একসময় যুক্তরাষ্ট্রের সোডা ফাউন্টেন ছিল মানুষের আড্ডা ও বিনোদনের অন্যতম কেন্দ্র। এখন শত বছরের পুরোনো সেই সংস্কৃতি নতুন রূপে ফিরে এসেছে ‘ডার্টি সোডা’র হাত ধরে। সাধারণ সোডার সঙ্গে বিভিন্ন সিরাপ, ক্রিম, ফলের পিউরি ও সাইট্রাস মিশিয়ে তৈরি এই পানীয় যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে তরুণদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ব্যক্তিগত পছন্দ অনুযায়ী পানীয় তৈরির সুযোগ এবং কম খরচে বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানোর নতুন জায়গার চাহিদা—এই তিন কারণে ‘ডার্টি সোডা’ এখন একটি জাতীয় ট্রেন্ডে পরিণত হয়েছে।
শুরুটা যেভাবে
২০০৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ইউটাহ অঙ্গরাজ্যের সেন্ট জর্জ শহরে নিকোল ট্যানার নামে এক নারী এই ব্যবসার ধারণা নিয়ে এগিয়ে আসেন। স্বামী ও পাঁচ সন্তানকে নিয়ে আর্থিক চাপের মধ্যে থাকা ট্যানার এমন একটি ব্যবসা শুরু করতে চেয়েছিলেন, যা পরিবারগুলোর জন্য সাশ্রয়ী বিনোদনের সুযোগ তৈরি করবে।
তখন তার পরিবার প্রায়ই সোডা কিনতে ‘সনিক ড্রাইভ-ইন’-এ যেত। ট্যানার ডায়েট কোকের সঙ্গে লেবু মিশিয়ে পান করতেন, তবে দীর্ঘ অপেক্ষার কারণে তিনি ভিন্ন ধরনের ব্যবসার কথা ভাবেন।
এরপর ২০১০ সালে তিনি ‘সুইগ’ (Swig) নামে একটি ড্রাইভ-থ্রু সোডা শপ চালু করেন। সেখানে গ্রাহকরা নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী নানা উপকরণ মিশিয়ে পানীয় তৈরি করতে পারতেন। শুরুতে এক ডলারে পানীয় বিক্রি করে গ্রাহক আকৃষ্ট করা হলেও এক বছরের মধ্যেই দোকানের সামনে দীর্ঘ লাইন দেখা যায়।
সুইগের মেনুতে নারকেল সিরাপ মেশানো ‘ডার্টি ড. পেপার’ যুক্ত করার পরই ‘ডার্টি সোডা’ নামটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
ইউটাহ থেকে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে
ডার্টি সোডা বিশেষভাবে জনপ্রিয় হয় ইউটাহর মরমন সম্প্রদায়ের মধ্যে। চার্চ অব জিসাস ক্রাইস্ট অব ল্যাটার-ডে সেইন্টসের অনেক অনুসারী অ্যালকোহল, কফি ও চা এড়িয়ে চলেন। ফলে কাস্টমাইজ করা সোডা তাদের কাছে একটি সামাজিক বিনোদনের বিকল্প হয়ে ওঠে।
ধীরে ধীরে বিকেলের সোডা আড্ডা শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও বন্ধুদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ইউটাহর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশে সোডা শপ গড়ে ওঠে। সুইগের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ‘সোডালিশাস’, ‘কুয়েঞ্চ ইট!’ এবং ‘ফিইজ ড্রিঙ্কস’-এর মতো প্রতিষ্ঠানও বাজারে আসে।
২০২০-এর দশকে টিকটক ও অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রঙিন ও আকর্ষণীয় ডার্টি সোডার ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে এটি ইউটাহর বাইরে পুরো যুক্তরাষ্ট্রে জনপ্রিয়তা পায়।
তরুণদের নতুন আড্ডার স্থান
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডার্টি সোডার জনপ্রিয়তার পেছনে শুধু স্বাদ নয়, এর সঙ্গে জড়িত অভিজ্ঞতাও গুরুত্বপূর্ণ। তরুণ প্রজন্ম বিশেষ করে জেন-জি অ্যালকোহল কম গ্রহণ করছে এবং মকটেল ও অন্যান্য নন-অ্যালকোহলিক পানীয়ের দিকে ঝুঁকছে।
সোডা শপগুলো তাদের জন্য সাশ্রয়ী ‘থার্ড প্লেস’ বা বাড়ি ও কর্মস্থলের বাইরে সামাজিক আড্ডার নতুন জায়গা তৈরি করছে।
লস অ্যাঞ্জেলেসের ১৭ বছর বয়সী লেইলা সি বলেন, স্থানীয় দোকানে যাওয়ার অভিজ্ঞতা ফাস্টফুড রেস্তোরাঁর চেয়ে আলাদা। সেখানে কম খরচে বন্ধুদের সঙ্গে বসে কথা বলা যায় এবং নতুন কিছু উপভোগ করা যায়।
বাজারে বড় ব্যবসার আগ্রহ
বর্তমানে সুইগের ১৬টি অঙ্গরাজ্যে ১৬০টির বেশি শাখা রয়েছে। ফিইজ ড্রিঙ্কসেরও রয়েছে ৭০টির বেশি শাখা। ইউটাহ ছাড়িয়ে অ্যারিজোনা, টেক্সাস, ভার্জিনিয়া, ফ্লোরিডাসহ বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে ছড়িয়ে পড়েছে এই ব্যবসা। এমনকি কানাডা ও অস্ট্রেলিয়াতেও ডার্টি সোডার দোকান দেখা যাচ্ছে।
বড় পানীয় কোম্পানিগুলোও এই প্রবণতাকে কাজে লাগাতে শুরু করেছে। PepsiCo, The Coca-Cola Company এবং Keurig Dr Pepper-এর মতো প্রতিষ্ঠান ক্রিম ফ্লেভারের কোলা ও বিভিন্ন মিক্সার বাজারে এনেছে।
ভবিষ্যৎ কতটা উজ্জ্বল
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডার্টি সোডার মূল আকর্ষণ হলো ব্যক্তিগত পছন্দ অনুযায়ী পানীয় তৈরির সুযোগ। শত শত সম্ভাব্য সংমিশ্রণের কারণে গ্রাহকরা বারবার নতুন স্বাদ চেষ্টা করতে আগ্রহী হন।
২০২৫ সালের হিসাবে ডার্টি সোডার বাজারের আকার আনুমানিক ১.১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে এবং ২০৩৩ সালের মধ্যে তা ২.৬ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
তবে স্বাস্থ্যঝুঁকিও রয়েছে। একটি সাধারণ ডার্টি সোডায় উচ্চমাত্রার চিনি ও ক্যালরির উপস্থিতি থাকে, যা নিয়মিত গ্রহণ করলে ওজন বৃদ্ধি, স্থূলতা এবং টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে এতে ব্যবহৃত সিরাপ ও ফ্লেভারিং এজেন্ট রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত বাড়িয়ে দেয়, যা দীর্ঘমেয়াদে হৃদরোগের সম্ভাবনাও তৈরি করে। বড় আকারের পানীয়তে ক্যালরির পরিমাণ ৫০০-এরও বেশি হতে পারে, যা এক বেলার খাবারের সমান বা তার চেয়েও বেশি শক্তি সরবরাহ করে। এছাড়া অতিরিক্ত ক্যাফেইন ও অ্যাসিডিক উপাদান দাঁতের ক্ষয়, হজমের সমস্যা এবং ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। খাবারের বিকল্প না থাকায় এসব দোকানে শুধুমাত্র মিষ্টি পানীয় গ্রহণের প্রবণতা তৈরি হয়, যা সুষম খাদ্যাভ্যাসের অভাব ঘটিয়ে দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
তারপরও বিশ্লেষকদের মতে, ডার্টি সোডা শুধু একটি পানীয় নয়; এটি ব্যক্তিগত পরিচয়, বিনোদন এবং সামাজিক অভিজ্ঞতার অংশ হয়ে উঠেছে। কফি শপের মতো সর্বত্র ছড়িয়ে পড়বে কি না, তা সময়ই বলবে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের পানীয় সংস্কৃতিতে এর প্রভাব ইতোমধ্যে স্পষ্ট।