আধুনিক ফুটবলে যখন ক্লাব বদল বা অর্থের মোহ নিত্যদিনের ঘটনা, তখন ফ্রাঙ্কো বারেসি ছিলেন এক বিরল উপাখ্যান, যিনি ফুটবল ক্যারিয়ারের পুরো ২০ বছর সঁপে দিয়েছিলেন কেবল একটি জার্সির কাছে। ইতালির রক্ষণভাগে তিনি যখন দাঁড়াতেন, তখন প্রতিপক্ষ স্ট্রাইকারদের জন্য গোল করা হয়ে উঠত অসম্ভব এক চ্যালেঞ্জ। আবার ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে তার সেই অশ্রুসিক্ত মুখ আজও ফুটবলপ্রেমীদের কাঁদায়। বিশ্ব ফুটবলের ‘ডিফেন্স মিনিস্টার’ খ্যাত এই কিংবদন্তি ৬৬ বছর বয়সে জীবনের অধ্যায়ের সমাপ্তি টেনে ক্যানসারের কাছে হেরে চিরবিদায় নিলেন।
তার এই প্রয়াণে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে পুরো বিশ্ব ফুটবলে। ক্লাব এবং সমর্থকদের হৃদয়ে অমর হয়ে থাকা এই নায়কের বিদায়ে এসি মিলান এক আবেগঘন বিবৃতিতে জানিয়েছে, ‘মিলান আজ শোকে ভাসছে। ফ্রাঙ্কো বারেসির সততা এবং আদর্শ সবসময় আমাদের ক্লাবের ডিএনএ ও পথচলার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে থাকবে, ঠিক যেমন অমর হয়ে আছে তার ৬ নম্বর জার্সিটি।’
১৯৬০ সালের ৮ মে জন্ম নেওয়া বারেসির শৈশবটা মোটেও সহজ ছিল না। মাত্র ১৪ বছর বয়সে মা-বাবাকে হারান তিনি। বড় ভাই জুসেপ্পে বারেসি (বেপ্পে) ইন্টার মিলানে সুযোগ পেলেও, ছোটবেলায় ইন্টারের ট্রায়ালে প্রত্যাখ্যাত হয়ে ১৯৭৭ সালে মাত্র ১৭ বছর বয়সে এসি মিলানের জার্সি গায়ে জড়ান বারেসি। এরপর দীর্ঘ ২০ বছরের পেশাদার ক্যারিয়ারের পুরোটাই কাটিয়েছেন কেবল এই একটি ক্লাবের হয়ে। মিলানের বরেণ্য সাংবাদিক গিয়ান্নি ব্রেরা তাকে ভালোবেসে ডাকতেন ‘পিসিনিন’ (মিলানিজ ভাষায় যার অর্থ দুর্বল গড়নের তরুণ) বলে। অথচ এই ‘পিসিনিন’-ই পরবর্তী সময়ে হয়ে ওঠেন ইতালিয়ান ডিফেন্সের সবচেয়ে বড় প্রাচীর।
মাত্র ২২ বছর বয়সে দলের অধিনায়কের আর্মব্যান্ড হাতে পাওয়া বারেসি মিলানের হয়ে ৭১৯ ম্যাচ খেলে জয় করেছেন ৬টি সিরি ‘আ’ ও ৩টি উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগসহ অসংখ্য শিরোপা। ড্রেসিংরুমে অত্যন্ত শান্ত ও পরিমিতভাষী হলেও মাঠের ভেতরে বারেসি ছিলেন অনন্য ক্ষমতার প্রতীক। কোচ আরিগো সাচ্চির কৌশলগত ‘অফসাইড ট্র্যাপ’-এর শেষ প্রহরী হিসেবে তিনি একাই পুরো রক্ষণভাগ নিয়ন্ত্রণ করতেন। পাওলো মালদিনি, আলেসান্দ্রো কোস্তাকুর্তা ও মাউরো তসোত্তির মতো কিংবদন্তিদের নিয়ে গড়া তার সেই রক্ষণভাগ ইউরোপীয় ফুটবলের অন্যতম ভয়ংকর ও শৃঙ্খলাপূর্ণ দুর্গ হিসেবে ইতিহাসে অমর হয়ে আছে। মিলানের পাশাপাশি ইতালি জাতীয় দলের হয়েও ৮১টি ম্যাচ খেলেছেন তিনি; ১৯৮২ সালের বিশ্বকাপজয়ী দলের সদস্য থাকার পাশাপাশি ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপে চোটে পড়েও ফাইনালে দলকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।