আধুনিক অর্থশাস্ত্রের জনক হিসেবে পরিচিত অ্যাডাম স্মিথ বলেছেন, ‘সরকার যখন নিজেই ব্যবসায়ী বা কারখানার মালিক হয়, তখন সে সাধারণত একজন অত্যন্ত খারাপ ও অপচয়কারী ব্যবস্থাপক হিসেবে প্রমাণিত হয়।’ আর নোবেলজয়ী অর্থনীতি ও পরিসংখ্যানবিদ মিল্টন ফ্রিডম্যান বলেছিলেন, ‘কোনো রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান যদি লোকসান করে, তবে তারা জনগণের করের টাকায় টিকে থাকে, যা মূলত দক্ষতার শাস্তি এবং অদক্ষতার পুরস্কার।’ আমাদের অনেক রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের রুগ্নতার পেছনের মূলত ব্যবস্থা কিংবা পরিচালনাগত অদক্ষতা-অনিয়ম-অপচয়-দুর্নীতি দায়ী। সম্প্রতি রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারী ব্যবসায়ী নেতাদের উদ্দেশে বক্তব্য দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আশ্বাস দেন, বন্ধ ও লোকসানি রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানাগুলো পুনরুজ্জীবিত করতে আগ্রহী বিনিয়োগকারীদের সব ধরনের সহযোগিতা করবে সরকার। এরই ধারাবাহিকতায় সরকার বন্ধ ও লোকসানি কারখানাগুলো বেসরকারিকরণের উদ্যোগ নেয়।
২ আগস্ট দেশ রূপান্তরে বলা হয়েছে, ওই উদ্যোগে ব্যাপক সাড়া পাওয়া গেছে। বেসরকারি খাতে বড় বড় ১৫ শিল্প গ্রুপ নতুন নতুন বিনিয়োগ প্রস্তাব দিয়েছে সরকারের কাছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে পাওয়া গেছে ৮০টির বেশি বিনিয়োগ প্রস্তাব। এও বলা হয়েছে, বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ প্রস্তাবগুলো সরকার বিশ্লেষণ করছে। এর আগে শিল্প এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন ৪৪টি বন্ধ ও লোকসানি কারখানা লাভজনক করতে বেসরকারি খাতে ছাড়ার ঘোষণা দেওয়া হয়। আমরা জানি, গত মে মাসে বন্ধ কারখানা চালুসহ অর্থনীতি চাঙ্গা করতে ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি তহবিল চালুর ঘোষণা দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। উল্লেখ্য, নতুন বিনিয়োগকারীরা দ্রুত অর্থ সহযোগিতা পান, সে জন্যই বিশেষ এ তহবিল গঠন করা হয়। ওই তহবিল থেকে গ্রাহকদের ৭ শতাংশ সুদে ঋণ নেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। অন্যদিকে তহবিলের ঋণে সরকার ৬ শতাংশ সুদ ভর্তুকি হিসেবে দেবে। আমরা মনে করি, এ জন্য বিশেষ কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে।
অবকাঠামোগত উন্নয়ন, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের প্রাপ্যতা ও ঋণপ্রাপ্তির পথ মসৃণ করাসহ শিল্পবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার বিকল্প নেই। আমাদের তিক্ত অভিজ্ঞতা আছে, অনেক ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক আন্দোলনের নিশানায় থাকে শিল্প কারখানা। ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগসহ নানা রকম বৈরিতার শিকার হয়েছে উৎপাদনমুখী শিল্প কারখানা। এর ফলে শুধু যে উৎপাদন ব্যবস্থায় অভিঘাত লেগেছে তাই নয়, অর্থনীতিসহ কর্মীদের জীবন-জীবিকায়ও এর বহুমাত্রিক বিরূপ প্রভাব পড়ে। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন বলেছেন, ‘কারখানা লোকসানে চলা বা বন্ধ হওয়া কেবল অর্থনৈতিক সংকট নয়, এটি সুশাসনের অভাব এবং সঠিক দূরদর্শিতার ঘাটতির স্পষ্ট প্রমাণ।’ অতীতে আমরা কোনো কোনো ক্ষেত্রে এও দেখেছি, রাজনৈতিক বিবেচনার ছায়া পড়েছে শিল্প খাতে। আমরা চাই, বেসরকারি খাতে শিল্পের বিকাশ ঘটুক এবং বিনিয়োগকারী-উদ্যোক্তাদের ব্যবসার পথ হোক নিষ্কণ্টক। মনে রাখা বাঞ্ছনীয়, উদ্যোক্তা হলেন এমন একজন ব্যক্তি, যিনি ঝুঁকি নিয়ে নতুন ব্যবসা বা উদ্যোগ শুরু করেন। নতুন ধারণা, মূলধন ও বাজার ব্যবস্থার মাধ্যমে তারা অর্থনৈতিক মূল্য তৈরি করেন। প্রধানমন্ত্রী এর গুরুত্ব অনুধাবন করে বেসকারি পর্যায়ে সহযোগিতার আশ্বাসকে আমরা সাধুবাদ জানাই। আমরা বিশ্বাস করি, সরকারের সহযোগিতা ও দেশীয় উদ্যোক্তাসহ বিনিয়োগকারী, প্রযুক্তি অংশীদার সবার যূথবদ্ধ উদ্যোগে টেকসই শিল্পায়ন নিশ্চিত করা সম্ভব।
বিনিয়োগ ও শিল্পের বিকাশে বিদ্যমান অন্তরায়গুলো দূর করার পাশাপাশি বেসরকারি পর্যায়ে হস্তান্তরিত লোকসানি ও বন্ধ কারখানাগুলো বেসরকারিকরণের প্রক্রিয়া সহজতর এবং শিল্প কারখানার নিরাপত্তাসহ দৃষ্টিভঙ্গি হতে হবে বৈষম্যহীন। আমরা জানি, উন্নয়নশীল অর্থনীতির অগ্রগতি ত্বরান্বিত করতে বেসরকারিকরণ একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হিসেবে বিবেচিত। লোকসানি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর থেকে সরকারের আর্থিক বোঝা কমানো এবং সেগুলোতে গতিশীলতা আনাই এই প্রক্রিয়ার মূল লক্ষ্য। তবে এই প্রক্রিয়া কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করে এর বাস্তবায়ন পদ্ধতির ওপর। পাশাপাশি নজর দিতে হবে, বেসরকারিকরণ প্রক্রিয়ায় দক্ষতা বৃদ্ধি ও স্বচ্ছতায়ও। কার্যকর সংস্কারেও মনোযোগ দিতে হবে। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হস্তান্তর এবং বেসরকারি খাতে একচেটিয়া প্রভাব রোধে শক্তিশালী রেগুলেটরি বডি নিশ্চিত করাও জরুরি ।