সুরা ইয়াসিনে আট শিক্ষা

কোরআন মানুষের সম্পূর্ণ জীবন বিধান। কোরআন অবতীর্ণ হয়েছে মানুষের চিন্তা, বিশ্বাস, চরিত্র ও কর্মকে শুদ্ধ করার জন্য। কোরআনের প্রতিটি সুরা মানুষের সামনে নতুন এক শিক্ষা তুলে ধরে। তেমনি সুরা ইয়াসিনও ইমান, আখেরাত, তাওহিদ ও নৈতিকতার নানা শিক্ষা তুলে ধরে। অনেকে সুরা ইয়াসিন নিয়মিত তেলাওয়াত করেন। কিন্তু এর বার্তা নিয়ে খুব কম মানুষই ভাবেন। অথচ এই সুরার প্রতিটি অংশ মানুষকে নিজের জীবন নতুন করে মূল্যায়ন করতে শেখায়। আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস দৃঢ় করে। মৃত্যুর পরের জীবনের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। দুনিয়ার মোহ থেকে মুক্ত হয়ে সত্যের পথে চলার আহ্বান জানায়। সুরা ইয়াসিন থেকে আটটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা তুলে ধরা হলো।

কোরআনই সঠিক পথের দিশারি : সুরা ইয়াসিনের শুরুতেই মহান আল্লাহ কোরআনের শপথ করে বলেন, এটি প্রজ্ঞায় পরিপূর্ণ কিতাব। এরপর ঘোষণা করেন, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সরল পথের ওপর প্রতিষ্ঠিত। আল্লাহ বলেন, ‘ইয়াসিন। প্রজ্ঞাময় কোরআনের শপথ। নিশ্চয়ই আপনি রাসুলদের অন্তর্ভুক্ত। আপনি সরল পথে প্রতিষ্ঠিত।’ (সুরা ইয়াসিন ১-৪)

এ থেকে বোঝা যায়, মানুষের সঠিক পথের একমাত্র নির্ভরযোগ্য দিশা হলো আল্লাহর ওহি। মতবাদ, প্রবণতা কিংবা ব্যক্তিগত চিন্তা কখনো কোরআনের বিকল্প হতে পারে না।

সত্যের পথে সাহস ও ধৈর্য : এই সুরায় এক মুমিন ব্যক্তির কথা এসেছে, যিনি শহরের দূর প্রান্ত থেকে ছুটে এসে নিজের জাতিকে সত্য গ্রহণের আহ্বান জানান। তিনি ছিলেন সাহসী। বিরোধিতাকে ভয় করেননি। শেষ পর্যন্ত নিজের প্রাণও উৎসর্গ করেছেন। মহান আল্লাহ তার সম্পর্কে বলেন, ‘তাকে বলা হলো, জান্নাতে প্রবেশ করো। সে বলল, হায়! আমার সম্প্রদায় যদি জানত।’ (সুরা ইয়াসিন ২৬)

সত্যের পথে চলতে গেলে বাধা আসবে। সমালোচনা হবে। কিন্তু একজন মুমিন আল্লাহর সন্তুষ্টিকেই সবচেয়ে বড় লক্ষ্য বানায়।

নেয়ামতের প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়া : সুরা ইয়াসিনে আল্লাহ বারবার মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন তার অসংখ্য নেয়ামতের দিকে। মৃত জমিনে বৃষ্টি দিয়ে ফসল উৎপন্ন করা, খেজুর ও আঙুরের বাগান সৃষ্টি করা, পানির ব্যবস্থা করা, সবই তার অসীম অনুগ্রহ। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর আমি তাতে খেজুর ও আঙুরের বাগান তৈরি করেছি এবং তাতে কিছু ঝরনাধারা প্রবাহিত করি। যাতে তারা এর ফল খায়। অথচ তা তাদের হাতের সৃষ্টি নয়। তবুও কি তারা কৃতজ্ঞ হবে না?’ (সুরা ইয়াসিন ৩৫)

কৃতজ্ঞতা শুধু মুখের কথা নয়। আল্লাহর দেওয়া প্রতিটি নেয়ামত তার সন্তুষ্টির পথে ব্যবহার করাও কৃতজ্ঞতার অংশ।

সৃষ্টিজগৎ আল্লাহর উন্মুক্ত নিদর্শন : দিন ও রাতের পরিবর্তন, সূর্য ও চাঁদের নির্ধারিত গতিপথ, সবকিছুই আল্লাহর অসীম ক্ষমতার প্রমাণ। মহান আল্লাহ বলেন, ‘সূর্যের পক্ষে সম্ভব নয় চাঁদকে ধরে ফেলা এবং রাতও দিনের আগে আসতে পারে না। প্রত্যেকেই নিজ নিজ কক্ষপথে বিচরণ করছে।’ (সুরা ইয়াসিন ৪০)

একজন মুমিন প্রকৃতিকে শুধু প্রকৃতি হিসেবে দেখে না। বরং প্রতিটি সৃষ্টির মধ্যে স্রষ্টার পরিচয় খুঁজে পায়।

মৃত্যুর পর পুনরুত্থান : মক্কার অবিশ্বাসীরা প্রশ্ন করত, হাড়গোড় গলে যাওয়ার পর মানুষ কীভাবে আবার জীবিত হবে? আল্লাহ তাদের জবাব দিয়েছেন অত্যন্ত যুক্তিসংগতভাবে। তিনি বলেন, ‘যিনি প্রথমবার তাকে সৃষ্টি করেছেন, তিনিই তাকে পুনরায় জীবিত করবেন।’ (সুরা ইয়াসিন ৭৯)

যিনি শূন্য থেকে মানুষ সৃষ্টি করেছেন, তার জন্য পুনরায় সৃষ্টি করা মোটেই কঠিন নয়। তাই আখেরাতের প্রতি বিশ্বাস একজন মুসলিমের ইমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

প্রতিটি কাজের হিসাব দিতে হবে : এই পৃথিবীতে কেউ অন্যায় করে পার পাবে না। আবার কোনো ভালো কাজের প্রতিদানও হারিয়ে যাবে না। আল্লাহ সবকিছু সংরক্ষণ করে রাখেন। তিনি বলেন, ‘আমিই তো মৃতদের জীবিত করি, তারা যা আগে পাঠিয়েছে এবং যা রেখে গেছে সবই লিখে রাখি।’ (সুরা ইয়াসিন ১২)

এই বিশ্বাস মানুষকে সতর্ক করে। গোপনে ও প্রকাশ্যে আল্লাহকে ভয় করতে শেখায়। অন্যের অধিকার নষ্ট করা থেকে বিরত রাখে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘বুদ্ধিমান সেই ব্যক্তি, যে নিজের হিসাব নেয় এবং মৃত্যুর পরের জীবনের জন্য আমল করে।’ (জামে তিরমিজি ২৪৫৯)

অহংকার সত্য গ্রহণে বাধা : মক্কার কাফেররা সত্য বুঝেও অহংকারের কারণে ইসলাম গ্রহণ করেনি। ইতিহাসে বহু জাতি একই ভুল করেছে। জ্ঞান, সম্পদ বা ক্ষমতার অহংকার মানুষকে আল্লাহ থেকে দূরে নিয়ে যায়।

সুরা ইয়াসিন শেখায়, বিনয়ী হৃদয়ই সত্য গ্রহণ করতে পারে। আর অহংকারী হৃদয় স্পষ্ট প্রমাণ দেখেও অস্বীকার করে।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘যার অন্তরে অণু পরিমাণ অহংকার থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’ (সহিহ মুসলিম ৯১)

আল্লাহর ওপর আস্থা রাখা : সুরার শেষে আল্লাহর অসীম ক্ষমতার ঘোষণা এসেছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তিনি যখন কোনো কিছুর ইচ্ছা করেন, তখন শুধু বলেন হও, আর তা হয়ে যায়।’ (সুরা ইয়াসিন ৮২)

এই শিক্ষা একজন মুমিনকে আশাবাদী করে। কঠিন পরিস্থিতিতেও সে হতাশ হয় না। কারণ সে জানে, সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ একমাত্র আল্লাহর হাতে। তাই সে আল্লাহর উপর আস্থা রাখে।

ইয়াসিন হলো বিশ্বাসকে দৃঢ় করার সুরা। চিন্তাকে শুদ্ধ করার সুরা। জীবনকে আল্লাহমুখী করার সুরা। এই সুরা আমাদের শেখায় কোরআনের অনুসারী হতে, সৃষ্টিজগৎ থেকে শিক্ষা নিতে, আখেরাতের জন্য প্রস্তুতি নিতে এবং আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রাখতে। যে ব্যক্তি এসব শিক্ষা নিজের জীবনে বাস্তবায়নের চেষ্টা করবে, তার জীবন হবে অর্থবহ, পরিশুদ্ধ ও সফল।

লেখক : শিক্ষক ও ইসলামি গবেষক