যে ফুটবল কোটি কোটি মানুষের আবেগের খোরাক, তাকে কি নিছক একটি বাণিজ্যিক পণ্য বা ব্যবসার হাতিয়ার বানানোর পরিকল্পনা? এই প্রশ্নটিই এখন টালমাটাল করে দিয়েছে বিশ্ব ফুটবলের মসনদকে। ফিফার অন্দরে তৈরি হওয়া এক বিতর্কিত আর্থিক প্রস্তাব ঘিরে ফুটবল বিশ্বে এখন মুখোমুখি অবস্থান তৈরি হয়েছে। একদিকে মুনাফার বড়াই করা ফিফা কর্তারা, আর অন্যদিকে ঐতিহ্য রক্ষায় মাঠে নেমে পড়া গোটা ফুটবল পরিবার।
বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক স্বত্ব বেসরকারি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছে হস্তান্তরের এই উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা বিশ্ব ফুটবলের মানচিত্রে এমন এক নজিরবিহীন ফাটল ধরিয়েছে, যার শেষ কোথায়? তা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে পুরো ক্রীড়াঙ্গনে।
মূলত বৈশ্বিক ফুটবলের প্রধান ইভেন্টগুলো পরিচালনার জন্য ‘ফিফা ফরওয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ’ (এফএফই) নামের একটি বাণিজ্যিক সহযোগী প্রতিষ্ঠান গড়ার পরিকল্পনা করেছে ফিফা। যেখানে আমেরিকার প্রাইভেট ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফার্ম ‘থ্রাইভ ইটার্নাল’-এর মতো বহিরাগত বিনিয়োগকারীদের অনিয়ন্ত্রণমূলক অংশীদারত্ব দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক জেপি মরগানের তৈরি করা ২৫ পৃষ্ঠার সেই নথিতে সদস্য দেশগুলোর আর্থিক লভ্যাংশ বা তহবিল বাড়ানোর কথা বলা হলেও, ফিফার এই সিদ্ধান্তে তীব্র আপত্তি জানিয়েছে উয়েফা, কনকাকাফ এবং সর্বশেষ এএফসি। ফিফার লোভনীয় এই প্রস্তাবের বিপরীতে প্রতিটি সদস্য দেশকে সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে রাজি করাতে পারলে ৪০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার অনুদানের লোভ দেখানো হয়েছে। তবে সমালোচকদের মতে, ফুটবলের মতো সামাজিক একটি ভালো উদ্যোগকে প্রাতিষ্ঠানিক মুনাফার হাতিয়ার বানানোর চেষ্টা করা হচ্ছে, যা প্রকারান্তরে খেলাটির ভবিষ্যৎকে বন্ধক রাখার শামিল।
ইনফান্তিনোর এই পরিকল্পনার বিরুদ্ধে সবচেয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফা। প্রস্তাব বাস্তবায়ন হলে বিশ্বকাপ বয়কটের মতো চরম হুঁশিয়ারিও দিয়ে রেখেছে তারা। উয়েফার সুরেই সুর মিলিয়ে উত্তর ও মধ্য আমেরিকা এবং ক্যারিবীয় অঞ্চলের সংস্থা ‘কনকাকাফ’। পাশাপাশি বাংলাদেশসহ এশিয়ার ৪৭টি দেশের প্রতিনিধিত্বকারী সংস্থা ‘এএফসি’-ও ফিফার এই পরিকল্পনা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। এএফসি এক বিবৃতিতে সাফ জানিয়ে দিয়েছে, ‘ফিফার এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যাপক ঐকমত্য এবং একতা বাস্তবসম্মতভাবে অর্জন করা সম্ভব নয়। যেকোনো প্রস্তাব যা প্রতিযোগিতার ঐক্য এবং সর্বজনীন চরিত্রকে হুমকির মুখে ফেলে, তা অবশ্যই পুনর্বিবেচনা করা উচিত।’