ভাইবোনের সম্পর্ক যেমন হওয়া উচিত

আপডেট : ০৩ আগস্ট ২০২৬, ০১:০২ এএম

ভাইবোনের সম্পর্ক অত্যন্ত মায়া ও খুনসুটির। এ সম্পর্কের তুলনা হয় না। জন্মের পর থেকেই ভাইবোন একে অপরের সুখ-দুখের সাথি হয়ে বেড়ে ওঠে। সময়ের পরিবর্তনে তারা ভিন্ন পরিবারে অবস্থান করলেও রক্তের এই বন্ধন ছিন্ন হয় না। ইসলাম পারিবারিক সম্পর্ককে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে এবং আত্মীয়তার বন্ধন অটুট রাখাকে ইমানি দায়িত্ব হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। ভাইবোনের পারস্পরিক ভালোবাসা, সহযোগিতা, সম্মান ও দায়িত্ববোধ সুখী পরিবার এবং সুস্থ সমাজ গঠনের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।

মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, যার নামে তোমরা একে অপরের কাছে দাবি করো এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক নষ্ট করা থেকে বিরত থাকো।’ (সুরা নিসা ১)

এই আয়াত আমাদের শিক্ষা দেয়, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা আল্লাহভীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ভাইবোন সেই আত্মীয়তার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কগুলোর একটি।

পারস্পরিক ভালোবাসা ও মমতা : ভাইবোনের সম্পর্কের মূল ভিত্তি হলো ভালোবাসা ও আন্তরিকতা। শৈশবের স্মৃতি, পারিবারিক বন্ধন এবং পারস্পরিক সহযোগিতা এই সম্পর্ককে গভীর করে তোলে। ইসলাম হিংসা, বিদ্বেষ ও অহংকারের পরিবর্তে পরস্পরের প্রতি দয়া ও ভালোবাসার শিক্ষা দিয়েছে।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে তার ভাইয়ের জন্য তাই ভালোবাসে, যা সে নিজের জন্য ভালোবাসে।’ (সহিহ বুখারি)

যদিও হাদিসে ‘ভাই’ শব্দ এসেছে, এর মর্মার্থ সব মুসলিমের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। তাই আপন ভাইবোনের প্রতি এই ভালোবাসা আরও বেশি হওয়া উচিত।

সম্মান ও সৌজন্য বজায় রাখা : ভাইবোন একে অপরের সঙ্গে কখনোই রূঢ় আচরণ করবে না। বড় ভাই বা বড় বোন ছোটদের স্নেহ করবে এবং ছোটরা বড়দের সম্মান করবে। তুচ্ছ বিষয় নিয়ে ঝগড়া, অপমান বা কটূক্তি সম্পর্ককে নষ্ট করে দেয়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা মানুষের সঙ্গে উত্তম কথা বলো।’ (সুরা বাকারা ৮৩)

আত্মীয়তার সম্পর্ক অটুট রাখা : আজকের ব্যস্ত জীবনে অনেক ভাইবোন মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর যোগাযোগ রাখে না। অথচ ইসলাম আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করাকে গুরুতর গুনাহ হিসেবে ঘোষণা করেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’ (সহিহ বুখারি)

অন্য হাদিসে তিনি বলেন, ‘যে ব্যক্তি চায় তার রিজিক বৃদ্ধি পাক এবং আয়ুতে বরকত হোক, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে।’ (সহিহ বুখারি)

তাই ভাইবোনের উচিত, নিয়মিত খোঁজখবর নেওয়া, দেখা-সাক্ষাৎ করা, ফোনে যোগাযোগ রাখা এবং প্রয়োজনের সময় পাশে দাঁড়ানো।

বিপদাপদে সহযোগিতা করা : একজন ভাই বা বোন যখন বিপদে পড়ে, তখন সর্বপ্রথম এগিয়ে আসার কথা তার আপন ভাইবোনের। অসুস্থতা, আর্থিক সংকট, পারিবারিক সমস্যা কিংবা মানসিক কষ্টসহ সবক্ষেত্রেই পারস্পরিক সহযোগিতা ইসলামের শিক্ষা। মহান আল্লাহ বলেন, ‘সৎকর্ম ও তাকওয়ার কাজে তোমরা পরস্পর সহযোগিতা করো।’ (সুরা মায়েদা ২)

শুধু অর্থনৈতিক সাহায্য নয়, কোনো আন্তরিক পরামর্শ, সান্ত্বনার কথা কিংবা প্রয়োজনের সময় কিছুটা সময় দেওয়াও সহযোগিতার অন্তর্ভুক্ত।

উত্তরাধিকার ও সম্পদে ন্যায়পরায়ণতা : অনেক পরিবারে ভাইবোনের সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার অন্যতম কারণ সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ। ইসলাম উত্তরাধিকার বণ্টনের সুস্পষ্ট বিধান দিয়েছে। কারও হক নষ্ট করা বা জোরপূর্বক সম্পদ দখল করা মারাত্মক অন্যায়।

মহান আল্লাহ সুরা নিসার ১১ ও ১২ নম্বর আয়াতে উত্তরাধিকার বণ্টনের বিস্তারিত বিধান দিয়েছেন। মুসলিম পরিবারের উচিত, মহান আল্লাহর নির্ধারিত বিধান অনুযায়ী সম্পদ বণ্টন করা এবং পারিবারিক সম্পর্ককে সম্পদের চেয়ে মূল্যবান মনে করা।

বোনের মর্যাদা ও ভাইয়ের দায়িত্ব : ইসলামে বোনের মর্যাদা অত্যন্ত সম্মানজনক। একজন ভাইয়ের দায়িত্ব হলো বোনের নিরাপত্তা, সম্মান ও প্রয়োজনের প্রতি যতœবান হওয়া। বিশেষ করে বোন যদি অসহায় বা অভাবগ্রস্ত হয়, তাহলে তার পাশে দাঁড়ানো বড় নেক আমল।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি দুই কন্যাকে বা দুই বোনকে উত্তমভাবে লালন-পালন করবে, তারা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া পর্যন্ত তাদের দেখাশোনা করবে, সে কেয়ামতের দিন আমার সঙ্গে এভাবে থাকবে।’ অতঃপর তিনি নিজের দুই আঙুল একত্র করে দেখান। (সহিহ মুসলিম) এই হাদিস নারী আত্মীয়দের প্রতি দায়িত্ব পালনের গুরুত্ব স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।

ক্ষমা, ধৈর্য ও ভুলত্রুটি উপেক্ষা : মানুষ মাত্রই ভুল করে। কখনো ভুল বোঝাবুঝি, মতপার্থক্য বা আবেগের কারণে ভাইবোনের মধ্যে মনোমালিন্য হতে পারে। কিন্তু দীর্ঘদিন অভিমান ধরে রাখা ইসলামের শিক্ষা নয়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তারা যেন ক্ষমা করে এবং উদারতা প্রদর্শন করে। তোমরা কি চাও না যে, আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করে দিন?’ (সুরা নুর ২২)

দ্বীনি পরিবেশ গড়ে তোলা : একজন ভাই বা বোন শুধু দুনিয়ার ব্যাপারে নয়, আখেরাতের কল্যাণের ক্ষেত্রেও একে অপরের সহযোগী হবে। নামাজ, কোরআন তেলাওয়াত, ইসলামি জ্ঞান অর্জন, নেক কাজের উৎসাহ এবং গুনাহ থেকে সতর্ক করার মাধ্যমে তারা পরস্পরের প্রকৃত শুভাকাক্সক্ষী হতে পারে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারী একে অপরের বন্ধু। তারা সৎকাজের আদেশ দেয় এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করে।’ (সুরা তওবা ৭১)

ভাইবোনের সম্পর্ক আজীবনের। তাই তুচ্ছ স্বার্থ, সম্পদের লোভ, অহংকার কিংবা ভুল বোঝাবুঝির কারণে এই সম্পর্ক নষ্ট করা উচিত নয়।

লেখক : আলেমা ও শিক্ষিকা

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত