মানুষের প্রতিটি কাজের হিসাব রাখা হচ্ছে। একদিন সবাইকে দাঁড়াতে হবে এক মহাসত্যের সামনে। সেই সত্যের মুখোমুখি হওয়া মানুষের জন্য খুব সহজ নয়। সেখানে থাকবে না কোনো লুকোচুরি কিংবা মিথ্যা বলার সুযোগ। সেখানে থাকবে ফেরেশতাদের ভর্ৎসনা। আর অনুশোচনার কান্না সেদিন কারও কোনো কাজে আসবে না।
কোরআনের সুরা মুলকের ৮ থেকে ১১ নম্বর আয়াতে এই করুণ পরিণতির কথা বর্ণিত হয়েছে। সেখানে অত্যন্ত মর্মস্পর্শী ভাষায় জাহান্নামিদের মানসিক অবস্থার বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। যখন অপরাধীদের জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে, তখন সেই দৃশ্য হবে খুবই ভয়ংকর। কোরআনের বর্ণনায় পাওয়া যায়, ক্রোধে জাহান্নাম যেন ফেটে পড়ার উপক্রম হবে। সেখানে পাহারায় থাকা ফেরেশতারা তাদের দেখে বিস্মিত হবেন। তারা ভর্ৎসনা করে অপরাধীদের দিকে ছুড়ে দেবেন এক তীক্ষè প্রশ্ন। তারা জানতে চাইবেন, পৃথিবীতে তাদের কাছে কি কোনো সতর্ককারী আসেনি? কেউ কি তাদের এই ভয়াবহ দিনের কথা আগে থেকে মনে করিয়ে দেয়নি? এই প্রশ্নটি কোনো সাধারণ তিরস্কার নয়। এটি মূলত মানুষের চরম নির্বুদ্ধিতার প্রতি এক করুণ আক্ষেপের প্রকাশ।
ফেরেশতাদের এমন প্রশ্নের জবাবে জাহান্নামিরা কোনো মিথ্যা বলতে পারবে না। তারা নিজেদের অপরাধ বিনা দ্বিধায় মাথা পেতে স্বীকার করে নেবে। তারা অত্যন্ত বিষণœ ও ভগ্ন হৃদয়ে বলবে, হ্যাঁ, আমাদের কাছে সতর্ককারী এসেছিল। আমাদের কাছে সত্যের বার্তা পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আমরা তাদের কোনো কথা শুনিনি। আমরা চরম অহংকার নিয়ে তাদের বারবার প্রত্যাখ্যান করেছিলাম।
তারা বলবে, যদি আমরা সেদিন সত্যের ডাক একটু মনোযোগ দিয়ে শুনতাম! যদি আমরা আমাদের নিজস্ব বিবেক ও বুদ্ধি সামান্য হলেও কাজে লাগাতাম! তাহলে আজ আমাদের এই জ্বলন্ত আগুনের অধিবাসী হতে হতো না! এই কথাগুলো কোনো সাধারণ আক্ষেপ নয়। এটি হলো মানুষের বিবেককে অবশ করে দেওয়া গভীর আর্তনাদ।
আল্লাহ মানুষকে বুদ্ধি দিয়েছেন সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য বুঝার জন্য। কান দিয়েছেন সত্যকে শোনার জন্য। কিন্তু তারা এই অমূল্য নেয়ামতগুলোর সঠিক ব্যবহার পৃথিবীতে করেনি।
দুনিয়ার জীবনের চাকচিক্য মানুষকে কতটা অন্ধ করে দেয়, এই আয়াতগুলো তারই প্রমাণ। মানুষ তার ক্ষমতা ও অর্থের মোহে পড়ে সত্যকে অস্বীকার করে। তারা ভাবে এই জীবনই শেষ, এর পরে আর কোনো জবাবদিহি নেই। কিন্তু যখন মৃত্যুর পর পর্দা চোখের সামনে থেকে সরে যাবে, তখন সব কিছু স্পষ্ট হয়ে উঠবে। তারা বুঝতে পারবে, নবীদের দেখানো পথই ছিল একমাত্র সঠিক পথ। কিন্তু তখন আর কিছুই করার থাকবে না। এই অনুশোচনা তাদের আত্মাকে আগুনের চেয়েও বেশি দগ্ধ করবে। তারা বারবার চাইবে পৃথিবীতে ফিরে আসতে। তারা চাইবে অন্তত একটিবার সুযোগ পেতে, যেন তারা নিজেদের শুধরে নিতে পারে। কিন্তু সেই সুযোগ আর কখনোই দেওয়া হবে না।
লেখক : মাদ্রাসাশিক্ষক ও ইসলামি গবেষক
