বাকৃবির উদ্ভাবন

নতুন জাতের মুরগির একদিনের বাচ্চার ওজনই হবে ৩৮ গ্রাম!

আপডেট : ০৪ আগস্ট ২০২৬, ০১:৪২ এএম

বাংলাদেশের পোলট্রি শিল্পে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) গবেষকদের উদ্ভাবিত একটি নতুন রঙিন মাংস উৎপাদনকারী মুরগির জাত। দীর্ঘ ১৫ বছরের গবেষণার পর উদ্ভাবিত এই মুরগির একদিন বয়সী বাচ্চার ওজনই হয় ৩৮ গ্রাম, যেখানে প্রচলিত সোনালি মুরগির একদিন বয়সী বাচ্চার ওজন যেখানে ২৬ থেকে ২৮ গ্রাম। গবেষকদের দাবি, এটি শুধু খামারিদের উৎপাদন ব্যয় কমিয়ে লাভ বাড়াবে না, বরং নিরাপদ ও সুস্বাদু প্রাণিজ আমিষ উৎপাদনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

গবেষণা প্রকল্পটির নেতৃত্ব দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের পোলট্রি বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. বজলুর রহমান মোল্যা। প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন প্রকল্প (এলডিডিপি) এর অর্থায়নে পরিচালিত এ গবেষণায় দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন প্যারেন্ট লাইন সংরক্ষণ, নির্বাচন ও সংকরায়ণের মাধ্যমে নতুন লাইনটি উন্নয়ন করা হয়েছে।

ড. বজলুর রহমান মোল্যা বলেন, গবেষণায় সেক্স-লিংক হোয়াইট লাইনের উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে এর সমজাতীয়তা বা হোমোজাইগোসিটি ৮৯ থেকে ৯৩ দশমিক ১১ শতাংশে উন্নীত হয়েছে, যা একটি স্থায়ী জাত হিসেবে বাণিজ্যিক উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে মুরগির পালকের রঙ নির্ধারণকারী এসওএক্স-১০ জিনের ডিলিশন শনাক্তে একটি সহজ পিসিআর পদ্ধতিও উদ্ভাবন করা হয়েছে, যা ভবিষ্যতের প্রজনন কর্মসূচিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

তিনি জানান, নতুন জাতটির কিছু প্যারেন্ট লাইন ৬২ সপ্তাহে প্রায় ২০৫টি পর্যন্ত ডিম উৎপাদনে সক্ষম হয়েছে। প্রচলিত সোনালি মুরগির একদিন বয়সী বাচ্চার ওজন যেখানে ২৬ থেকে ২৮ গ্রাম, সেখানে নতুন সংকর লাইনের বাচ্চার ওজন প্রায় ৩৮ গ্রাম। একদিন বয়সী বাচ্চার ওজনে প্রতি এক গ্রাম বৃদ্ধি বাজারজাতের সময় প্রায় ৫০ গ্রাম অতিরিক্ত চূড়ান্ত ওজনে প্রতিফলিত হয়, যা খামারিদের জন্য বাড়তি লাভ নিশ্চিত করবে।

তিনি বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য এমন একটি মুরগি তৈরি করা, যা স্থানীয় বাজারের জন্য উপযোগী এবং বিশেষ করে কারি রান্নায় সবচেয়ে ভালো মানের হবে। আজ আমরা ফ্রাইড চিকেন পরিবেশন করেছি, তবে বিভিন্ন ধরনের প্রোডাক্ট নিয়ে কাজ করে দেখছি কোনটি সবচেয়ে উপযোগী। আমাদের মূল টার্গেটকারীর জন্য উপযুক্ত মুরগি তৈরি করা।’

তিনি আরও বলেন, ‘স্লো গ্রোয়িং এই মুরগির ফুড কনভার্সন এফিশিয়েন্সি অনেক বেশি। উৎপাদন খরচ তুলনামূলক কম। এক সময় সপ্তাহে দেশে প্রায় আড়াই কোটি ব্রয়লার বাচ্চা উৎপাদিত হতো, এখন তা প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখে নেমে এসেছে। তবে মোট মুরগির উৎপাদন কমেনি। উৎপাদন ধীরে ধীরে স্লো গ্রোয়িং কালার চিকেনের দিকে স্থানান্তরিত হচ্ছে।’

মাঠপর্যায়ে প্রযুক্তি হস্তান্তরকে গবেষণা প্রকল্পটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা শুধু প্রশিক্ষণকেন্দ্রে মানুষ ডেকে এনে প্রশিক্ষণ দিইনি। সরাসরি যিনি খামার করবেন, বিশেষ করে নারী খামারিদের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দিয়েছি। কালিয়াকৈর ও মুক্তাগাছায় আমাদের বড় ক্লাস্টার রয়েছে। সেখানে খামারিরা এখনো সফলভাবে এই মুরগি পালন করছেন এবং লাভবান হচ্ছেন।’

গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব খামারিকে বাচ্চার পাশাপাশি নিয়মিত কারিগরি সহায়তা, সময়মতো টিকাদান ও স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করা হয়েছে, তাদের খামারে মুরগির বৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। খাদ্য রূপান্তর দক্ষতা উন্নত হয়েছে এবং মৃত্যুহার কমেছে। বাজারের চাহিদার কারণে অনেক খামারি নির্ধারিত ৫০ দিনের পরিবর্তে ১০ থেকে ১২ সপ্তাহ পর্যন্ত মুরগি পালন করে প্রতি কেজি প্রায় ৭০০ টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি করছেন।

ভোক্তা নিরাপত্তার বিষয়েও আশাবাদ ব্যক্ত করেন ড. বজলুর রহমান মোল্যা। তিনি জানান, ঢাকার একটি উন্নত গবেষণাগারে পরীক্ষায় এ মুরগির মাংসে কোনো অ্যান্টিবায়োটিকের অবশিষ্টাংশ পাওয়া যায়নি। দেশি মুরগির নামে প্রতারণা নয়, বরং উন্নত স্বাদ, পুষ্টিগুণ ও নিরাপদ মাংসের নিশ্চয়তা দিয়ে এটিকে একটি স্বতন্ত্র রঙিন মাংসের ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করাই গবেষকদের লক্ষ্য।

বিশ^বিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ কে ফজলুল হক ভূঁইয়া বলেন, ‘এই প্রকল্পের মূল শক্তি শুধু নতুন জিনোটাইপ তৈরি নয়, বরং সেটি খামারিদের কাছে কার্যকরভাবে পৌঁছে দেওয়া। এখানে প্রডিউসার গ্রুপকে নির্দিষ্ট জিনোটাইপের পাশাপাশি কারিগরি সহায়তা, ব্যবস্থাপনা উপকরণ এবং প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি গত সেবা দেওয়া হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘রঙিন মুরগির বাজার বাংলাদেশে ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে। দেশি ও বিদেশি বিভিন্ন কোম্পানি এ খাতে কাজ করছে। যদি এ ধরনের উন্নত মুরগির বাচ্চা সহজলভ্য করা যায়, তাহলে দেশের নিরাপদ প্রাণিজ আমিষ উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে, খাদ্যনিরাপত্তা জোরদার হবে এবং খামারিরাও অধিক লাভবান হবেন।’

উপাচার্য আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুষদে বহু আগে স্থাপিত বিক্রয়কেন্দ্রটি দ্রুত চালু করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় উৎপাদিত দুগ্ধ, মাংস, পোলট্রি ও মৎস্যজাত পণ্য ওই কেন্দ্রের মাধ্যমে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সাধারণ মানুষের কাছে সহজলভ্য করতে হবে। তিনি ডিনকে এ উদ্যোগের নেতৃত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান।

গবেষকরা আশা করছেন, নতুন এই রঙিন মাংস উৎপাদনকারী মুরগির জাত বাণিজ্যিকভাবে সম্প্রসারণ করা গেলে দেশের পোলট্রি শিল্পে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। নিরাপদ, সুস্বাদু ও অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক এই জাত একদিকে যেমন খামারিদের আয় বাড়াবে, অন্যদিকে দেশের মানুষের জন্য মানসম্মত প্রাণিজ প্রোটিনের সহজলভ্যতাও নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

ময়মনসিংহের চুরখাইয়ের শিক্ষিত খামারি মো. কায়েস তালুকদার বলেন, ‘আমি কয়েক দিন আগে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) গবেষকদের উদ্ভাবিত নতুন রঙিন মাংস উৎপাদনকারী মুরগির জাত সম্পর্কে জানতে পারি। বিষয়টি জানার পর থেকেই আমার আগ্রহ তৈরি হয়েছে। আমরা যারা মাঝারি পর্যায়ের খামারি, তারা সবসময় এমন একটি জাত খুঁজে থাকি, যেটি একদিকে দ্রুত বাজারজাত করা যায়, অন্যদিকে উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণে রেখে লাভ নিশ্চিত করে।

বর্তমানে খামার পরিচালনা করা সহজ নয়। খাদ্যের দাম, ওষুধ, লেবার খরচ সবকিছুই দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। অনেক সময় দেখা যায়, বাজারে মুরগির দাম কমে গেলে পুরো খামার ক্ষতির মুখে পড়ে। এই অবস্থায় যদি নতুন কোনো জাত পাওয়া যায়, যেটি কম সময়ে বাজারজাত করা যায় এবং খাদ্য রূপান্তর দক্ষতাও ভালো, তাহলে সেটি আমাদের জন্য বড় সুবিধা হবে। পত্রপত্রিকা থেকে জেনেছি, এই নতুন রঙিন মুরগি প্রায় ৫০ দিনের মধ্যে বাজারজাত করা সম্ভব। বিষয়টি সত্যি হলে এটি আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে। কারণ যত দ্রুত মুরগি বিক্রি করা যায়, ততই ঝুঁকি কমে যায় এবং ক্যাশ ফ্লো ভালো থাকে। এ ছাড়া ভোক্তাদের মধ্যে দেশি বা রঙিন মুরগির প্রতি আলাদা আগ্রহ রয়েছে, যা বাজার নিশ্চিত করতে সহায়তা করতে পারে।’

লেখক : শিক্ষার্থী, তৃতীয় বর্ষ, ভেটেরিনারি অনুষদ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত