একখন্ড সতেজ বন

জাতীয় বৃক্ষমেলায় পা রাখলেই মনে হবে হঠাৎ করে বনে চলে এসেছেন। ইট-পাথরের ধূসর নগরীর মধ্যে এই মেলা প্রাঙ্গণ যেন একখ- সতেজ বন। চারদিকে সারিবদ্ধ গাছপালা ও বিভিন্ন প্রজাতির গাছ দিয়ে সাজানো ছোট ছোট স্টল। কাঁচা মাটির গন্ধে নিমিষেই হারিয়ে যাবেন বন বাদাড়ের সেই সজীব আবহাওয়ায়। এ এক অপরূপ প্রাকৃতিক পরিবেশ রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে চীন-মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রসংলগ্ন জাতীয় বৃক্ষমেলা প্রাঙ্গণ।

‘বৃক্ষরোপণে সাজাই দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্যে গত ৯ জুলাই শুরু হওয়া এ মেলা চলবে আগামী ৭ আগস্ট পর্যন্ত। প্রতিদিনই ভিড় করছেন বিভিন্ন বয়সের বৃক্ষপ্রেমী। বন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এবারের মেলায় বন শিল্প উন্নয়ন করপোরেশন, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি), বন গবেষণা ইনস্টিটিউটসহ মোট ৮৫টি স্টল রয়েছে। পাশাপাশি দর্শনার্থীদের সুবিধার্থে রয়েছে চিকিৎসাসেবা কেন্দ্র, ব্রেস্টফিডিং কর্নার, তথ্যকেন্দ্র এবং বয়োজ্যেষ্ঠদের জন্য আলাদা বিশ্রামকক্ষ।

বন অধিদপ্তরের সোসিওলজিস্ট মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত বছরের তুলনায় এবারের বৃক্ষমেলার সাড়া অনেক বেশি। ঢাকায় প্রতি বছরই খোলা জায়গা কমে যাচ্ছে। অন্য দিকে গাছের প্রতি মানুষের আগ্রহ বেড়েছে। তাই মেলায় প্রতিদিনই দর্শনার্থীদের ভিড় থাকে। বিশেষ করে শুক্র ও শনিবার মানুষের ঢল নামে। এসব দিনে বেচাকেনাও বেশি হয়।’

বন অধিদপ্তরের গবেষণা কর্মকর্তা ‘শারমিন সুলতানা বলেন, ‘ছুটির দিন ছাড়াও প্রতিদিন সকাল থেকেই মেলায় মানুষের ভিড় থাকে। প্রতিদিন স্টলগুলোর বিক্রির তথ্য সংগ্রহ করে পরদিন প্রকাশ করা হয়। সর্বশেষ ২৮ জুলাই পর্যন্ত দশ লাখ ৫২ হাজার ৯৫৮টি গাছের চারা বিক্রি হয়েছে। এতে বিক্রির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে নয় কোটি ছয় লাখ ৯৬ হাজার ১৫৬ টাকা।’

মেলায় সবচেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে ঘর সাজানোর ইনডোর প্ল্যান্ট ও ছাদবাগানের গাছ। পাশাপাশি দর্শনার্থীদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বিদেশি জাতের রাম্বুটান ও মাল্টি-গ্রাফটিং আমগাছ। এ ছাড়া রয়েছে পারসিমন, আজওয়া খেজুর, পাকিস্তানি আনার এবং বিভিন্ন জনপ্রিয় জাতের আমের চারা। এসব গাছের ছোট আকারের চারা ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

ঢাকার কেরানীগঞ্জের একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য গাছ কিনতে এসেছেন মো. সুরজ। তিনি বলেন, ‘মাদ্রাসার ফল বাগানের জন্য গাছ নিয়েছি। প্রতি বছরই এই মেলার অপেক্ষায় থাকি। এবার পারসিমন, মাল্টা, সফেদা, আলুবোখারা, বিভিন্ন জাতের আম, রঙ্গন, কমলাসহ আরও কয়েক ধরনের গাছ কিনেছি।’ আরেক ক্রেতা জুনায়েদ আল হাবীব বলেন, ‘মানিকদী ক্যান্টনমেন্ট থেকে একটি বিদেশি প্রজাতির গাছের খোঁজে মেলায় এসেছিলাম। কাক্সিক্ষত গাছটি পেলেও এর পাতাগুলো কালচে পেয়েছি। তাই না কিনেই ফিরে যাচ্ছি।’

গতকাল মেলায় দর্শনার্থীদের মধ্যে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিও ছিল উল্লেখযোগ্য। ক্যামব্রিয়ান স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রায় দুই শতাধিক শিক্ষার্থী দলবেঁধে মেলা ঘুরে দেখেন। কেউ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ সম্পর্কে জানছেন, কেউ আবার ছবি তুলছেন। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আসা প্রতিষ্ঠানটির কো-অর্ডিনেটর আহসানুল হাবীব বলেন, ‘আমরা পঞ্চম শ্রেণি থেকে একাদশ শ্রেণির ২৫০ জন শিক্ষার্থীকে নিয়ে মেলায় এসেছি। তারা খুব আনন্দ করছে। অনেকেই আবারও মেলায় আসতে চায় বলে জানিয়েছে।’

রিকল গ্রিন নামক একটি নার্সারির ম্যানেজার রবিন হোসাইন বলেন, ‘আমাদের স্টলে বিভিন্ন প্রজাতির ফুলের গাছ রয়েছে, যার বেশির ভাগই বিদেশ থেকে আনা। এ ছাড়া টেরারিয়াম আমরা নিজেরাই তৈরি করি। অনলাইনেও বিক্রি করি। প্রতি বছরই এখানে স্টল দিই। গত বছরের তুলনায় এবার বিক্রি বেশি হচ্ছে। অনেক ক্রেতা অনলাইনে আমাদের পণ্য দেখে সরাসরি স্টলে এসে কিনছেন।’