সাত বছর আগের ঘটনা। গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেটেরিনারি মেডিসিন অনুষদের পঞ্চম ব্যাচের ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে ১২ দিনের জন্য দেশ ভ্রমণে বেরিয়েছি। ভ্রমণের পঞ্চম দিন সকালে রাঙ্গামাটি থেকে রওনা দিয়ে কাপ্তাই জাতীয় উদ্যানে আসতে ১২টা বেজে গেল। দুজন শিক্ষককে দিয়ে একটি গ্রুপকে পুরো কাপ্তাই এলাকা ঘুরে দেখতে পাঠিয়ে দিলাম। আর যারা একটু অভিযানপ্রিয় তাদের নিয়ে আমি ও ড. তৈমুর ইসলাম কাপ্তাই জাতীয় উদ্যানের বড় ছড়ায় নামলাম। ছড়ার সর্পিল পথ ধরে হাঁটছি। শীতকাল, ছড়ায় বেশি পানি নেই। কোথাও পায়ের পাতা ভেজে, কোথাও হাঁটু পানি। দুপুর সাড়ে ১২টা। হালকা একটু গরম। কিন্তু ছড়ায় পা পড়তেই একটা ঠা-া ভাব যেন শিড়াদাঁড়া বেয়ে পুরো দেহে ছড়িয়ে পড়ল।
প্রায় পঞ্চাশ মিনিট হেঁটে ছড়ার কয়েকটি বাঁক পেরিয়ে ৯ প্রজাতির পাখি, চার প্রজাতির প্রজাপতি ও এক প্রজাতির ফড়িংয়ের ছবি তুললাম। এরপর একটি বাঁকের মাথায় এসে ছড়ায় পড়ে থাকা একটি গাছের ডালে নীল রঙের একটি ছোট্ট পাখি বসে থাকতে দেখে চুপচাপ দাঁড়িয়ে গেলাম। আমি সবার আগে ছিলাম, তাই সংকেত দিয়ে যে যেখানে ছিল সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকতে বললাম। পাখিটির মুখে একটি মাছ। দ্রুত পজিশন নিয়ে ক্যামেরার ভিউ ফাইন্ডারে চোখ রেখে শাটারে ক্লিক করতে থাকলাম। মাত্র আটটি ক্লিক করতেই লাজুক পাখিটি উড়ে গেল। এক ঘণ্টা দশ মিনিট পর ফিরতি পথে আবারও পাখিটির দেখা পেলাম। তবে এবার ১২টি ক্লিক করতে পারলাম। প্রথম দেখার ওর পিঠ ও পেছনের দিকের ছবি তুলতে পেরেছিলাম। আর এবার দেহের পাশ ও বুক বা সামনের দিকের ছবি পেলাম। কাজেই কম ছবি তুলতে পারলেও প্রয়োজনীয় ছবিগুলোর সবই তোলা গেল। খুশি মনে ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে সামনের দিকে পা বাড়ালাম। সম্প্রতি পাখিটিকে ফটিকছড়ির হাজারিখিল বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য ও সুন্দরবনের পক্ষীর খালে দেখেছি।
কাপ্তাই জাতীয় উদ্যানের বড় ছড়ায় দেখা পাখিটি এদেশের বিরল আবাসিক পাখি নীলাভকান মাছরাঙা। নীলাভকান ছোট মাছরাঙা নামেও পরিচিত। পশ্চিমবঙ্গে ওর নাম নীলকর্ণ মাছরাঙা। ইংরেজি নাম ইষঁব-বধৎবফ করহমভরংযবৎ, উববঢ় ইষঁব করহমভরংযবৎ বা গধষধুংরধহ করহমভরংযবৎ। অ্যালসেডিনিডি বা মৎসরঙ্গ গোত্রের পাখিটির বৈজ্ঞানিক নাম অষপবফড় সবহরহঃরহম। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ওরা বাস করে।
নীলাভকান মাছরাঙা দেখতে অনেকটা ছোট মাছরাঙার মতো হলেও আকারে আরও ছোট। প্রাপ্তবয়স্ক পাখির দৈর্ঘ্য ১৫.৫-১৭.০ সেন্টিমিটার, প্রসারিত ডানা ২৪-২৬ সেন্টিমিটার ও ওজন ১৬-৩১ গ্রাম। দেহের উপরটা গাঢ় নীল ও নিচটা গাঢ় কমলা। গালের চারদিক, ঘাড় ও ডানা-ঢাকনি বেগুনি-নীল। গলা ও ঘাড়ের পাশে সাদা পট্টি রয়েছে। কান-ঢাকনি উজ্জ¦ল নীল। চোখ বাদামি। পা, পায়ের পাতা ও নখ গোলাপি-কমলা। ছোট মাছরাঙার সঙ্গে মূল পার্থক্য কান-ঢাকনি কমলার পরিবর্তে নীল, দেহের রঙ গাঢ় নীল ও বুক-পেট গাঢ় কমলা। স্ত্রী-পুরুষে পার্থক্য না থাকলেও পুরুষগুলো বেশি উজ্জ¦ল হয়। তাছাড়া পুরুষের উভয় চঞ্চু কালচে হলেও স্ত্রীর ওপরের চঞ্চু কালচে ও নিচের চঞ্চু লালচে-কমলা। অপ্রাপ্তবয়স্কগুলোর কান-ঢাকনি লালচে-কমলা ও চঞ্চুর আগায় সাদা দাগ থাকে।
নীলাভকান মাছরাঙা চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের মিশ্র চিরসবুজ বনের পাহাড়ি জলধারা ও ছড়া, সুন্দরবনসহ উপকূলীয় বাদা বন, এমনকি বরিশাল-বাগেরহাটের গ্রামীণ বন-বাগানসংলগ্ন জলাশয় বা খালের পাশে বাস করে। সাধারণত একাকী বা জোড়ায় বিচরণ করে। পানির উপরে ঝুলন্ত ডালে চুপচাপ বসে সুযোগের অপেক্ষায় থাকে এবং সুযোগ পেলেই সঙ্গে সঙ্গে শিকার ধরার জন্য পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ওরা ছায়াযুক্ত স্থান পছন্দ করে, ছোট মাছরাঙার মতো ন্যাড়া ডাল বা রোদে বসে না। ছোট ছোট মাছ ও জলজ পোকামাকড় খায়। শিকারের অপেক্ষায় বসে থাকার সময় বার বার মাথা ওঠানামা করায় ও লেজ নাড়ায়। তীক্ষ্ম কণ্ঠে ‘ট্রিইইইই-টিই...’ শব্দে একবারে ডাকে।
ফেব্রুয়ারি থেকে মে এদের প্রজননকাল। এ সময় খাল বা জলাশয়ের পাড়ে মাটিতে ৬০-১০০ সেন্টিমিটার লম্বা গর্ত খুঁড়ে বাসা বানায়। ডিম পাড়ে ৫-৭টি। গোলাকার ডিমগুলোর রঙ উজ্জ¦ল সাদা। ডিম ফুটে ছানা বেরুতে গড়ে ২১ দিন সময় লাগে। ছানারা গড়ে ২৩ দিনে উড়তে শিখে। আয়ুষ্কাল ৪-৫ বছর।
লেখক : পাখি ও বন্যপ্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসাবিশেষজ্ঞ