ইরানের সামরিক ও প্রতিরক্ষা স্থাপনাগুলোয় গত ৫ মাস ধরে হামলা চালানোর পর এবার ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করার পরিকল্পনা করছে যুক্তরাষ্ট্র। আর সম্ভাব্য এ অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে যোগ দেবে ইসরায়েল। গত শুক্রবার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজ। সেখানে বলা হয়েছে, সম্ভাব্য অর্থনৈতিক বিপর্যয় এড়াতে আগামী সোমবার আর্থিক বাজার খোলার আগেই ইরানের জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে প্রথম দফা হামলা শেষ করতে চায় ওয়াশিংটন। তবে হামলার নির্দিষ্ট সময়সীমা এখনো নির্ধারণ করা হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সদর দপ্তর পেন্টাগনের সূত্রের বরাত দিয়ে সিবিএস নিউজের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে যে ইসরায়েলকে ইতিমধ্যে এ বিষয়ে জানানো হয়েছে এবং তেল আবিব হামলার এই অভিযানের বিষয়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সমন্বয় করতে আগ্রহী। প্রেসিডেন্টের অবকাশযাপন কেন্দ্র ক্যাম্প ডেভিডে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে সম্ভাব্য অভিযান নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সিবিএস জানিয়েছে, নতুন এই হামলার বিষয়ে ট্রাম্প এখনো চূড়ান্ত অনুমোদন দেননি। পেন্টাগন সূত্রে জানা গেছে, সম্ভাব্য এ হামলায় ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং তেল শোধনাগারগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া রাজধানী তেহরানকে বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন করাকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের আরেক প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল দাবি করেছে, ক্যাম্প ডেভিডে মন্ত্রিসভার বৈঠকে ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলার অনুমোদন দিয়ে ফেলেছেন ট্রাম্প। সূত্রের বরাত দিয়ে ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে যদি কূটনৈতিকভাবে উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি হয়, তাহলে সম্ভাব্য এ হামলা স্থগিত করে আলোচনায় ফিরে আসবেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।
এদিকে, সম্ভাব্য নতুন সামরিক অভিযানের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করেছে ইরান। দেশটির আধা-সরকারি তাসনিম নিউজ এজেন্সিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দেশটির এক জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তা বলেছেনÑ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পক্ষ থেকে ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র, সেতু বা অন্যান্য অবকাঠামোয় হামলার হুমকিকে তারা ‘উন্মাদের কাজ’ হিসেবে দেখছেন। এমন হামলা হলে তার জবাবে ইসরায়েলের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে তীব্র আঘাত হানার একটি সমন্বিত পরিকল্পনা আগে থেকেই প্রস্তুত রয়েছে বলেও জানান তিনি। ওই কর্মকর্তা দাবি করেন, ৪০ দিনের যুদ্ধে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী এমন সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছে।
এরইমধ্যে হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে নতুন উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আইআরজিসি দাবি করেছে যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক নিরাপত্তা বহরের সঙ্গে চলাচলকারী দুটি তেলবাহী ট্যাংকারে তারা হামলা চালিয়েছে। তাদের ভাষ্য, জাহাজ দুটি ঘোষিত নৌপথ ব্যবহার না করে যুক্তরাষ্ট্রের আকাশসুরক্ষার অধীনে প্রণালি অতিক্রমের চেষ্টা করছিল। হামলার পর দুটি ট্যাংকার থেমে যায় এবং আরও চারটি জাহাজ আগের অবস্থানে ফিরে যায়। তবে এই দাবির স্বাধীন যাচাইয়ের কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি। দুই সপ্তাহ আগে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র আবার যুদ্ধ শুরু করার পর থেকে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল প্রায় পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। প্রণালিটিতে জাহাজ চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে পড়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯০ ডলারের বেশি বেড়ে গেছে।
হরমুজ নিয়ে চলমান অচলাবস্থার মধ্যেই লোহিত সাগরে সৌদি আরবের ওপর হুতি বিদ্রোহীদের নৌ-অবরোধ পরিস্থিতি আরও জটিল করেছে। এবার মিসরের সুয়েজ খালের ওপরও উপসাগরীয় অঞ্চলের এই সংঘাতের প্রভাব পড়ার আশঙ্কা বাড়ছে। সম্প্রতি মিসরের বন্দরে ড্রোন হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের মালিকানাধীন দুটি গ্যাস ট্যাংকার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর কাছের সুয়েজ খাল এবং এর সঙ্গে যুক্ত একটি পাইপলাইনের জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এ পাইপলাইন সৌদি আরবের জ্বালানি তেল রপ্তানিতে অতিগুরুত্বপূর্ণ এক বিকল্প পথ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। পাইপলাইনটি লোহিত সাগর থেকে শুরু হয়ে মিসরের বুক চিরে ভূমধ্যসাগরের সিদি কেরির বন্দরে গিয়ে শেষ হয়েছে। ভূমধ্যসাগরের কাছাকাছি নীল নদের অববাহিকায় মিসরের দামিয়েত্তা বন্দরে গত বুধবার ট্যাংকার দুটিতে ওই হামলা চালানো হয়। তবে এখন পর্যন্ত সুয়েজ খালে সরাসরি হামলার কোনো হুমকি দেওয়া হয়নি। তবে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথটির সম্ভাব্য নিরাপত্তাঝুঁকি জ্বালানি বাজারে বড় উদ্বেগ যোগ করেছে।