পূর্ণিমার জোয়ার ও বঙ্গোপসাগরের উত্তাল ঢেউয়ের আঘাতে কক্সবাজারের সীমান্তবর্তী টেকনাফ উপজেলার সাবরাং ইউনিয়নের শাহপরীর দ্বীপের বেড়িবাঁধে ভয়াবহ ধস দেখা দিয়েছে। বাঁধের বিভিন্ন পয়েন্টে বসানো সিসি ব্লক একের পর এক ধসে পড়ছে। কোনো কোনো স্থানে সাগরের লোনাপানি বাঁধ উপচে সরাসরি লোকালয়ে প্রবেশ করায় দ্বীপের প্রায় ৪০ হাজার বাসিন্দার মধ্যে চরম আতঙ্ক ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, জোয়ারের প্রবল ঢেউয়ের তোড়ে বেড়িবাঁধের পশ্চিম পাশের অংশটি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাঁধের ঢালু অংশে অন্তত ২৫ থেকে ৩০টি এবং নিচের অংশে আরও ২০টিরও বেশি সিসি ব্লক মূল স্থান থেকে ধসে পড়েছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, সিসি ব্লকের নিচে থাকা মাটির মূল বাঁধটি যদি এভাবে ক্রমাগত ক্ষয়ে যেতে থাকে, তবে পুরো শাহপরীর দ্বীপ সাগরে বিলীন হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে। কোনো শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় বা জলোচ্ছ্বাস আঘাত হানলে এই দুর্বল হয়ে পড়া বাঁধটি ভেঙে শত শত বসতঘর, দোকানপাট ও অন্যান্য অবকাঠামো সাগরে তলিয়ে যেতে পারে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তত্ত্বাবধানে ২০২২ সালের জুন মাসে প্রায় ১৫১ কোটি টাকা ব্যয়ে শাহপরীর দ্বীপের পশ্চিম ও দক্ষিণ পাশে প্রায় ৩ কিলোমিটার দীর্ঘ এই বেড়িবাঁধটি নির্মাণ করা হয়েছিল। কিন্তু নির্মাণের মাত্র চার বছরের মাথায় বাঁধের বিভিন্ন অংশে ক্ষয় ও সিসি ব্লক ধসে পড়ার ঘটনা কাজের স্থায়িত্ব ও মান নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
পশ্চিমপাড়ার বাসিন্দা নুরুল আমিন জানান, ‘পূর্ণিমার প্রভাবে গত কয়েকদিন সাগরের পানির উচ্চতা অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। ১০ থেকে ১২ ফুট উঁচু ঢেউ এসে সরাসরি বাঁধে আঘাত হানছে। কিছু কিছু জায়গায় সমুদ্রের পানি বাঁধ উপচে লোকালয়ে ঢুকছে। এর মধ্যে আবহাওয়া অফিস সতর্ক সংকেত জারি করায় আমাদের উদ্বেগ আরও বহুগুণ বেড়েছে।’
দ্বীপের শিক্ষানুরাগী কলিম উল্লাহ মাস্টার অতীতে ভাঙনের স্মৃতি স্মরণ করে বলেন, ‘১৯৯১ সালের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ে দ্বীপের পশ্চিম পাশের এক কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ভেঙে গিয়েছিল।
পরে ওই অংশ পুনর্নির্মাণে দীর্ঘ সময় ও বিপুল অর্থ ব্যয় করা হলেও দীর্ঘস্থায়ী বা কাক্সিক্ষত মান নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি, যার খেসারত আজও দ্বীপবাসীকে দিতে হচ্ছে।’
যোগাযোগ করা হলে পাউবো এবং স্থানীয় প্রশাসনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।
পাউবো’র কক্সবাজার উপ-সহকারী প্রকৌশলী সালমান জানান, টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপের বাঁধের কিছু অংশে বড় বড় ঢেউ সরাসরি আছড়ে পড়ছে, যা সিসি ব্লক স্থানচ্যুতির অন্যতম কারণ। তিনি বলেন, ‘আমরা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। ইতিমধ্যে আমাদের প্রকৌশলী দল ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছে। বাঁধ রক্ষায় এবং ব্লক ধসে পড়া ঠেকাতে জরুরি ভিত্তিতে প্রতিরক্ষা ব্লকের সামনে আরও বাড়তি জিওব্যাগ বা সিসি ব্লক ডাম্পিংয়ের প্রস্তাব ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে পাঠানো হয়েছে। আশা করছি দ্রুতই সংস্কারকাজ শুরু করা সম্ভব হবে।’
এ বিষয়ে টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এসএম অনীক চৌধুরী বলেন, ‘শাহপরীর দ্বীপের বেড়িবাঁধের কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর আমরা পেয়েছি এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে পরিস্থিতির ওপর সার্বক্ষণিক নজর রাখা হচ্ছে। দ্বীপের ৪০ হাজার মানুষের জানমালের নিরাপত্তা আমাদের প্রথম অগ্রাধিকার। পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে সমন্বয় করে বাঁধের ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো দ্রুত সংস্কারের জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের প্রশাসনিক সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে।