অনলাইন জুয়া, বেটিং ও ক্রিপ্টোকারেন্সি-সংশ্লিষ্ট কর্মকা-ের আড়ালে দেশে গড়ে উঠছে বিপুল অঙ্কের সন্দেহজনক অর্থ লেনদেনের নেটওয়ার্ক। গত ৪ বছরে এসব কর্মকা-ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সন্দেহজনক লেনদেনের পরিমাণ ছাড়িয়েছে ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা। এই সময়ে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) কাছে জমা পড়েছে ১ হাজার ৮৯৯টি সন্দেহজনক লেনদেন প্রতিবেদন (এসটিআর) ও কার্যক্রম প্রতিবেদন (এসএআর)। লেনদেনে ব্যাংক ও মোবাইল আর্থিক সেবার (এমএফএস) ৬ হাজার ২২২টি হিসাব ব্যবহারের তথ্য পাওয়া গেছে। এতে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, ৪ বছরের ব্যবধানে এমন সন্দেহজনক প্রতিবেদনের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ২১ গুণ।
বিএফআইইউর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত শনাক্ত হওয়া এসব সন্দেহজনক হিসাবে জমা হয়েছে ৬১ হাজার ৪৪১ কোটি ৫৪ লাখ টাকা এবং উত্তোলন হয়েছে ৪৩ হাজার ৪৯৭ কোটি ৫ লাখ টাকা। জমা ও উত্তোলন মিলিয়ে এসব হিসাবে মোট আর্থিক কর্মকা-ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা।
তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে অনলাইন গেমিং, বেটিং, জুয়া ও ক্রিপ্টোকারেন্সি-সংশ্লিষ্ট সন্দেহজনক প্রতিবেদনের সংখ্যা ছিল মাত্র ৫০টি। ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৪৬টিতে। ৪ বছরের ব্যবধানে প্রতিবেদন বেড়েছে প্রায় ২১ গুণ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ), বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) এবং পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) যৌথভাবে অনলাইন জুয়া ও বেটিং প্রতিরোধে কাজ করছে। বিটিআরসি যখনই কোনো অনলাইন বেটিং বা জুয়ার সাইট শনাক্ত করে, তখনই তা বন্ধের ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
বিএফআইইউর বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অবৈধ অর্থের প্রাথমিক সংগ্রহ ও দ্রুত স্থানান্তরের ক্ষেত্রে এমএফএস প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করা হচ্ছে। পরে ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে এসব অর্থ একত্র করে বড় অঙ্কে নগদায়ন কিংবা অন্যত্র স্থানান্তর করা হচ্ছে। ফলে ব্যাংক ও এমএফএসকে ব্যবহার করে গড়ে উঠছে অবৈধ অর্থ স্থানান্তরের একটি ‘লন্ডারিং পাইপলাইন’।
প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, সন্দেহজনক এসব কর্মকা-ে মোট জমার পরিমাণ ৬১ হাজার ৪৪২ কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্যাংকের মাধ্যমে জমা হয়েছে ৩৩ হাজার ১৬৩ কোটি টাকা, যা মোট জমার ৫৪ শতাংশ। আর এমএফএসের মাধ্যমে জমা হয়েছে ২৮ হাজার ২৭৮ কোটি টাকা বা ৪৬ শতাংশ।
অন্যদিকে উত্তোলনের ক্ষেত্রে ব্যাংকের ওপর নির্ভরতা আরও বেশি। মোট ৪৩ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা উত্তোলনের মধ্যে ব্যাংকের মাধ্যমে বের হয়েছে প্রায় ৩৩ হাজার ২১৩ কোটি টাকা বা ৭৬ দশমিক ৪ শতাংশ। এমএফএসের মাধ্যমে উত্তোলন হয়েছে ১০ হাজার ২৮৫ কোটি টাকা বা ২৩ দশমিক ৬ শতাংশ।
অনলাইন জুয়া, বেটিং ও ডিজিটাল প্রতারণার আর্থিক কর্মকা-ের বড় কেন্দ্র হয়ে উঠেছে রাজধানী ঢাকা। বিশ্লেষণে ঢাকায় জমার পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ৬২৮ কোটি টাকা এবং উত্তোলন প্রায় ১ হাজার ৬৯১ কোটি টাকা। শীর্ষ ১০ জেলার মোট লেনদেনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই ঢাকাকেন্দ্রিক। এর পরই রয়েছে চট্টগ্রাম। জেলাটিতে প্রায় ২৯১ কোটি টাকা জমা এবং ২৬১ কোটি টাকা উত্তোলনের তথ্য পাওয়া গেছে। এ ছাড়া বগুড়া, সাতক্ষীরা, নওগাঁ, রাজশাহী, লক্ষ্মীপুর, পাবনা, ফেনী ও ফরিদপুরেও উল্লেখযোগ্য সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্ত হয়েছে। এতে স্পষ্ট হচ্ছে, অনলাইন জুয়া ও ডিজিটাল প্রতারণার আর্থিক নেটওয়ার্ক এখন আর শুধু বড় শহরকেন্দ্রিক নয়; এমএফএস ও অনলাইন পেমেন্ট ব্যবস্থার বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে তা জেলা ও আধা-শহর এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়ছে।
বাংলাদেশে অনলাইন জুয়া ও বেটিং আইনত নিষিদ্ধ। সাইবার সিকিউরিটি অর্ডিন্যান্স ২০২৫-এর ২০ ধারায় সাইবারস্পেসে জুয়া-সংক্রান্ত পোর্টাল, অ্যাপ, ডিভাইস বা কার্যক্রম তৈরি, পরিচালনা, অংশগ্রহণ, সহায়তা কিংবা প্রচারকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। এ অপরাধে সর্বোচ্চ ২ বছরের কারাদন্ড, সর্বোচ্চ ১ কোটি টাকা জরিমানা বা উভয় দন্ডের বিধান রয়েছে।
এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনায় এমএফএস সেবাদাতাদের সন্দেহজনক জুয়া-সংক্রান্ত লেনদেন শনাক্তে স্বয়ংক্রিয় নজরদারি জোরদার এবং বিশেষ টাস্কফোর্স গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও অনলাইন জুয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এজেন্ট, অ্যাপ এবং অর্থ লেনদেনের চেইন নিয়ে তদন্ত করছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র বলেন, শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতার মাধ্যমে অনলাইন জুয়া বন্ধ করা সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে পরিবারেরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। পরিবারের সদস্যদের খেয়াল রাখতে হবে, সন্তান বা অন্য কোনো সদস্য অনলাইন জুয়া কিংবা বেটিংয়ের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে কি না। ‘চ্যারিটি বিগিনস অ্যাট হোম’ প্রতিরোধের শুরুটা পরিবার থেকেই করতে হবে। পরিবারে সচেতনতা তৈরি করা গেলে অনলাইন জুয়ার বিস্তার অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। এতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাজও সহজ হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন জুয়া এখন শুধু সামাজিক সমস্যা নয়, এটি আর্থিক অপরাধেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠছে। অনলাইন বেটিংয়ের মাধ্যমে অর্থ একাধিক ব্যাংক হিসাব, মোবাইল আর্থিক সেবা ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ঘুরে শেষ পর্যন্ত বিদেশে পাচারের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। ফলে এ ধরনের লেনদেন শনাক্তে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নজরদারি আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
তাদের মতে, শুধু ওয়েবসাইট বন্ধ করে অনলাইন জুয়া নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। একই সঙ্গে জুয়ার অর্থের উৎস ও গন্তব্য শনাক্ত, সন্দেহজনক ব্যাংক ও এমএফএস হিসাব পর্যবেক্ষণ এবং সংশ্লিষ্ট চক্রের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পর্যায়ে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনলাইন ও দূরবর্তী জুয়া এবং বেটিংকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হলেও এর বিস্তার ঠেকাতে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে অনলাইন জুয়ার ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি এবং পরিবারের দায়িত্বশীল নজরদারি বাড়াতে হবে।
আরিফ হোসেন খান বলেন, অনলাইন জুয়া প্রতিরোধে রাষ্ট্র বিভিন্নভাবে তৎপর রয়েছে। এ বিষয়ে আতঙ্কিত না হয়ে সবাইকে সচেতন হতে হবে এবং নিজ নিজ অবস্থান থেকে সহযোগিতা করতে হবে। বিশেষ করে পরিবারকে সন্তান ও তরুণদের অনলাইন কার্যক্রমের বিষয়ে দায়িত্বশীল নজরদারি করতে হবে। পরিবার থেকেই যদি অনলাইন জুয়ার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা যায়, তাহলে এর সামাজিক ও আর্থিক ক্ষতি অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।