সৎ বন্ধু নির্বাচন

আপডেট : ৩০ জুলাই ২০২৬, ০৭:২৯ এএম

মানুষ একা বাঁচতে পারে না। জীবনের পথচলায় ভালো বন্ধুর প্রয়োজন হয়। কিন্তু সব বন্ধু কল্যাণের পথ দেখায় না। কেউ আলোর দিকে নিয়ে যায়। কেউ আবার অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেয়। তাই ইসলাম বন্ধুত্বকে শুধু সামাজিক সম্পর্ক হিসেবে দেখেনি। বরং ইমান, চরিত্র ও আখেরাতের সঙ্গে এর গভীর সম্পর্ক তুলে ধরেছে। তাই একজন মুসলমানের জন্য সৎ বন্ধু নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

ইসলাম মানুষের চরিত্র গঠনে বন্ধুর প্রভাবকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মানুষ তার বন্ধুর আদর্শের ওপর থাকে। তাই তোমাদের প্রত্যেকের উচিত, সে কার সঙ্গে বন্ধুত্ব করছে তা দেখে নেওয়া।’ (সুনানে আবু দাউদ ৪৮৩৩)

এই হাদিস জানিয়ে দেয়, একজন মানুষের চিন্তা, আচরণ ও জীবনধারায় তার বন্ধুর প্রভাব পড়ে। ভালো মানুষের সঙ্গে চললে ভালো গুণ অর্জিত হয়। আর অসৎ মানুষের সঙ্গে মিশলে অজান্তেই খারাপ অভ্যাস তৈরি হতে থাকে।

একজন নেককার বন্ধু আল্লাহর বড় নেয়ামত। সে নামাজের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। কোরআন তেলাওয়াতে উৎসাহিত করে। অন্যায় থেকে বিরত রাখে। বিপদে সাহস জোগায়। ভুল করলে সুন্দরভাবে সংশোধন করে। এমন বন্ধু শুধু দুনিয়ার জন্য নয়, আখেরাতের সফলতারও সহায়ক।

অন্যদিকে অসৎ বন্ধু মানুষের ইমান ও চরিত্র ধ্বংস করে দিতে পারে। পাপকে সহজ করে দেখায়। হারাম কাজে উৎসাহ দেয়। ভালো মানুষদের থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। কেয়ামতের দিন এমন বন্ধুত্বের জন্য মানুষ গভীর অনুতাপ করবে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘সেদিন জালেম ব্যক্তি নিজ হাত কামড়াতে কামড়াতে বলবে, হায়! আমি যদি রাসুলের পথ অনুসরণ করতাম। হায় দুর্ভোগ আমার! আমি যদি অমুককে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করতাম। সে তো আমার কাছে উপদেশ পৌঁছানোর পরও আমাকে তা থেকে বিচ্যুত করেছিল।’ (সুরা ফুরকান ২৭-২৯)

কোরআন আরও ঘোষণা করেছে, ‘সেদিন মুত্তাকিরা ছাড়া সব বন্ধু একে অপরের শত্রু হয়ে যাবে।’ (সুরা জুখরুফ ৬৭) অর্থাৎ যে বন্ধুত্ব আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য গড়ে ওঠে না, তা কেয়ামতের দিন কোনো উপকারে আসবে না। বরং অনুতাপের কারণ হবে।

প্রকৃত বন্ধু কখনো বন্ধুর ক্ষতি চায় না। সে সত্য কথা বলে। প্রয়োজনে কঠিন সত্যও ভালোবাসার সঙ্গে জানিয়ে দেয়। বন্ধুর গোপন বিষয় প্রকাশ করে না। তার সম্মান রক্ষা করে। অন্যের সামনে তার দোষ আলোচনা করে না। ইসলামে গিবত কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। তাই সত্যিকারের বন্ধু কখনো বন্ধুর অনুপস্থিতিতে তার সম্মান নষ্ট করে না।

বন্ধুত্বের অন্যতম দায়িত্ব হলো একে অপরকে সৎকাজে সহযোগিতা করা। কোনো বন্ধু যদি অন্যায় কাজে আহ্বান করে, তবে তার সেই আহ্বান গ্রহণ করা যাবে না। বন্ধুত্বের নামে আল্লাহর অবাধ্যতা করা কখনো বৈধ হতে পারে না।

বন্ধুর জন্য দোয়া করাও ইসলামের একটি সুন্দর শিক্ষা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কোনো মুসলমান তার ভাইয়ের অনুপস্থিতিতে দোয়া করলে একজন ফেরেশতা বলেন, ‘আমিন, তোমার জন্যও অনুরূপ কল্যাণ হোক।’ (সহিহ মুসলিম ২৭৩২)

এটি প্রমাণ করে, প্রকৃত বন্ধুত্ব শুধু একসঙ্গে সময় কাটানোর নাম নয়। বরং একে অপরের কল্যাণ কামনা করার নাম। রাসুলুল্লাহ (সা.) ও আবু বকর (রা.)-এর বন্ধুত্ব মুসলিম ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। এই বন্ধুত্বের ভিত্তি ছিল ইমান, বিশ্বাস, ত্যাগ ও আল্লাহর সন্তুষ্টি। বিপদের মুহূর্তেও তারা একে অপরের পাশে ছিলেন। এই আদর্শ আজও মুসলমানদের জন্য অনুসরণীয়।

বর্তমান সময়ে সামাজিক মাধ্যমে হাজারো মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়। কিন্তু পরিচিত সবাই বন্ধু নয়। ইসলামের দৃষ্টিতে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে বিশ্বস্ততা, সততা, নৈতিকতা ও তাকওয়ার ভিত্তিতে। তাই কারও বাহ্যিক চাকচিক্য দেখে নয়, তার চরিত্র ও দ্বীনদারিতা দেখে বন্ধুত্ব করা উচিত।

লেখক : ইসলামি গবেষক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত