১০ মাসের কাজ ১৮ মাসেও অসম্পূর্ণ

১০ মাসের প্রকল্প, পেরিয়ে গেছে ১৮ মাস। অথচ মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার ৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের জন্য শুরু হওয়া ওয়াশব্লকগুলোর কাজ এখনো পড়ে আছে অসম্পূর্ণ। সুপেয় পানি ও উন্নত স্যানিটেশন সুবিধার আশায় বুক বাঁধা কোমলমতি শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা এখন চরম স্যানিটেশন সংকট ও স্বাস্থ্যঝুঁকিতে দিন কাটাচ্ছেন। শুধু দীর্ঘসূত্রতাই নয়, নিয়ম ভেঙে মূল ঠিকাদারের পরিবর্তে ‘সাব-কন্ট্রাক্টে’ বহিরাগত লোক দিয়ে কাজ চালানো এবং কাজ অসম্পূর্ণ রেখেই অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশে পুরো বিল তুলে নেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।

মৌলভীবাজার জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ২০ নভেম্বর পিইডিপি-৪ প্রকল্পের অধীনে উপজেলার ৭টি স্কুলে (দরগাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, রসুলপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, তিলকপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, জামিরকোনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ড. চেরাগ উদ্দিন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ফুলবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও কোনাগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়) একতলা আইসোলেটেড আরসিসি ওয়াশব্লক নির্মাণের জন্য ১ কোটি ৩০ লাখ ৯৭ হাজার ৯৯৯ টাকা চুক্তিমূল্যে (স্মারক নং: ৪৬.০৩.৫৮০০.০৬১.১৪.১১৭.১৯-৩৮৬, প্যাকেজ নং: চঊউচ-৪/ডই-৩১৮২, টেন্ডার আইডি: ৯৮৫১৭৪) কুড়িগ্রামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘মেসার্স নুর ট্রেডার্স’কে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। চুক্তি অনুযায়ী ১০ মাসের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা থাকলেও প্রতিষ্ঠানটি ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে নামমাত্র কিছু কাজ করে তা বন্ধ করে দেয়। পরবর্তী সময়ে চলতি ২০২৬ সালের জুন মাসে বাজেট ফেরত যাওয়ার আশঙ্কায় মূল ঠিকাদারকে বাদ দিয়ে কুলাউড়ার সিরাজুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তিকে দিয়ে নতুন করে কাজ শুরু করায় উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর।

সরেজমিনে দেখা গেছে, সিংহভাগ স্কুলেই এখনো ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কাজ বাকি রয়েছে। উপজেলার ফুলবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, ভবনটির প্রায় ৪০ শতাংশ কাজই বকেয়া। প্লাস্টার, পানির লাইন, বেসিন, নিচের টাইলস ও সিঁড়ির কাজ আটকে আছে। তিলকপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও প্রায় ৩০ শতাংশ কাজ বাকি আছে। সেখানে নতুন ওয়াশব্লক তৈরির জন্য পুরনো বাথরুম ভেঙে ফেলায় শিক্ষক ও কোমলমতি ছাত্রীদের স্যানিটেশন সুবিধার জন্য বাধ্য হয়ে প্রতিদিন আশপাশের বাসাবাড়িতে যেতে হচ্ছে। একই দুর্বিষহ চিত্র পতনঊষারের রসুলপুর, দরগাপুর, কমলগঞ্জ পৌরসভার ডা. চেরাগ উদ্দিন, জামিরকোনা এবং আদমপুরের কোনাগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও।

এদিকে কার্যাদেশে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস-২০০৮ অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ে কাজ না হলে চুক্তি বাতিল ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা করা হয়নি। উল্টো নিম্নমানের ইট, খোয়া, টাইলস ও ফিটিংস ব্যবহার করে কাজ অসমাপ্ত রেখেই জুন মাসে পুরো বিল তুলে নেওয়া হয়েছে।

ওয়াশব্লক নির্মাণের কুড়িগ্রামের মূল ঠিকাদার নুর ট্রেডার্সের কাউকে কখনোই অফিসে আসতে দেখা যায়নি বলে জানিয়েছেন উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অফিসের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মচারী। তিনি বলেন, সম্পূর্ণ অবৈধভাবে সিরাজুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তি কমলগঞ্জের ওয়াশব্লকের কাজগুলো বাস্তবায়ন করছেন।

তিলকপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হোসনে আরা বেগম বলেন, ‘কোনো স্যানিটেশন বা পানির ব্যবস্থা না থাকায় তারা শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা চরম ভোগান্তিতে পড়ে পার্শ্ববর্তী বাড়িতে যেতে বাধ্য হচ্ছেন।’ ফুলবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শাহাব উদ্দিন, রসুলপুরের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ফাহিমা বেগম এবং জামিরকোনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ইসমত আরা দ্রুততম সময়ে ওয়াশব্লকগুলো সচল করার জোর দাবি জানান।

অফিসের মাধ্যমে কাজ করাচ্ছেন দাবি করে কুলাউড়ার সিরাজুল ইসলাম বলেন, কাজের বিষয়ে সবকিছু সুজন স্যার জানেন। আমাকে কাজ দিয়েছেন সুজন স্যার। স্যারের সঙ্গে যোগাযোগ করলে সব তথ্য পাবেন। তবে মূল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও এর মালিকের নাম জানতে চাইলে তিনি কোনো উত্তর দিতে পারেননি। এ বিষয়ে কমলগঞ্জ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এনামুল হক বাবর বলেন, ‘আমরা কেবল উপযোগী স্কুলের তালিকা তৈরি করে পাঠাই। মূল কাজ বাস্তবায়ন করে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর।’

এ অভিযোগের বিষয়ে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের কমলগঞ্জ উপজেলা উপ-সহকারী প্রকৌশলী সুজন আহাম্মেদ বলেন, ‘ওয়াশব্লকের কাজ করাচ্ছে নুর ট্রেডার্স নামের একটি প্রতিষ্ঠান। সিরাজুল তাদের ম্যানেজার। সে যদি বলে থাকে সব কাজ আমি করাচ্ছি, তাহলে লিখে দেন। আরও ভালো হলো। বর্ষার কারণে কাজ সমাপ্ত করা সম্ভব হয়নি। কাজে কোনো অনিয়ম হয়নি, সিডিউলের চেয়ে ভালো মানের টাইলস লাগানো হয়েছে।’ তবে ওয়াশব্লকের বিল উত্তোলনের বিষয়টি তিনি অস্বীকার করেন।