ভেলায় চড়ে ঝুঁকিপূর্ণ স্কুলযাত্রা

সকালবেলা বই-খাতা বুকে জড়িয়ে খালের পাড়ে এসে দাঁড়ায় ছোট্ট শিশুরা। স্কুলের ঘণ্টা বেজে ওঠার আগেই তাদের প্রথম পরীক্ষা-একটি ড্রামের ভেলায় চড়ে খাল পার হওয়া। ভেলাটি দুলতে থাকে, শিশুরা শক্ত করে ধরে রাখে পাশের রশি। কারও চোখে ভয়, কারও চোখে অভ্যাস। এভাবেই খুলনার সুন্দরবন-সংলগ্ন কয়রা উপজেলার মঠবাড়ী গ্রামের শত শত শিক্ষার্থীর দিন শুরু হয়।

২০০৯ সালের ২৫ মে ঘূর্ণিঝড় আইলার ভয়াল জলোচ্ছ্বাসে শাকবাড়িয়া নদীর বেড়িবাঁধ ভেঙে যায়। সেই ভয়ংকর স্রোতে গ্রামের মাঝখানে সৃষ্টি হয় একটি বিশাল খাল, যা মঠবাড়ী গ্রামকে দুই ভাগে বিভক্ত করে। খালের এক পাশে প্রতাপ স্মরণী মাধ্যমিক বিদ্যালয়, মঠবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কমিউনিটি ক্লিনিক ও সুপেয় পানির উৎস। অন্য পাশে কয়েক হাজার মানুষের বসতি। প্রতিদিন স্কুলে যাওয়া, চিকিৎসা নেওয়া কিংবা বিশুদ্ধ পানি সংগ্রহ-সবকিছুর জন্যই ভরসা সেই ড্রামের ভেলা।

স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রথমে ছোট নৌকায় পারাপার করা হলেও তা নিয়মিত পাওয়া যেত না। পরে গ্রামবাসী নিজেরাই প্লাস্টিকের ড্রাম ও কাঠ দিয়ে একটি ভেলা তৈরি করেন। সেটিই এখন পুরো গ্রামের জীবনরেখা। বর্ষাকালে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। স্রোত বেড়ে গেলে ভেলা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। অভিভাবকরা সন্তানকে স্কুলে পাঠিয়েও সারাক্ষণ দুশ্চিন্তায় থাকেন।

প্রতাপ স্মরণী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বলছেন, শুধু একটি সেতুর অভাবে অনেক শিক্ষার্থী নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসতে পারে না। দেরি, ঝুঁকি ও আতঙ্ক তাদের শিক্ষাজীবনের নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, গত ১৭ বছরে জনপ্রতিনিধি ও বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তারা বহুবার এলাকা পরিদর্শন করেছেন। সেতুর প্রতিশ্রুতিও মিলেছে। কিন্তু বাস্তবে কোনো স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণ হয়নি।

স্থানীয় ইউপি সদস্য আবু সাইদ বলেন, এই খালের দুই পাশে কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কমিউনিটি ক্লিনিক ও বাজার রয়েছে। প্রতিদিন শত শত শিক্ষার্থীসহ কয়েক হাজার মানুষ ঝুঁকি নিয়ে পারাপার করেন। একটি সেতু নির্মাণ হলে পুরো এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আসবে।

কয়রা উপজেলার মহারাজপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ বলেন, ইউনিয়ন পরিষদের সীমিত বাজেটে এত বড় খালের ওপর সেতু নির্মাণ সম্ভব নয়। বিষয়টি একাধিকবার উপজেলা সমন্বয় সভায় উত্থাপন করেছি। সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর দ্রুত একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণ করবে বলে আশা করছি।

কয়রা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আব্দুল্লাহ আল বাকী বলেন, শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। ইতোমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানানো হয়েছে। স্থায়ী সেতু নির্মাণের উদ্যোগের পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সমাধান হিসেবে নিরাপদ ভাসমান সেতুর বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।