উত্তাল আজাদ কাশ্মীরে সহিংস দমন

পাকিস্তানের ইতিহাসে মানবাধিকারের চিত্র গুম, নির্বিচার আটক, বাকস্বাধীনতার ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের মতো অভিযোগে কলঙ্কিত হয়ে আছে। উপসাগরীয় অঞ্চলে চলমান সংঘাতে ইসলামাবাদ যখন যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতা করে ‘শান্তিচুক্তি’র চেষ্টা করছে, ঠিক তখনই নিজের নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলের বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগ করে সেই কলুষিত অধ্যায়ে নতুন পালক যুক্ত করছে। পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত প্রায় ৪৫ লাখ মানুষের আজাদ কাশ্মীরে নিরাপত্তা বাহিনীর সহিংস দমন-পীড়নে অঞ্চলটি কার্যত রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। অঞ্চলটির নাগরিক জোটÑ জয়েন্ট আওয়ামি অ্যাকশন কমিটি (জেএএসি) বিদ্যুৎ ও খাদ্য পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, প্রশাসনিক সংস্কারের দাবিতে গত ৭ জুন থেকে আন্দোলন শুরু করে। তবে আজাদ কাশ্মীরের চলমান আইন সভার নির্বাচন সেই আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ করে। জেএএসির নেতারা অভিযোগ করেছেন, রাওয়ালাকোট ও মিরপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে ৬০ জনেরও বেশি নিহত এবং শত শত মানুষ আহত হয়েছেন। ব্রিটিশ সম্প্রচারমাধ্যম বিবিসি সম্প্রতি রাওয়ালাকোটে প্রবেশের সুযোগ পেয়েছে এবং বিক্ষোভের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা মানুষের সঙ্গে কথা বলেছে।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ইসলামাবাদের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং আইন সভার সংরক্ষিত আসন বরাদ্দের বিতর্কিত সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরে বিক্ষোভকে নিষ্ঠুর কায়দায় দমন করা হচ্ছে। তাদের দাবি ৩৮ দফা হলেও মূল দাবি হলো বিধানসভায় কাশ্মীরের বাইরের প্রতিনিধিদের জন্য সংরক্ষিত ১২টি আসন বাতিল করা। এ সংরক্ষিত আসনের মাধ্যমে আসলে ইসলামাবাদ কাশ্মীরকে নিয়ন্ত্রণ করে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগের এই প্রতিবেদনগুলোকে উদ্বেগজনক বলে অভিহিত করেছে এবং একটি স্বাধীন তদন্তের দাবি জানিয়েছে। একই সঙ্গে তারা জয়েন্ট অ্যাকশন কমিটিকে নিষিদ্ধ করার বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। সহিংসতার চেয়েও বেশি উদ্বেগের বিষয় হলো কাশ্মীরকে ঘিরে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক বক্তব্য ও বাগাড়ম্বর। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মীরের বিক্ষোভকারীদের ‘ভারতের মতো শত্রু’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। জেএএসির বিক্ষোভকারীরা বলছেন, এই আন্দোলন তাদের অধিকার আদায়ের জন্য। তাদের উদ্বেগের বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছেÑ খাদ্য-বিদ্যুতের মূল্য, শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যসেবা। তবে স্থানীয় সরকারের বক্তব্য ভিন্ন। তাদের দাবি, এই সংগঠনটি সশস্ত্র এবং চলমান নির্বাচন ব্যাহত করাই তাদের উদ্দেশ্য। গত জুন মাসে জেএএসিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। তাদের বিদেশি অর্থায়নে পরিচালিত সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। তবে জেএএসি এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের দাবি, তারা শান্তিপূর্ণ সংগঠন এবং পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের প্রবাসী জনগোষ্ঠীর কাছ থেকে অর্থায়ন পেলেও ভারতের পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত নয়। বিবিসি শহরে খাদ্যসংকটের চিত্র প্রত্যক্ষ করেছে। অনেক বিক্ষোভকারী নিজেদের কাছে যা খাবার ছিল, তা একে অপরের সঙ্গে ভাগাভাগি করে খাচ্ছিলেন। অধিকাংশ দোকানপাট বন্ধ ছিল। কয়েকজন বিবিসিকে মোটরসাইকেলে চালের বস্তা বহন করে গোপনে শহরের অবরুদ্ধ জায়গায় খাদ্য পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টার কথা জানিয়েছেন। ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন এবং সড়কগুলো বন্ধ কিংবা কঠোর পাহারায় থাকায় সঠিক তথ্য সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্ক সহিংসতায় নিহতের ঘটনায় দ্রুত, নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি জেএএসিকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত এবং শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার সীমিত করাকে মৌলিক স্বাধীনতার জন্য উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেছেন।

পাকিস্তানের এই সহিংস দমনের চিত্র বেলুচিস্তানে সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান। বছরের পর বছর ধরে, বেলুচ পরিবারগুলো তাদের নিখোঁজ স্বজনদের ছবি নিয়ে দেশজুড়ে পদযাত্রা করছে, রাষ্ট্রের কাছে জবাব চাইছে। কিন্তু রাষ্ট্র জবাব দেয় না; হয় নীরব থাকে, নয় গুলি চালায়। মানবাধিকার সংস্থাগুলো বারবার জোরপূর্বক গুম এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ নথিবদ্ধ করেছে। তবে বরাবরই পাকিস্তান সরকার নির্লজ্জ প্রত্যাখানের মাধ্যমে সে সবের দায় এড়িয়ে গেছে। ফলে পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরের সাম্প্রতিক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ শুধু একটি নির্বাচন ঘিরে সহিংসতার ঘটনা নয়; বরং এটি পাকিস্তানের গণতন্ত্র, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং ‘আজাদ কাশ্মীর’ নিয়ে দীর্ঘদিনের সরকারি বয়ানের ওপর নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।