সুন্দরবনের নদী-খাল ঘেঁষে বর্ষার দিনে দূর থেকে চোখে পড়ে সবুজে ঢাকা কেওড়া গাছ। জোয়ার-ভাটার লবণাক্ত পানির সঙ্গে লড়াই করে বেড়ে ওঠা এই গাছ শুধু ম্যানগ্রোভ বনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভিদই নয়, এর টক স্বাদের ফলও উপকূলীয় মানুষের খাদ্যসংস্কৃতির একটি পরিচিত অংশ। সুন্দরবন এলাকার গ্রামের ঘরে ঘরে কেওড়া ফলের আচার, চাটনি কিংবা ছোট চিংড়ি ও মসুর ডালের সঙ্গে রান্না হয় কেওড়া ফল।
কেওড়া (বৈজ্ঞানিক নাম Sonneratia apetala) সুন্দরবনের অন্যতম অগ্রগামী (pioneer) বৃক্ষ। নতুন জেগে ওঠা চর ও কর্দমাক্ত জমিতে সবার আগে জন্ম নেয় এই গাছ। এর শিকড় মাটি আঁকড়ে ধরে ভূমিক্ষয় রোধ করে, উপকূলকে জলোচ্ছ্বাস ও ঢেউয়ের আঘাত থেকে সুরক্ষা দেয় এবং ধীরে ধীরে অন্য ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদের বেড়ে ওঠার পরিবেশ তৈরি করে।
বর্ষাকালে কেওড়া গাছে ধরে গোলাকার সবুজ ফল। পাকার পর ফলের মাংসল অংশে থাকে টক-মিষ্টি স্বাদ। স্থানীয় বাসিন্দারা এই ফল দিয়ে আচার, চাটনি, জেলি, জ্যাম এবং বিভিন্ন ধরনের রান্না করেন। বিশেষ করে ছোট চিংড়ি মাছ ও মসুর ডালের সঙ্গে কেওড়া ফলের রান্না উপকূলীয় অঞ্চলের একটি ঐতিহ্যবাহী খাবার হিসেবে পরিচিত। সাম্প্রতিক গবেষণায়ও কেওড়া ফল দিয়ে পুষ্টিকর জ্যাম, জেলি ও আচার তৈরির সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে।
বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, কেওড়া ফল শুধু মানুষের নয়, সুন্দরবনের বন্যপ্রাণীরও গুরুত্বপূর্ণ খাদ্য। চিত্রা হরিণ, বানর এবং বিভিন্ন প্রজাতির পাখি মৌসুমে এই ফল খেয়ে থাকে। ফলে বনের খাদ্যচক্র ও জীববৈচিত্র্য টিকিয়ে রাখতে কেওড়া গাছের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কেওড়া গাছের আরেকটি বড় গুরুত্ব রয়েছে মধু উৎপাদনে। বসন্তে ফোটা কেওড়ার ফুলে মৌমাছির ব্যাপক বিচরণ দেখা যায়। সুন্দরবনের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মধু কেওড়া ফুলের মধুরস থেকে উৎপন্ন হয় বলে বনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক তার গবেষণায় দেখিয়েছেন কেওড়া ফলটি মানবদেহের জন্য খুবই উপকারী। এ ফলটিকে খাদ্য তালিকায় আনতে এর ব্যাপক প্রচার প্রয়োজন বলেও মনে করেন খুবির বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. শেখ জুলফিকার হোসেন। তার গবেষণার ওই ফলাফল দেশি-বিদেশি জার্নালে প্রকাশিত হলে কেওড়ার পুষ্টিগুণের বিষয়টি আলোচনায় আসে।
গবেষণায় দেখা গেছে, কেওড়া ফলে রয়েছে ভিটামিন সি, পলিফেনল, ফ্ল্যাভোনয়েড ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্টসহ বিভিন্ন উপকারী উপাদান। বিভিন্ন গবেষণায় এর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ও অন্যান্য সম্ভাব্য স্বাস্থ্যগুণ নিয়ে কাজ হয়েছে। তবে চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে নয়, বরং পুষ্টিকর বনজ ফল হিসেবেই এর গুরুত্ব বেশি বলে গবেষকেরা উল্লেখ করেছেন।
খুলনার কয়রা উপজেলার উন্নয়ন ও বিভিন্ন জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে কাজ করা স্থানীয় এনজিও আইসিডির প্রতিষ্ঠাতা আশিকুজ্জামান বলেন, বর্ষা মৌসুম এলেই গ্রামের মানুষ সুন্দরবন ও আশপাশের এলাকা থেকে কেওড়া ফল সংগ্রহ করে। এই ফল দিয়ে আচার, চাটনি এবং চিংড়ি মাছের সুস্বাদু রান্না উপকূলীয় অঞ্চলের ঐতিহ্যের অংশ। কেওড়া ফলের আচার ও চাটনিকে পরিকল্পিতভাবে প্রক্রিয়াজাত করে দেশব্যাপী বাজারজাত করা গেলে এ অঞ্চলে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় মানুষের আয়ও বাড়বে।
সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের কাশিয়াবাদ স্টেশনের কর্মকর্তারা নাসির উদ্দিন বলেন, কেওড়া শুধু একটি বনজ গাছ নয়, এটি সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্রের অন্যতম ভিত্তি। জলবায়ু পরিবর্তন, লবণাক্ততা বৃদ্ধি ও উপকূল রক্ষায় এই গাছের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। তাই অবৈধভাবে গাছ কাটা বা প্রাকৃতিক বিস্তারে বাধা সৃষ্টি না করে কেওড়াসহ ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদ সংরক্ষণে সবাইকে সচেতন হতে হবে।
প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা থেকে শুরু করে উপকূলীয় মানুষের খাদ্যসংস্কৃতি-সবখানেই কেওড়া ফলের রয়েছে নিজস্ব পরিচয়। সুন্দরবনের এই সাধারণ অথচ অনন্য ফলটি সংরক্ষণ করা মানে শুধু একটি গাছ নয়, বরং একটি সম্পূর্ণ বাস্তুতন্ত্র ও উপকূলীয় ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখা।