খাবারের পেছনেই ব্যয় আয়ের ৬০ শতাংশ

আপডেট : ৩১ জুলাই ২০২৬, ০৭:৩০ এএম

সাধারণ মানুষের আয়ের বড় অংশই এখন খাবার কিনতেই চলে যাচ্ছে। নিম্ন আয়ের মানুষের ক্ষেত্রে এই ব্যয় আয়ের প্রায় ৬০ শতাংশে পৌঁছেছে। এ ছাড়া কৃষক থেকে ভোক্তার হাতে পৌঁছাতে চাল ও কাঁচা মরিচের দাম দ্বিগুণ হয়ে যাচ্ছে বলে জানিয়েছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টারে সিপিডির ‘দ্য ফুড প্রাইস চেইন : মার্কেটস, মার্জিনস অ্যান্ড ইন্টারমিডিয়ারিজ ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।

সংলাপে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, কৃষি অর্থনীতিবিদ এম এ সাত্তার ম-ল ও জাহাঙ্গীর আলম খান, কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এএইচএম সফিকুজ্জামান, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ন্যাশনাল একাউন্টিং উইংয়ের প্রধান মো. সাহাবুদ্দীন সরকার, সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুনসহ সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞরা অংশ নেন। এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগী ফখরুদ্দিন আল কবীর।

বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, কোভিডের সময় বিভিন্ন দেশে মূল্যস্ফীতি বাড়লেও পরে কমেছে। কিš‘ বাংলাদেশে কমছে না। এই উচ্চ মূল্যস্ফীতি থাকার অন্যতন কারণ হলো এ দেশে লজিস্টিক খরচ বেশি। সারা বিশ্বে লজিস্টিক খরচের সাধারণ হিসাব হলো মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১০ শতাংশের সমান, কিš‘ বাংলাদেশে তা ১৬ শতাংশ। সার্বিকভাবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে লজিস্টিক খরচ কমাতে হবে। আমদানি খরচও কমাতে হবে।

তিনি বলেন, ‘কেউ কেউ বাজারে জিনিসপত্রের দাম কমাতে চাঁদাবাজি বন্ধের কথা বলেন। আমি এটাকে বলি ‘আনঅ্যাকাউনটেন্ট’ খরচ কমাতে হবে। আমরা উৎপাদনের শুরু থেকে বাজার পর্যন্ত আসা প্রতিটি স্তরে কোথায় সমস্যা আছে, তা চিহ্নিত করছি।’

সিপিডি জানায়, খাদ্যের দামের সামান্য বৃদ্ধি সরাসরি মানুষের জীবনযাত্রার মানে প্রভাব ফেলে। দেশের ৬০ শতাংশের বেশি পরিবার তাদের মোট উপার্জনের অন্তত অর্ধেক খাবারের পেছনে ব্যয় করে। নিম্ন আয়ের মানুষের ক্ষেত্রে এই ব্যয় প্রায় ৬০ শতাংশ। উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময়ে প্রকৃত আয় কাক্সিক্ষত হারে না বাড়ায় মানুষকে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ অন্যান্য মৌলিক চাহিদার ব্যয় কমিয়ে খাবার কিনতে হচ্ছে।

বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশের সবচেয়ে নিচের ১০ শতাংশ পরিবার তাদের ব্যয়ের ৫৮ দশমিক ৪ শতাংশ, দ্বিতীয় স্তরের পরিবার ৫৬ দশমিক ৭ শতাংশ, তৃতীয় স্তর ৫৫ দশমিক ৯ শতাংশ এবং ধীরে ধীরে তা কমে সবচেয়ে ওপরের ১০ শতাংশ পরিবারের ক্ষেত্রে ৩৩ দশমিক ৩ শতাংশে নেমে আসে। প্রতিটি আয় শ্রেণিতেই শহরের তুলনায় গ্রামীণ পরিবারগুলোকে খাবারের পেছনে আয়ের বেশি অংশ ব্যয় করতে হয়।

সিপিডির তথ্যমতে, খামার থেকে ভোক্তা পর্যায়ে পৌঁছাতে একাধিক স্তরের কারণে অনেক পণ্যের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। ১০টি পণ্যের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দাম বাড়ছে কাঁচা মরিচের। খামার থেকে খুচরা পর্যায়ে পৌঁছাতে পণ্যটির দাম ১১৬ শতাংশ বাড়ে। একইভাবে চাল ১০০ শতাংশ, পেঁয়াজ ৮৭ শতাংশ, বেগুন ৭৮ শতাংশ, আলু ৭২ শতাংশ, মসুর ডাল ৫০ শতাংশ, ডিম ২৫ শতাংশ, গরুর মাংস ২২ শতাংশ, রুই মাছ ১৩ শতাংশ এবং মুরগি ১০ শতাংশ বাড়ছে।

বাজার ব্যবস্থার দুর্বলতা বিশ্লেষণে সিপিডি বলছে, ১০টি গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের মধ্যে ছয়টির সরবরাহে নগর আড়তদারদের বড় ভূমিকা রয়েছে। পেঁয়াজ, আলু, কাঁচা মরিচ, বেগুন, ডিম ও রুই মাছের ক্ষেত্রে খুচরা বিক্রেতারা মূলত নগর আড়তদারদের ওপর নির্ভরশীল। আলুর ক্ষেত্রে ৮০ শতাংশের বেশি সরবরাহ আসে নগর আড়তদারদের কাছ থেকে।

ফাহমিদা খাতুন বলেন, গত ৪ বছর ধরে মূল্যস্ফীতি দেশের অর্থনীতির জন্য বড় উদ্বেগের বিষয়। এর মধ্যে খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি মানুষের ওপর সবচেয়ে বেশি চাপ সৃষ্টি করছে। উৎপাদন, বিপণন, বাজারজাতকরণ, প্রাকৃতিক দুর্যোগে উৎপাদন ক্ষতি, বাজারের অদক্ষতা, মজুতদারি, সরবরাহ ঘাটতি ও প্রতিযোগিতা সবকিছুই এখানে খাদ্যের দাম বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত