সুপারফুড লটকন

বাংলাদেশের কৃষিতে এক নীরব বিপ্লবের নাম ‘লটকন’। টক-মিষ্টি স্বাদের ফলটি, যার ইংরেজি নাম Burmese grape এবং বৈজ্ঞানিক নাম Baccaurea motleyana। লটকন এখন আর কেবল শখের বাগান বা বসতভিটার গন্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি হয়ে উঠেছে নরসিংদীর অর্থনীতির প্রাণভোমরা।

দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে নরসিংদীর লটকন এখন কাতার, দুবাইসহ ইউরোপের বাজারে পৌঁছে দিচ্ছে সুমিষ্ট স্বাদের পরিচিতি। ফলটির ব্যাপক জনপ্রিয়তায় নরসিংদী জেলা এখন ‘লটকনের রাজধানী’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।

নরসিংদীর ভৌগোলিক অবস্থান ও লাল মাটির উঁচু টিলা লটকন চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। বিশেষ করে শিবপুর, বেলাব, রায়পুরা ও মনোহরদী উপজেলায় এর চাষ সবচেয়ে বেশি হয়। অন্য ফসলের তুলনায় লটকন চাষে রোগবালাই কম, পরিচর্যা সহজ এবং উৎপাদন খরচ সেই তুলনায় অত্যন্ত কম। চারা রোপণের চার-পাঁচ বছরের মধ্যেই ফল আসে এবং একটি গাছ অনায়াসে ২০ থেকে ৩০ বছর পর্যন্ত ফল দিয়ে যায়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে জেলায় প্রায় ১৯০০ হেক্টর জমিতে লটকনের ফলন হয়েছে এবং প্রায় ২৬ থেকে ২৭ হাজার মেট্রিক টন উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ লটকন থেকে এ বছর প্রায় ১৮৭ কোটি টাকা আয় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বাগান থেকেই পাইকাররা লটকন কিনে নেওয়ায় চাষিদের বিপণন নিয়ে তেমন দুশ্চিন্তা নেই। জাত ও আকারভেদে বর্তমানে প্রতি মণ লটকন ২,০০০ থেকে ৩,০০০ টাকায় কেনাবেচা হচ্ছে।

কেবল অর্থনৈতিক আয়ের উৎস নয়, লটকন পুষ্টিবিজ্ঞানীদের কাছেও একটি ‘সুপারফুড’ হিসেবে স্বীকৃত। এই ফলটি বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধে অত্যন্ত কার্যকর। এতে থাকা প্রচুর আয়রন রক্তশূন্যতা দূর করতে এবং ভিটামিন ‘সি’ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে অপ্রতিদ্বন্দ্বী। হজমশক্তি বৃদ্ধি, বমি ভাব দূর করা, মানসিক ক্লান্তি ও বিষন্নতা কমানো এবং হাড় ও দাঁতের সুরক্ষায় লটকন প্রাকৃতিক ওষুধের মতো কাজ করে। এ ছাড়া এর অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল ও অ্যান্টি-ফাঙ্গাল গুণাগুণ চর্মরোগ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক।

আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের গবেষণায় দেখা গেছে, এতে বিদ্যমান শক্তিশালী অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ও ফেনোলিক যৌগ শরীরের কোষকে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া থেকে রক্ষা করে, যা ক্যানসারসহ বিভিন্ন মরণব্যাধির ঝুঁকি কমাতে পরোক্ষভাবে ভূমিকা রাখে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, এটি ক্যানসার প্রতিরোধে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

লটকন চাষকে আরও লাভজনক করতে এই এলাকায় একটি আধুনিক ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র স্থাপন করা এখন সময়ের দাবি। পাশাপাশি প্রয়োজন কৃষকদের আধুনিক প্রযুক্তিতে প্রশিক্ষণ প্রদান এবং রপ্তানি প্রক্রিয়া সহজীকরণে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা। উন্নত জাতের চারা উদ্ভাবন ও তা দ্রুত কৃষকদের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে উৎপাদন আরও বৃদ্ধি করা সম্ভব। যথাযথ সরকারি সহায়তা পেলে লটকন অদূর ভবিষ্যতে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম বড় উৎসে পরিণত হবে।