বাড়ির মালিক বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রতি মাসে থানা পুলিশ বাসার মালিকদের কাছ থেকে নতুন ভাড়াটিয়াদের তথ্য সংগ্রহ করতেন। অনেক সময় থানায় গিয়ে নতুন ভাড়াটিয়ার তথ্য জানাতে বলতেন। কিন্তু এখন সেটা করা হচ্ছে না। তিনি বলেন, ভাড়াটিয়ার থেকে জাতীয় পরিচয়পত্র ও ছবি নিলেও আমাদের পক্ষে তো তাদের পক্ষে জানা সম্ভব না। অথচ কোনো অপরাধ সংগঠিত হলে সবার আগে বাড়িওয়ালাকেই হেনস্তা করা হয়।
ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) এসএন মো. নজরুল ইসলাম বলেন, বাসাবাড়ি ও মেসে নজরদারিতে কিছুটা শিথিলতা থাকলেও এখন আর সে সুযোগ নেই। পুলিশ আবার নতুন করে ভাড়াটিয়ার তথ্য সংগ্রহ শুরু করেছে। এ ছাড়া অনলাইন অ্যাপস সিআইএমএসে অ্যাকাউন্ট খুলে সেখানে নিয়মিত ভাড়াটিয়াদের তথ্য হালনাগাদ করতে হবে। এতে কোনো বাসার মালিকের গাফলতি দেখলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
যেভাবে সিআইএমএস মোবাইল অ্যাপসে নাগরিক তথ্য নিবন্ধন করা যাবে : প্রথমে গুগল প্লে স্টোরে গিয়ে সিআইএমএস ডিএমপি লিখে সার্চ দিয়ে অ্যাপসটি ডাউনলোড করতে হবে। তারপর লগইন অপশনে নিজের ফোন নম্বর দিয়ে নিবন্ধনে ক্লিক করতে হবে। এরপর একটি ভেরিফিকেশন কোড প্রদত্ত মোবাইলে পাঠানো হবে। ভেরিফিকেশন কোড অ্যাকটিভ করে পাসওয়ার্ড সেট করে লগইন করলে বিভিন্ন ক্যাটাগরি দেখতে পাবেন। এখান থেকে আপনার অপশনটিতে ক্লিক করলে একটি ফরম পাবেন। ফরমে প্রদত্ত ঘরে আপনার সব তথ্য নির্ভুলভাবে পূরণ করে সাবমিট করলে আপনার কাজ শেষ। তবে এ ক্ষেত্রে অবশ্যই আপনার মোবাইলে ইন্টারনেট সংযোগ থাকতে হবে। আপনার পূরণকৃত তথ্য সেন্ট্রাল ডাটাবেজে যুক্ত হওয়ার আগে থানার ওসি আপনার প্রদত্ত তথ্য যাচাই-বাছাই করে সঠিক থাকলে অ্যাপ্রুভাল দিলে সিআইএমএসের মূল ডাটাবেজে আপনার তথ্য যুক্ত হবে। আর যদি কোনো কারণে আপনার ফরম পূরণ অসম্পূর্ণ হয় বা তথ্যে ভুল থাকে, সে ক্ষেত্রে আপনার মোবাইলে এসএমএস দিয়ে জানানো হবে।