লে. কর্নেল ডা. মো. মশিউর রহমান
রক্তরোগ বিশেষজ্ঞ, সিএমএইচ ঘাটাইল, টাঙ্গাইল
রক্তস্বল্পতা (Anemia) ) বিশ্বের প্রচলিত জনস্বাস্থ্য সমস্যা। অনেকের ধারণা, রক্তস্বল্পতা মানেই শরীরে আয়রনের ঘাটতি, আর চিকিৎসা হলো আয়রন ট্যাবলেট বা সিরাপ খাওয়া। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। সব ধরনের রক্তস্বল্পতা আয়রনের অভাবে হয় না। কিছু ক্ষেত্রে অযথা আয়রন ওষুধ রোগ নির্ণয়ে বিলম্ব ঘটায়। রোগের জটিলতা বাড়াতে পারে এবং শরীরে অতিরিক্ত আয়রন জমে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতির কারণ হয়। রক্তস্বল্পতার চিকিৎসা শুরু করার আগে প্রকৃত কারণ জানা গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে রক্তস্বল্পতার কারণ শুধু আয়রনের ঘাটতি নয়; অপুষ্টি, ফোলেট ও ভিটামিন বি১২-এর অভাব, দীর্ঘস্থায়ী সংক্রমণ, কৃমি, কিডনি রোগ, থ্যালাসেমিয়া এবং অন্যান্য রক্তরোগও ভূমিকা রাখে।
রক্তস্বল্পতা কী
রক্তে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে কমে গেলে তাকে রক্তস্বল্পতা বলে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, পূর্ণ বয়স্ক পুরুষের হিমোগ্লোবিন ১৩.০ ম/ফখ-এর কম হলে অ্যানিমিয়া ধরা হয়। নারী (গর্ভবতী নন) হিমোগ্লোবিন ১২.০ ম/ফখ-এর কম হলে রক্তস্বল্পতা ধরা হয়। এ ছাড়া গর্ভবতী নারী যাদের হিমোগ্লোবিন ১১.০ ম/ফখ-এর কম হলে রক্তস্বল্পতা হিসেবে ধরা হয়। শিশুদের ক্ষেত্রে বয়সভেদে এই মাত্রাটি আরও কম। শিশুদের হিমোগ্লোবিনের মাত্রা ১১ ম/ফখ-এর নিচে হলে রক্তস্বল্পতা ধরা হয়। হিমোগ্লোবিন ফুসফুস থেকে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে অক্সিজেন পৌঁছে দেয়। রক্তস্বল্পতার লক্ষণ হলো দুর্বলতা, সহজে ক্লান্ত হওয়া, মাথা ঘোরা, বুক ধড়ফড় করা, মাথাব্যথা, মুখমন্ডল ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া।
রক্তস্বল্পতার কারণ
আয়রনের অভাবজনিত রক্তস্বল্পতা সাধারণ কারণ। বর্ধনশীল বয়স, অতিরিক্ত মাসিক, গর্ভাবস্থা, অপুষ্টি, রক্তক্ষরণ বা কৃমির কারণে রক্তশূন্যতা হতে পারে।
ভিটামিন বি১২-এর অভাবে লোহিত রক্তকণিকা ঠিকভাবে তৈরি হয় না। শুধু আয়রন দিলে উপকার হয় না।
ফোলেটের অভাব দেখা দিলে। গর্ভবতী নারী, অপুষ্টিতে ভোগা ব্যক্তি, ক্যানসারে আক্রান্ত ব্যক্তি এবং দীর্ঘদিন কিছু ওষুধ গ্রহণকারীদের মধ্যে বেশি দেখা যায়।
দীর্ঘস্থায়ী রোগজনিত রক্তস্বল্পতা যেমন কিডনি রোগ, ক্যানসার, যক্ষ্মা, রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস, দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ ইত্যাদির কারণে হতে পারে।
থ্যালাসেমিয়া বংশগত রক্তরোগ। এতে রক্তের লোহিত কণিকা খুব দ্রুত ভেঙে যায়। ফলে রক্ত কণিকায় থাকা আয়রন কণিকা থেকে বেরিয়ে রক্তে চলে আসে। এসব রোগীর নিয়মিত রক্ত পরিসঞ্চালন করার ফলেও শরীরে আয়রন জমতে থাকে (১ ব্যাগ রক্তে ২৫০ মিলিগ্রাম আয়রন থাকে)। থ্যালাসেমিয়া রোগীর অধিকাংশ ক্ষেত্রে নিয়মিত আয়রন খাওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং শরীরে নানাবিধ জটিলতা সৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে।
হিমোলাইটিক অ্যানিমিয়ার ক্ষেত্রে রক্তকণিকা দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়।
অ্যাপ্লাস্টিক অ্যানিমিয়ায় অস্থিমজ্জা পর্যাপ্ত রক্তকণিকা তৈরি করতে ব্যর্থ হয়।
কখন আয়রন খাওয়া উচিত নয়
সব রক্তস্বল্পতা আয়রনের অভাবে হয় না।
ভিটামিন বি১২-এর অভাবে আয়রন খেলে রোগ ভালো হবে না।
থ্যালাসেমিয়ায় অপ্রয়োজনীয় আয়রন শরীরে জমে যেতে পারে।
দীর্ঘদিন অতিরিক্ত আয়রন গ্রহণে লিভার, হৃদযন্ত্র ও অন্তঃস্রাবী গ্রন্থির ক্ষতি হয়।
প্রকৃত রোগ নির্ণয়ে বিলম্ব হয়।
রোগীর অপ্রয়োজনীয় অর্থব্যয় হয়।
রক্তস্বল্পতা কখন খারাপ হয়
থ্যালাসেমিয়া : থ্যালাসেমিয়া রোগীদের অনেকের শরীরে স্বাভাবিকভাবেই অতিরিক্ত আয়রন জমতে থাকে, বিশেষ করে যারা নিয়মিত রক্ত নেন। এর সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় আয়রন যোগ হলে Iron overload nq হয়। যা লিভার সিরোসিস, হৃদরোগ এবং ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায়।
দীর্ঘস্থায়ী সংক্রমণ : কিছু সংক্রমণে শরীর আয়রনকে জীবাণুর নাগালের বাইরে রাখে। অপ্রয়োজনীয় আয়রন কিছু জীবাণুর বৃদ্ধি সহজ করে। রোগীর অবস্থা জটিল করতে পারে।
ভুল রোগ নির্ণয়
যদি রোগীর বি১২-এর অভাব বা অ্যাপ্লাস্টিক অ্যানিমিয়া থাকে, তবে শুধু আয়রন সেবনে রোগের প্রকৃত চিকিৎসা বিলম্বিত হয়। ফলে স্নায়বিক জটিলতা বা গুরুতর রক্তস্বল্পতা দেখা দিতে পারে।
কোন পরীক্ষা করা উচিত
রক্তের পরীক্ষা (সিবিসি), পেরিফেরাল ব্লাড ফিল্ম পরীক্ষা, সিরাম ফেরিটিন পরীক্ষা,
সিরাম আয়রন পরীক্ষা, টোটাল আয়রন বাইন্ডিং ক্যাপাসিটি (টিআইবিসি) পরীক্ষা, ট্রান্সফেরিন স্যাচুরেশন পরীক্ষা, ভিটামিন বি১২ পরীক্ষা,
সিরাম ফলেট পরীক্ষা, রেটিকুলোসাইট কাউন্ট,
থ্যালাসেমিয়ার সন্দেহ হলে হিমোগ্লোবিন ইলেকট্রোফোরেসিস পরীক্ষা, কৃমি বা অন্ত্রের পরজীবী শনাক্তে মলের পরীক্ষা, কিডনির কার্যকারিতা পরীক্ষা (কিডনি ফাংশন টেস্ট),
প্রয়োজন হলে অস্থিমজ্জা (বোন ম্যারো) পরীক্ষা।
কখন আয়রন দেওয়া উচিত
চিকিৎসক ক্লিনিক্যাল মূল্যায়ন ও পরীক্ষার ভিত্তিতে আয়রনের প্রয়োজনীয়তা নির্ধারণ করেন। গর্ভাবস্থায় জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নির্দেশিকা অনুযায়ী প্রতিরোধমূলক আয়রন-ফলিক অ্যাসিড সাপ্লিমেন্ট প্রয়োজন হয়।
প্রতিরোধ
রক্তস্বল্পতা প্রতিরোধে : সুষম খাদ্য গ্রহণ। লাল মাংস, মাছ, কলিজা, ডিম, ডাল, শাকসবজি খাওয়া। ভিটামিন সি সমৃদ্ধ ফলের সঙ্গে আয়রনযুক্ত খাবার খাওয়া। কৃমিনাশক ওষুধ সঠিক সময়ে গ্রহণ। অতিরিক্ত মাসিক বা দীর্ঘদিন রক্তক্ষরণ হলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া। আত্মীয়স্বজনের মধ্যে থ্যালাসেমিয়া থাকলে বিয়ের আগে স্ক্রিনিং করা। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া দীর্ঘদিন আয়রন না খাওয়া।
রক্তস্বল্পতা রোগ নয়; এটি বিভিন্ন রোগের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ। তাই ‘হিমোগ্লোবিন কম মানেই আয়রন খেতে হবে’ এই ধারণা বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়। আয়রনের অভাব নিশ্চিত না হয়ে অযথা আয়রন গ্রহণ করলে উপকারের পরিবর্তে ক্ষতি হতে পারে। বিশেষ করে থ্যালাসেমিয়া, ভিটামিন বি১২-এর অভাব বা দীর্ঘস্থায়ী রোগজনিত রক্তস্বল্পতায় ভুল চিকিৎসা রোগের জটিলতা বাড়াতে পারে। সঠিক রোগ নির্ণয়, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসাই রক্তস্বল্পতা মোকাবিলার সবচেয়ে নিরাপদ ও কার্যকর উপায়।