মানব পাচার রোধে ইসলামের অবস্থান

মানুষ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। আল্লাহ তাকে মর্যাদা দিয়েছেন। সম্মান দিয়ে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার অধিকার দিয়েছেন। তাই মানুষের জীবন, সম্মান ও স্বাধীনতা নিয়ে ব্যবসা করার কোনো সুযোগ নেই। অথচ আজ বিশ্বের বহু দেশে মানব পাচার ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে, চাকরির লোভ দেখিয়ে, বিদেশে নেওয়ার প্রলোভন দিয়ে, এমনকি বিয়ের প্রস্তাবের আড়ালেও অসংখ্য মানুষ পাচারের শিকার হচ্ছে। কেউ বাধ্য হচ্ছে দাসত্বে। কেউ যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। কেউ হারিয়ে ফেলছে নিজের পরিচয়। কেউ আবার আর কখনোই ফিরে আসতে পারছে না পরিবারের কাছে। ইসলাম এই জঘন্য অপরাধকে কঠোরভাবে নিন্দা করেছে। মানুষের মর্যাদা রক্ষা এবং জুলুম প্রতিরোধকে ইমানের গুরুত্বপূর্ণ দাবি হিসেবে তুলে ধরেছে।

ইসলামের মূল শিক্ষা হলো মানুষের মর্যাদা রক্ষা করা। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি তো আদম সন্তানকে মর্যাদা দান করেছি, তাদের স্থলে ও সমুদ্রে চলাচলের ব্যবস্থা করেছি, তাদের উত্তম জীবিকা দিয়েছি এবং আমার সৃষ্টির অনেকের ওপর তাদের বিশেষ মর্যাদা দিয়েছি।’ (সুরা ইসরা ৭০)

এই আয়াত মানুষের সম্মানকে ইসলামের অন্যতম মৌলিক নীতিতে পরিণত করেছে। তাই কাউকে প্রতারণা করে বন্দি করা, বিক্রি করা বা জোরপূর্বক শ্রমে বাধ্য করা ইসলামের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। মানব পাচার মূলত মানুষের এই সম্মান ও স্বাধীনতাকে ছিনিয়ে নেওয়ারই নাম।

ইসলাম মানুষের জীবন, সম্পদ ও সম্মানকে অত্যন্ত পবিত্র ঘোষণা করেছে। বিদায় হজের ঐতিহাসিক ভাষণে হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমাদের রক্ত, তোমাদের সম্পদ এবং তোমাদের সম্মান তোমাদের জন্য ততটাই পবিত্র, যতটা পবিত্র এই দিন, এই মাস এবং এই শহর।’ (সহিহ বুখারি ১৭৩৯)

মানব পাচারের মাধ্যমে এই তিনটি অধিকারই একসঙ্গে লঙ্ঘিত হয়। মানুষের জীবন ঝুঁকিতে পড়ে। তার উপার্জন লুটে নেওয়া হয়। সম্মান নষ্ট করে দেওয়া হয়। ফলে এটি একাধিক কবিরা গুনাহের সমষ্টিতে পরিণত হয়।

মানব পাচারের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি জড়িত প্রতারণা। পাচারকারীরা কখনো বলে বিদেশে ভালো চাকরি দেবে। কখনো বলে উচ্চ বেতনের ব্যবস্থা করবে। আবার কখনো শিক্ষার সুযোগ বা বিয়ের প্রলোভন দেখায়। কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছানোর পর ভুক্তভোগীরা বুঝতে পারেন, তারা প্রতারণার শিকার হয়েছেন। ইসলাম এ ধরনের প্রতারণাকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে প্রতারণা করে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।’ (সহিহ মুসলিম ১০১)

এই হাদিস মানব পাচারের সঙ্গে জড়িত প্রত্যেক ব্যক্তি ও চক্রের জন্য কঠিন সতর্কবার্তা। কারণ তাদের পুরো কর্মকাণ্ডই মিথ্যা, ধোঁকা ও বিশ্বাসঘাতকতার ওপর প্রতিষ্ঠিত। মানব পাচার শুধু জুলুমই নয়, এটি হারাম উপার্জনের অন্যতম জঘন্য মাধ্যম। অসহায় মানুষের কান্না, রক্ত ও অশ্রুর বিনিময়ে অর্জিত অর্থ কখনো হালাল হতে পারে না। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা অন্যায়ভাবে একে অপরের সম্পদ ভক্ষণ কোরো না।’ (সুরা বাকারা ১৮৮)

হারাম সম্পদ মানুষকে সাময়িক স্বাচ্ছন্দ্য দিলেও তা বরকতহীন। আখেরাতে এর জন্য কঠিন জবাবদিহি করতে হবে। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) এমন এক ব্যক্তির কথা উল্লেখ করেছেন, যে দীর্ঘ সফর করে আল্লাহর কাছে দোয়া করে। কিন্তু তার খাদ্য হারাম। পানীয় হারাম। পোশাক হারাম। উপার্জন হারাম। তখন রাসুল (সা.) বলেন, ‘তার দোয়া কীভাবে কবুল হবে?’ (সহিহ মুসলিম ১০১৫) মানব পাচারের অর্থও এই হারাম উপার্জনের অন্তর্ভুক্ত। কোরআন জুলুমকে কঠোর ভাষায় নিন্দা করেছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘জালেমরা যা করছে, সেই সম্পর্কে আল্লাহকে কখনো উদাসীন মনে কোরো না। তিনি শুধু তাদের অবকাশ দিচ্ছেন এমন এক দিনের জন্য, যেদিন ভয়ে তাদের দৃষ্টি স্থির হয়ে যাবে।’ (সুরা ইবরাহিম ৪২) মানব পাচারকারীরা অনেক সময় আইনের চোখ ফাঁকি দিতে পারে। কিন্তু মহান আল্লাহর বিচার থেকে তারা কখনোই পালাতে পারবে না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মজলুমের দোয়া থেকে বেঁচে থাকো। কারণ তার দোয়া ও আল্লাহর মধ্যে কোনো পর্দা থাকে না।’ (সহিহ বুখারি ২৪৪৮)

মানব পাচারের শিকার একজন অসহায় মানুষের আহাজারি সরাসরি মহান আল্লাহর দরবারে পৌঁছে যায়। তাই এ অপরাধে জড়িতদের উচিত আল্লাহর শাস্তির ভয় করা।

বর্তমানে মানব পাচারের সবচেয়ে বড় শিকার নারী ও শিশু। ইসলাম নারীকে সম্মান দিয়েছে। তার নিরাপত্তাকে ফরজ দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করেছে। শিশুদের সুরক্ষা ও লালন-পালনের ব্যাপারে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। দুর্বল ও অসহায় মানুষের অধিকার রক্ষাকে ইমানের দাবি হিসেবে তুলে ধরেছে। তাই নারী ও শিশুকে পণ্য বানিয়ে ব্যবসা করা ইসলামের দৃষ্টিতে চরম অন্যায়।

মানব পাচার প্রতিরোধে পরিবারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অভিভাবকদের উচিত সন্তানদের সচেতন করা। বিদেশে পাঠানোর আগে সব তথ্য যাচাই করা। অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানের বাইরে কোনো দালালের কথায় বিশ্বাস না করা। অল্প লাভের আশায় বড় ক্ষতির পথে পা না বাড়ানো।

সমাজেরও দায়িত্ব কম নয়। মসজিদের খতিব, আলেম, শিক্ষক, সাংবাদিক এবং সমাজের সচেতন মানুষদের মানব পাচারের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা গড়ে তুলতে হবে। মানুষকে জানাতে হবে পাচারকারীদের কৌশল। সন্দেহজনক কোনো ঘটনা দেখলে সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষকে অবহিত করতে হবে। অন্যায় দেখেও নীরব থাকা একজন মুমিনের বৈশিষ্ট্য হতে পারে না।

রাষ্ট্রের দায়িত্ব আরও বিস্তৃত। পাচারকারীদের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। সীমান্তে কঠোর নজরদারি বাড়াতে হবে। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে ভুক্তভোগীদের পুনর্বাসন ও মানসিক সহায়তার ব্যবস্থা করতে হবে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা সৎকাজ ও তাকওয়ার ব্যাপারে একে অপরকে সহযোগিতা করো। পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে সহযোগিতা কোরো না।’ (সুরা মায়েদা ২)

এই আয়াতের আলোকে মানব পাচারের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করাও গুনাহ। দালাল, পরিবহনকারী, জাল কাগজপত্র প্রস্তুতকারী কিংবা আশ্রয়দাতা, যে কেউ এই অপরাধে সহযোগিতা করবে, সে অপরাধের অংশীদার হবে।

মানব পাচারের শিকার মানুষদের প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিও ইসলামের শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া উচিত। তাদের অবহেলা করা যাবে না। অপমান করা যাবে না। বরং তাদের মর্যাদা ফিরিয়ে দিতে হবে। কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। মানসিকভাবে সাহস জোগাতে হবে। ইসলাম বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোকে উত্তম আমল হিসেবে ঘোষণা করেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ বান্দার সাহায্যে থাকেন, যতক্ষণ বান্দা তার ভাইয়ের সাহায্যে থাকে।’ (সহিহ মুসলিম ২৬৯৯)

কেয়ামতের দিন মানুষের হক নষ্টকারীদের জন্য কঠিন বিচার অপেক্ষা করছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কেয়ামতের দিন অবশ্যই হকদারের হক আদায় করা হবে।’ (সহিহ মুসলিম ২৫৮২)

লেখক : ইমাম, খতিব ও মাদ্রাসাশিক্ষক