অনেক স্বপ্ন নিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকা গিয়েছিলেন নারায়ণগঞ্জের সদর উপজেলার আলীরটেকের ক্রোকেরচর গ্রামের যুবক আপন আহমেদ। স্বপ্ন ছিল বাড়ি নির্মাণের পরে একমাত্র বোনের বিয়ে দেবেন। ১০ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে বাড়ির কাজও শুরু করেছিলেন। তবে আগুনে পুড়ে গেছে আপনের স্বপ্ন ও জীবন। দক্ষিণ আফ্রিকায় অগ্নিকান্ডে মারা যাওয়া ছয়জনের চারজনই আলীরটেকের বাসিন্দা। তাদের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর স্বজনদের কান্নায় আলীরটেকের আকাশ ভারী হয়ে উঠেছে।
তারা গত রবিবার রাতে দক্ষিণ আফ্রিকার কুইন্সটাউনের একটি সুপারশপে অগ্নিকান্ডে মারা যান। সুপারশপটির মালিক আলীরটেক ইউপি সদস্য রওশন মেম্বারের ভাই রতন। নিহতদের সবার পরিচয় পাওয়া গেছে। তারা হলেন নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার আলীরটেক ইউনিয়নের ক্রোকেরচর গ্রামের মনির হোসেনের ছেলে মো. ফাহিম, একই এলাকার আলী মিয়ার ছেলে আপন আহমেদ ও মৃত শরব আলীর ছেলে নুর মোহাম্মদ; একই ইউনিয়নের তৈলখিয়ারচর এলাকার ফারুক হোসেনের ছেলে মো. ফয়সাল, বক্তাবলী ইউনিয়নের মৃত আক্তার হোসেনের ছেলে মো. শাহিন ও মুন্সীগঞ্জ সদরের মিরকাদিম পৌরসভার কালিন্দিপাড়া এলাকার মৃত সালাম বেপারির ছেলে মো. রাজিক।
এ ঘটনায় নিহতদের পরিবার, প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটি ও স্থানীয়দের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। জীবিকার তাগিদে প্রবাসে যাওয়া প্রিয়জনের এমন করুণ পরিণতি কেউই মেনে নিতে পারছেন না। নিহত ছয় যুবকের প্রায় সবাই পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন। একদিকে স্বজন হারানোর শোক অন্যদিকে ভবিষ্যৎ আর্থিক সংকটের কথা ভেবে স্বজনদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে।
নিহত আপন আহমেদের বড় ভাই আবির হাসান জানান, সাড়ে ৪ বছর আগে পরিবারের হাল ধরতে সাউথ আফ্রিকায় যায় আপন। বাড়ি করে বোনের বিয়ে দেওয়ার স্বপ্ন ছিল তার। তবে স্বপ্ন পূরণের আগেই না ফেরার দেশে চয়ে যায়। আপনের বাবা আলী মিয়া আক্ষেপ করে বলেন, ‘বিদেশে না পাঠালে ছেলেটা বেঁচে থাকত। টাকার জন্য বিদেশ পাঠিয়ে আজ তাকে আগুনে পুড়ে মরতে হলো।’
একইভাবে ১০ বছর আগে স্বপ্নপূরণে সাউথ আফ্রিকায় যান ফাহিম। ফাহিম তার পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তার পরিবারে বাবা-মা ছাড়াও ছোট দুই ভাই ও দুই বোন রয়েছে। ফাহিমের মা লুৎফা আক্তার কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমার কলিজা আমাকে ছেড়ে চলে গেল। ছেলেটা সংসারের বড় ছিল। সংসারের হাল ধরতে গিয়ে তাকে আগুনে পুড়ে ছাই হতে হলো। আমি এটা কীভাবে মেনে নেব? নুর মোহাম্মদও ছিলেন তার পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তার ১ ছেলে ও ২ মেয়ে রয়েছে। মেয়েদের বিয়ে দিয়েছেন আর ছেলে একাদশ শ্রেণিতে পড়ে।
শাহিনের বাবা-মা অনেক আগেই মারা গেছেন। দাদি নুর জাহানের কাছেই বড় হয়েছেন তিনি। সেই নাতিকেই হারিয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন বৃদ্ধা। একমাত্র নাতিকেই জীবনের শেষ ভরসা হিসেবে আঁকড়ে ছিলেন তিনি। এখন সেই আশ্রয়ও হারিয়ে যেন নিঃস্ব হয়ে গেছেন।
এদিকে বিকেলে অগ্নিকা-ে নিহত পরিবারের সদস্যদের বাড়িতে গিয়ে সমবেদনা জ্ঞাপন করেন নারায়ণগঞ্জের সদর ইউএনও ফয়েজ উদ্দিন, আলীরটেক ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জাকির হোসেন, ইউপি সদস্য ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানের মালিকের ভাই রওশন আলীসহ আরও অনেকে। রওশন আলী জানান, কীভাবে আগুন লেগেছে তারা সেটি নিশ্চিত নন। ক্ষতিগ্রস্তরা সবাই তার আত্মীয়স্বজন। ক্ষতিপূরণের বিষয়ে পরে জানানো যাবে।
ইউএনও ফয়েজ উদ্দিন বলেন, দক্ষিণ আফ্রিকায় নিহতদের লাশ দেশে আনার বিষয়ে ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কথা হয়েছে। অগ্নিকা-ের কারণ তদন্ত শেষে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে জানা যাবে।