এআই নিয়ে বিচারব্যবস্থার চ্যালেঞ্জ

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একজন বিচারক, তার অভিজ্ঞতার বর্ণনায় লিখেছেন, ‘আজকে একজন বিজ্ঞ আইনজীবী এআই দিয়ে লেখা, একটি নারাজি পিটিশন জমা দিয়েছিলেন। বিশ্বাস করুন গত ৬-৭ মাসে, সম্ভবত প্রথম কোনো একটি পিটিশনে কিছু যুক্তি পেলাম। তাকে জিজ্ঞেস করার পর লজ্জা পেয়ে হেসেছেন। আইনজীবীরা ব্যস্ত, তাদের সময় নেই। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আইনজীবীর সহকারীরা কোনোরকমে হাতে লিখে নারাজি, অব্যাহতি, জামিনসহ বিভিন্ন পিটিশন জমা দেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘দ্বিতীয় মস্তিষ্ক’ হিসেবে এআইয়ের ব্যবহার ভালো মনে হয়।’ এরপর তিনি জানান, ‘দ্বিতীয় মস্তিষ্ক’ হিসেবে এআইয়ের ব্যবহার তার কাছে যথার্থ মনে হয়।

মন্তব্যটি হয়তো সাধারণ, কিন্তু অন্তর্নিহিত তাৎপর্য অসাধারণ। কারণ, কয়েকটি শব্দেই প্রতিফলিত হয়েছে আইন অঙ্গনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্রমবর্ধমান বিস্তার। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন ভবিষ্যতের কোনো প্রযুক্তি নয়। এটি বাংলাদেশের প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং বিচারব্যবস্থার বাস্তব অংশ হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে একটি মৌলিক আইনি প্রশ্ন সামনে এসেছে। যে তথ্য বা প্রমাণ একটি অ্যালগরিদম তৈরি করছে, আদালত কি তাকে মানুষের তৈরি সাক্ষ্যের মতো বিশ্বাস করবে? কয়েক বছরের মধ্যে আদালতকে এমন সব অডিও, ভিডিও, ছবি কিংবা ডিজিটাল তথ্যের মুখোমুখি হতে হবে যার বড় অংশ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দ্বারা তৈরি, পরিবর্তিত ও বিশ্লেষিত। বিচার সংশ্লিষ্ট সব পর্যায়ে সবাই মুখোমুখি হবেন প্রলয়ংকরী সংকটের। ফলে বিচারক, আইনজীবী এবং তদন্ত কর্মকর্তাদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে প্রকৃত বা কৃত্রিম, কোনটি?

আইন সাধারণত সমস্যার জন্মের পরে আসে। কিন্তু এআই এমন এক প্রযুক্তি, যা প্রতিদিন নতুন ধরনের সমস্যা সৃষ্টি করছে। ফলে বিচারব্যবস্থার সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন- প্রযুক্তিকে গ্রহণ করা হবে কি-না, সেটি নয় । বরং প্রশ্ন হলো, সত্যকে কীভাবে শনাক্ত করা হবে। যখন মিথ্যাও প্রযুক্তির সাহায্যে সত্যের মতো নিখুঁত হয়ে উঠতে পারে? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে ফিরে তাকাতে হবে বাংলাদেশের সাক্ষ্য আইন, ডিজিটাল প্রমাণের গ্রহণযোগ্যতা এবং ডিজিটাল ফরেনসিক ব্যবস্থার বর্তমান সক্ষমতার দিকে। কারণ এআই-এর যুগে বিচারব্যবস্থার সবচেয়ে বড় লড়াই, কেবল অপরাধীর বিরুদ্ধে নয়; বরং সত্য ও কৃত্রিম সত্যের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয়ের বিরুদ্ধে। এক সময় আদালতে জাল দলিল, বিকৃত নথি কিংবা সম্পাদিত ভিডিও ছিল প্রধান উদ্বেগের বিষয়। এখন সেই জায়গা দখল করেছে ডিপফেক, ভয়েস ক্লোনিং এবং জেনারেটিভ এআই। প্রযুক্তির এই নতুন বাস্তবতায়  একজন সাধারণ ব্যক্তি ঘরে বসে এমন ভিডিও তৈরি করতে পারেন, যেখানে দেখা যাচ্ছে কোনো ব্যক্তি ঘুষ নিচ্ছেন; কিংবা এমন অডিও  তৈরি করতে পারেন, যেখানে মনে হবে কোনো বিচারক, রাজনীতিবিদ বা ব্যবসায়ী নির্দিষ্ট বক্তব্য দিচ্ছেন। অথচ বাস্তবে এমন ঘটেনি। অসংখ্য ভয়েস ক্লোনিং অডিও, ভিডিও আমরা দেখছি। প্রযুক্তিবিদরা বলছেন, ভবিষ্যতে আরও নিখুঁত হবে। বর্তমান প্রযুক্তি সব ধরনের উন্নত ডিপফেক নির্ভুলভাবে শনাক্ত করতে সক্ষম নয়।  প্রযুক্তিগত সক্ষমতা শুধু সামাজিক বিভ্রান্তি নয়, এটি বিচারব্যবস্থার সবচেয়ে মৌলিক ভিত্তি তথা সত্যতাকে চ্যালেঞ্জ করছে। সাক্ষ্য আইন অনুযায়ী, কম্পিউটার থেকে উৎপাদিত তথ্য আদালতে উপস্থাপনের জন্য একটি ৬৫-বি সার্টিফিকেট প্রয়োজন। এই সার্টিফিকেট মূলত নিশ্চিত করে, সংশ্লিষ্ট কম্পিউটার সিস্টেম স্বাভাবিকভাবে পরিচালিত হয়েছে এবং উপস্থাপিত তথ্য সেই সিস্টেম থেকে এসেছে। কিন্তু এআইর ক্ষেত্রে প্রশ্নটি ভিন্ন।  এখানে শুধু জানতে হবে না তথ্যটি কোন কম্পিউটার থেকে এসেছে। বরং জানতে হবে, কোন এআই মডেল এটি তৈরি করেছে? কী ধরনের ডেটা দিয়ে তাকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে? অ্যালগরিদম কীভাবে এই ফলে পৌঁছেছে? সিদ্ধান্তটি পুনরায়  যাচাই করা সম্ভব কী-না? বর্তমান ৬৫-খ সার্টিফিকেট এসব প্রশ্নের কোনো উত্তর দেয় না। ফলে এআই-উৎপাদিত প্রমাণের ক্ষেত্রে, প্রয়োজনীয় হলেও যথেষ্ট নয়। ড. সালওয়া হকের গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো, অধিকাংশ উন্নত এআই ব্যবস্থা ব্ল্যাক-বক্স অ্যালগরিদম হিসেবে কাজ করে। অর্থাৎ একটি এআই কীভাবে একটি নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছাল, তার পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা অনেক ক্ষেত্রে নির্মাতা প্রতিষ্ঠানও দিতে পারে না। বিচারব্যবস্থার জন্য এটি গুরুতর সমস্যা। এআই সম্পর্কে একটি জনপ্রিয় ধারণা হলো, যন্ত্র মানুষের মতো পক্ষপাতদুষ্ট নয়। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। এআই মানুষের তৈরি তথ্য থেকে শেখে। যদি সেই তথ্যে বৈষম্য, ভুল বা অসমতা থাকে, তবে এআইর সিদ্ধান্তে তার প্রতিফলন ঘটবে। ড. সালওয়া হক তার গবেষণায়  দেখিয়েছেন, এআই-ভিত্তিক সিদ্ধান্তে নারী, সংখ্যালঘু এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বৈষম্যের ঝুঁকি বাস্তব এবং আন্তর্জাতিকভাবে

স্বীকৃত। এআইর নিরপেক্ষতা অনেকাংশেই নির্ভর করে তার প্রশিক্ষণ ডেটার গুণগত মান ও বৈচিত্র্যের ওপর। যদি ভবিষ্যতে বাংলাদেশে এআই-ভিত্তিক মুখমণ্ডল শনাক্তকরণ প্রযুক্তি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়, তবে ভুল শনাক্তকরণের দায় কে নেবে? আইনের পাশাপাশি আরেকটি প্রশ্ন, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা। এআই- জেনারেটেড ভিডিও বা ভয়েস ক্লোন আদালতে চ্যালেঞ্জ করা হলে, তদন্ত সংস্থা এবং ফরেনসিক পরীক্ষাগার কি সেটি নির্ভুলভাবে শনাক্ত করতে পারবে? সিআইডি, পিবিআই কিংবা অন্যান্য ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাব গত এক দশকে উল্লেখযোগ্য সক্ষমতা অর্জন করেছে। কিন্তু জেনারেটিভ এআই-নির্ভর জালিয়াতি শনাক্ত করা সম্পূর্ণ ভিন্ন মাত্রার প্রযুক্তিগত দক্ষতা দাবি করে। অগ্রসর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শনাক্তকরণ প্রযুক্তি, মেশিন লার্নিং ফরেনসিক বিশ্লেষণ, মেটাডেটা বিশ্লেষণ এবং স্বাধীন বিশেষজ্ঞ মূল্যায়ন ছাড়া, ভবিষ্যতের ডিজিটাল অপরাধ মোকাবিলা করা কঠিন। এখানেই বড় চ্যালেঞ্জ, নতুন আইন প্রণয়নের চেয়ে নতুন প্রযুক্তি বোঝার সক্ষমতা গড়ে তোলা। প্রমাণ শুধু গ্রহণযোগ্য হলে হবে না; সেটি প্রযুক্তিগতভাবে নির্ভরযোগ্য, ব্যাখ্যাযোগ্য এবং স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য। দেশের সাক্ষ্য আইনকে, সেই নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে।

বাংলাদেশ বর্তমানে জাতীয় এআই নীতি প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে। এটি অবশ্যই ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে শুধু একটি নতুন নীতি বা আইন প্রণয়ন করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। বিচারব্যবস্থার বাস্তব চ্যালেঞ্জ আরও গভীর। প্রথমত এআই-নির্ভর বিশ্লেষণ, ডিপফেক, ভয়েস ক্লোনিং বা অ্যালগরিদমিক সিদ্ধান্তের গ্রহণযোগ্যতার জন্য পৃথক মানদণ্ড নির্ধারণ করা সময়ের দাবি। দ্বিতীয়ত, ধারা ৬৫খ-কে আধুনিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে পুনর্বিবেচনা করতে হবে। শুধু কম্পিউটার আউটপুটের সত্যতা নিশ্চিত করাই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজনে এআই মডেলের নির্ভরযোগ্যতা, ব্যবহৃত ডেটার উৎস, সফটওয়্যারের সংস্করণ, অডিট ট্রেইল এবং স্বাধীন ফরেনসিক যাচাই সম্পর্কেও তথ্য আদালতের সামনে উপস্থাপনের ব্যবস্থা থাকতে হবে। তৃতীয়ত, ডিজিটাল ফরেনসিক অবকাঠামো শক্তিশালী করা এখন আর অতি উচ্চ অভিলাস নয়; এটি বিচারব্যবস্থার অপরিহার্য শর্ত। সিআইডি, পিবিআই এবং অন্যান্য ফরেনসিক প্রতিষ্ঠানে এআই-ভিত্তিক জালিয়াতি শনাক্তকরণ প্রযুক্তি, উন্নত সফটওয়্যার এবং আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে প্রয়োজনে স্বাধীন বিশেষজ্ঞ সাক্ষ্যের ব্যবহার আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া উচিত। চতুর্থত, বিচারক, আইনজীবী, প্রসিকিউটর এবং তদন্ত কর্মকর্তাদের ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ অত্যন্ত জরুরি। এআই-উৎপাদিত প্রমাণের প্রযুক্তিগত প্রকৃতি না বুঝে তার আইনি মূল্যায় ন করা সম্ভব নয়। জুডিশিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ট্রেনিং ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ বার কাউন্সিল এবং আইন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে এ বিষয়ে বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করতে হবে। পঞ্চমত, এআই ব্যবহারে নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৭, ৩১, ৩২ ও ৩৫ যে সমতা, আইনের আশ্রয়, ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা দেয়, এআই-নির্ভর প্রশাসনিক বা বিচারিক সিদ্ধান্তেও সেই সুরক্ষা অক্ষুন্ন থাকতে হবে। কোনো ব্যক্তি যেন শুধু একটি অ্যালগরিদমের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে দোষী সাব্যস্ত না হন, সেই নিশ্চয়তা আইনে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হওয়া উচিত। আদালতকে হয়তো খুব শিগগির এমন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে একটি এআই-উৎপাদিত ভিডিও কি মানুষের প্রত্যক্ষ সাক্ষ্যের সমান বিশ্বাসযোগ্য? একটি অ্যালগরিদমের বিশ্লেষণ কি বিশেষজ্ঞ সাক্ষ্যের বিকল্প হতে পারে? আর যদি এআই ভুল করে, তবে সেই ভুলের আইনি দায় কার?

আমাদের এমন একটি আইনি কাঠামো গড়ে তুলতে হবে, যা প্রযুক্তির অগ্রগতিকে স্বাগত জানাবে। একই সঙ্গে নাগরিকের মৌলিক অধিকার, ন্যায়বিচার এবং প্রমাণের নির্ভরযোগ্যতাও সুরক্ষিত রাখবে। ড. সালওয়া হকের গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা দিয়েছে। বিচারব্যবস্থার শক্তি কেবল প্রযুক্তিতে নয়; বরং সত্য অনুসন্ধানের সক্ষমতা, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি এবং আইনের শাসনের প্রতি অবিচল আস্থায় নিহিত। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সৃষ্ট মায়াজালে যখন সত্য ও মিথ্যার সীমারেখা ক্রমে অস্পষ্ট হয়ে উঠছে, তখন বাংলাদেশের সামনে প্রকৃত চ্যালেঞ্জ এআইকে গ্রহণ করা নয়; বরং এমন একটি আইনগত ও বিচারিক কাঠামো গড়ে তোলা, যেখানে এআই সত্য উদঘাটনের কার্যকর সহায়ক হিসেবে কাজ করবে। কিন্তু সত্যের বিকল্প বা বিচারকের স্বাধীন বিচারবোধের প্রতিস্থাপক নয়।

লেখক : বিভাগীয় প্রধান আইন বিভাগ, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয়

kaziminer@gmail.com