আল্লাহর পথে মানুষকে আহ্বান করা সহজ কাজ নয়। এই কাজে আছে বিরোধিতা ও উপহাস। তবু যারা আল্লাহর সন্তুষ্টিকে জীবনের লক্ষ্য বানান, তারা কোনো বাধায় থেমে যান না। এ কারণেই নবীদের জীবন আমাদের জন্য সর্বোত্তম আদর্শ। তাদের মধ্যে নুহ (আ.)-এর জীবন ধৈর্য, অধ্যবসায় ও অবিচল দাওয়াতের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
মহান আল্লাহ সুরা সফফাতের ৭৫ নম্বর আয়াতে বলেন, ‘নিশ্চয়ই নুহ আমাকে ডেকেছিল। আর আমি কতই না উত্তমভাবে তার ডাকে সাড়া দিয়েছিলাম।’
এর পরের আয়াতগুলোতে মহান আল্লাহ জানান, তিনি নুহ (আ.) ও তার পরিবারকে মহাবিপদ থেকে রক্ষা করেছেন এবং তাকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে সম্মানিত করেছেন।
নুহ (আ.)-এর জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো ধৈর্য। তিনি কয়েক দিন বা কয়েক বছর নয়, শত শত বছর ধরে মানুষের কাছে আল্লাহর বাণী পৌঁছে দিয়েছেন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘সে তার জাতির মধ্যে নয়শ পঞ্চাশ বছর অবস্থান করেছিল।’ (সুরা আনকাবুত ১৪) এত দীর্ঘ সময়ের দাওয়াতের পরও প্রায় সব মানুষ তার দাওয়াত গ্রহণ করেনি। কিন্তু তিনি হাল ছাড়েননি।
দাওয়াতের ক্ষেত্রে তিনি নানা পদ্ধতি গ্রহণ করেছিলেন। কখনো প্রকাশ্যে মানুষকে আহ্বান করেছেন। কখনো গোপনে। কখনো দিনে। কখনো রাতে। কখনো ভালোবাসার ভাষায়। কখনো সতর্ক করে। তার ভাষ্য কোরআনে বর্ণিত হয়েছে এভাবে, ‘আমি আমার জাতিকে রাতদিন আহ্বান করেছি।’ (সুরা নুহ ৫) এই পদ্ধতি আমাদের শেখায়, একজন দাঈ কখনো একটিমাত্র উপায়ের ওপর নির্ভর করেন না। তিনি মানুষের অবস্থা বুঝে দাওয়াত দেন।
নুহ (আ.) শুধু মানুষের অবহেলাই দেখেননি, উপহাসও সহ্য করেছেন। যখন তিনি আল্লাহর নির্দেশে নৌকা নির্মাণ করছিলেন, তখন তার জাতি তাকে নিয়ে বিদ্রুপ করত। কিন্তু মানুষের হাসি তাকে বিচলিত করতে পারেনি। কারণ তিনি জানতেন, আল্লাহর প্রতিশ্রুতি অবশ্যই সত্য। তাই তিনি মানুষের কথার চেয়ে আল্লাহর আদেশকেই বেশি গুরুত্ব দেন।
তার জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা। চারদিকে যখন অবিশ্বাস ও বিদ্রƒপ, তখনো তিনি আল্লাহর নির্দেশ পালন করেছেন। এমন স্থানে নৌকা বানিয়েছেন, যেখানে তা মানুষের কাছে অসম্ভব ও হাস্যকর মনে হয়েছে। কিন্তু একজন মুমিন জানেন, আল্লাহ যখন কোনো নির্দেশ দেন, তখন সেটার পেছনে অবশ্যই কল্যাণ থাকে।
নুহ (আ.)-এর জীবন আরও শেখায়, দাওয়াতের ক্ষেত্রে সফলতার মানদণ্ড মানুষের সংখ্যা নয়। তার দীর্ঘ দাওয়াতের পর অল্পসংখ্যক মানুষ ইমান এনেছিল। তবুও তিনি সফল। কারণ তার দায়িত্ব ছিল সত্য পৌঁছে দেওয়া, মানুষের অন্তর পরিবর্তন করা নয়। মানুষের অন্তর পরিবর্তনের মালিক একমাত্র আল্লাহ।
এক সময় মহান আল্লাহর সাহায্য এসে পৌঁছায়। মহাপ্লাবনের মাধ্যমে অবাধ্য জাতিকে ধ্বংস করা হয়। আর নুহ (আ.) ও ইমানদারদের নিরাপদে রক্ষা করা হয়।
আজকের যুগে ইসলাম প্রচার করতে গিয়েও অনেক মানুষ নানা ধরনের সমালোচনা, বিদ্রুপ ও বাধার মুখে পড়েন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কটূক্তি করা হয়। সত্য বলার কারণে অনেককে একঘরে করা হয়। এমন সময় নুহ (আ.)-এর জীবন আমাদের সাহস জোগায়। তার জীবন শেখায়, মানুষের প্রশংসা নয়, আল্লাহর সন্তুষ্টিই একজন মুমিনের আসল লক্ষ্য।
নুহ (আ.)-এর জীবন আমাদের আরও শেখায়, দাওয়াতের কাজ ইখলাসের সঙ্গে করতে হবে। ফলাফল নিয়ে অস্থির হওয়া যাবে না। নিজের দায়িত্ব পালন করতে হবে নিষ্ঠার সঙ্গে। বাকিটুকু আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিতে হবে। কারণ হেদায়েত একমাত্র তারই হাতে।
একজন মুসলিমের জীবনে এই শিক্ষা অত্যন্ত মূল্যবান। পরিবার, সমাজ কিংবা কর্মক্ষেত্রে সত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করতে গিয়ে যদি বাধা আসে, তবে হতাশ হওয়ার কোনো কারণ নেই। ধৈর্য, দোয়া এবং মহান আল্লাহর ওপর ভরসাই একজন মুমিনের সবচেয়ে বড় শক্তি।
লেখক : ইমাম, খতিব ও মাদ্রাসাশিক্ষক