মামলা থমকে আছে ঠিকানা বিভ্রাট ও সাক্ষী সংকটে

উখিয়া-টেকনাফে সমুদ্রপথে মানব পাচার

আপডেট : ৩০ জুলাই ২০২৬, ০৩:১৪ এএম

কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফ সীমান্ত দিয়ে সাগরপথে অবৈধভাবে মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে মানব পাচারের ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়লেও, থমকে আছে এর আইনি প্রতিকার। কক্সবাজার আদালতের ট্রাইব্যুনালগুলোর তথ্য অনুযায়ী, জেলায় ৫৪০টি মানব পাচারের মামলা ঝুলে রয়েছে, যার বড় অংশই উখিয়া ও টেকনাফ থানা এলাকার। এই বিপুলসংখ্যক মামলার বিচার প্রক্রিয়া থমকে থাকার প্রধান কারণ অভিযোগপত্রে (চার্জশিট) উল্লেখিত সাক্ষীদের ঠিকানার গরমিল এবং বিচার চলাকালীন তাদের খুঁজে না পাওয়া। যথাসময়ে সাক্ষী হাজির করতে না পারার সুযোগে পার পেয়ে যাচ্ছে এই আন্তর্জাতিক পাচার চক্রের মূল হোতারা।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মামলাগুলোর একটি বড় অংশ মালয়েশিয়ায় পাচারের সঙ্গে জড়িত। টেকনাফ-উখিয়া, কক্সবাজার বা মহেশখালীর মতো উপকূলীয় অঞ্চলকে রুট হিসেবে ব্যবহার করে দালাল চক্র এই মরণফাঁদ পাতে। স্থানীয় দালালরা গ্রামের অসচেতন বা বেকার যুবকদের ‘ফ্রি ভিসা’ বা কম খরচে মালয়েশিয়ায় আকর্ষণীয় বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখায়। পরে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে থাইল্যান্ডের জঙ্গল পেরিয়ে রাতের আঁধারে তাদের মালয়েশিয়ায় পুশইন করা হয়। পথে মুক্তিপণ চেয়ে অনেকের ওপর নির্যাতনও চালানো হয়।

মিথ্যা ও কাল্পনিক ঠিকানা ব্যবহার : অনুসন্ধানে দেখা গেছে, পাচারকারী ও দালালেরা ভুক্তভোগীদের ট্রলারে তোলার আগে বা অপহরণের পর তাদের নাম-ঠিকানা সম্পূর্ণ ভুল বা কাল্পনিকভাবে নথিবদ্ধ করে। পরে মামলার এজাহার বা প্রাথমিক তদন্তে সেই ভুল তথ্যই যুক্ত হয়ে যায়। পাচারকারীদের কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া রোহিঙ্গাদের অনেকেই পরে এক ক্যাম্প থেকে অন্য ক্যাম্পে স্থানান্তরিত হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাদের ভাসানচরেও স্থানান্তর করা হয়। ফলে চার্জশিটে উল্লেখিত ক্যাম্প বা ব্লকের ঠিকানায় তাদের আর  খুঁজে পাওয়া যায় না। অনেকে আবার সমাজ ও লোকলজ্জার ভয়ে এলাকা ছেড়ে দেশের অন্যান্য প্রান্তে শ্রমিকের কাজে চলে যান। এ ছাড়া জানা যায়, টেকনাফ ও উখিয়ার দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলের দালাল চক্র অত্যন্ত শক্তিশালী। তাদের হুমকির মুখে অনেক সাক্ষী বা ভুক্তভোগী নিজেদের বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র আত্মগোপন করেন কিংবা আদালতে ভুল ঠিকানা সরবরাহ করে দায় এড়াতে চান।

আইনি মারপ্যাঁচে পিষ্ট কয়েকজন ভুক্তভোগী : উখিয়ার থাইংখালী ক্যাম্পের রোহিঙ্গা নারী আয়েশা বলেন, ‘দালালেরা আমায় মাত্র ২৫ হাজার টাকায় মালয়েশিয়া নিয়ে যাওয়ার লোভ দেখায়। টেকনাফের হোয়াইক্যং ইউনিয়নের লম্বাবিল সীমান্ত দিয়ে ট্রলারে তোলার আগে ওরা আমার সব কাগজ কেড়ে নেয় এবং খাতায় একটা ভুয়া নাম-ঠিকানা লেখে। পরে সাগরে ট্রলারডুবির পর কোস্ট গার্ড আমাদের উদ্ধার করে। পুলিশ যখন মামলা করে, তখন ওই ভুয়া ঠিকানাই নথিতে চলে যায়। এরপর আমি জীবন বাঁচাতে অন্য ক্যাম্পে চলে আসি। এখন আমি মামলা চালাতে চাইলেও পুলিশ আমাকে চার্জশিটের ঠিকানায় খুঁজে পায় না, আর দালালরা প্রকাশ্যেই ঘুরে বেড়াচ্ছে।’

টেকনাফের সাবরাং ইউনিয়নের নোয়াপাড়া এলাকার আবদুর করিম বলেন, ‘মালয়েশিয়ার লোভ দেখিয়ে আমাকে পাহাড়ি টর্চার সেলে আটকে রাখা হয়েছিল। পরিবার জমি বেচে ৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ দেওয়ার পর কোনোমতে প্রাণে বেঁচে ফিরি। থানায় মামলা করার পর থেকেই স্থানীয় প্রভাবশালী দালাল চক্র আমাকে ও আমার পরিবারকে এলাকা ছাড়ার হুমকি দিচ্ছে। ভয়ে আমি এখন চট্টগ্রামে এসে দিনমজুরি করি। আদালত থেকে নাকি আমার টেকনাফের বাড়িতে সমন গেছে, কিন্তু আমি তো সেখানে নেই। পুলিশ রিপোর্টে লিখে দিয়েছে ‘সাক্ষীকে পাওয়া যায়নি’। আমাদের ভুল ঠিকানার অজুহাতে মূল অপরাধীরা জামিন পেয়ে যাচ্ছে।’

কক্সবাজার জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত মানব পাচার আইনে মামলা হয়েছে ৫৪০টি। এসব মামলায় আসামি করা হয়েছে ২ হাজার ১৫৯ জনকে। গ্রেপ্তার করা হয়েছে প্রায় ৮০০ জনকে। পাচারের সময় ৩ হাজার ২২৩ জন নারী, পুরুষ ও শিশু উদ্ধার করা হয়েছে। থানার রেকর্ড অনুযায়ী, ৩৩টি মামলা ছাড়া সবকটি মালমায় চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাগরপথে মালয়েশিয়ায় পাচারের সময় রোহিঙ্গাসহ উদ্ধার করা হয়েছে ৬১৭ জনকে। এ সময় পাচারকাজে জড়িত ৪২ জন দালালকে গ্রেপ্তার করা হয়। একইভাবে জড়িতদের বিরুদ্ধে মানব পাচার আইনে মামলা দায়ের করা হয়েছে ৩০টি। এসব মামলা এখনো তদন্তাধীন।

মানব পাচারের ঘটনা বেড়ে যাওয়ার কারণে ২০১২ সালে কক্সবাজারে গঠিত হয় ট্রাইব্যুনাল (বিশেষ আদালত)। কিন্তু গত ১৪ বছরে মানব পাচার আইনের কোনো মামলা নিষ্পত্তি হয়নি। অথচ জামিনে গিয়ে পাচারকারী সিন্ডিকেটের সদস্যরা আবারও ফিরে গেছে পাচারের মতো অনৈতিক কাজে।

উখিয়া-টেকনাফ ও কক্সবাজারসহ দেশের অন্যান্য এলাকার সংঘবদ্ধ পাচারকারীরা রোহিঙ্গা শিবিরের পাচারকারীদের সঙ্গে সিন্ডিকেট করে উপকূলীয় ও সীমান্ত এলাকায় রমরমা পাচার কারবার চালিয়ে যাচ্ছে।

মামলার অগ্রগতি নিয়ে কক্সবাজার জেলার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-০২ বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) সৈয়দ মো. রেজাউর রহমান বলেন, ‘মানব পাচার মামলাগুলোর কোনো অগ্রগতি নেই। এগুলো অনেকটাই থমকে আছে। কারণ, স্পেশাল আদালতের প্রথম বিচারকের পদটি খালি রয়েছে গত এক বছর ধরে। বিশেষ করে মামলার ভিকটিম, বাদী, সাক্ষী ও আসামিরা একেকজন একেক এলাকার বাসিন্দা। এ কারণেও একটি নির্দিষ্ট তারিখে মামলার পক্ষভুক্ত সবাইকে আদালতে উপস্থিত করা সম্ভব হয় না। এসব কারণেই মামলা নিষ্পত্তি করা যাচ্ছে না। এ ছাড়া, মামলার তদন্তে পুলিশের সীমাহীন দুর্বলতাও মামলা নিষ্পত্তি করতে না পারার অন্যতম প্রধান কারণ।’

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ন্যাশনাল উইমেন লইয়ার্স অ্যাসোসিয়েনের কক্সবাজার কোঅর্ডিনেটর (লিগ্যাল সার্ভিস) বিশ্বজিৎ ভৌমিক জানান, ‘সাগরপথে মানব পাচার মামলার মূল ভিত্তিই হলো ভুক্তভোগী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য। কিন্তু টেকনাফ-উখিয়া অঞ্চলের মামলার চার্জশিটগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অর্ধেকের বেশি সাক্ষীর ঠিকানা ভুয়া বা অসম্পূর্ণ। আদালত থেকে বারবার সমন পাঠানো হলেও পুলিশ প্রতিবেদন দেয় ওই ঠিকানায় এই নামের কাউকে পাওয়া যায়নি’। সাক্ষীর অভাবে বছরের পর বছর মামলা ঝুলে থাকায় আসামিরা সহজেই জামিন পেয়ে যাচ্ছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। দ্রুত সাক্ষী সুরক্ষা আইন বাস্তবায়ন করা না গেলে অপরাধীদের সাজা দেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়বে।

এ বিষয়ে টেকনাফ মডেল থানার ওসি সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘উখিয়া ও টেকনাফের সীমান্ত এবং সমুদ্র উপকূল অত্যন্ত দুর্গম। পাচারের শিকার ব্যক্তিরা যখন উদ্ধার হন, তখন তারা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত থাকেন এবং অনেকেই সঠিক তথ্য দিতে পারেন না। বিশেষ করে রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রে ক্যাম্পের মাঝি বা ব্লক পরিবর্তনের কারণে তাদের ট্র্যাক করা কঠিন হয়ে পড়ে। তবে এই সমস্যা সমাধানে আমরা এখন বায়োমেট্রিক ডাটা এবং রোহিঙ্গা ডাটাবেজের সহায়তা নিচ্ছি। পাশাপাশি প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাক্ষীদের আদালতে আনা-নেওয়ার জন্য পুলিশ সদস্যের তৎপর করা হয়েছে।’

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, সাগরপথে মানব চোরাচালান বন্ধে সীমান্ত সুরক্ষার পাশাপাশি মামলার শুরু থেকেই সাক্ষীদের নিরাপত্তা, ডিজিটাল ট্র্যাকিং ও সঠিক পরিচয় নিশ্চিত করার জন্য পুলিশের তদন্ত কাঠামোতে আমূল পরিবর্তন আনা এখন সময়ের দাবি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত