অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তার ১০২ জাতের আমের বাগান

আম উৎপাদনের জন্য চাঁপাইনবাবগঞ্জ বা রাজশাহী অঞ্চল প্রসিদ্ধ হলেও উপকূলীয় জেলা ফেনীর সোনাগাজীতে দেশি-বিদেশি হরেক রকম আম চাষ করে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন অবসরপ্রাপ্ত এক সেনা কর্মকর্তা। তিনি মেজর (অব.) মো. সোলায়মান। তার খামারে এখন শোভা পাচ্ছে হিমসাগর, ল্যাংড়া, আম্রপালি থেকে শুরু করে আমেরিকা, স্পেন কিংবা থাইল্যান্ডের মোট ১০২ জাতের আম। গাছে গাছে থোকায় থোকায় ঝুলছে বিভিন্ন প্রজাতির আম। ফেনী নদীর তীরবর্তী মুহুরী সেচ প্রকল্প এলাকায় ৬৫ একর জমির খামারে চাষ হয়েছে এসব আম।

সেনাবাহিনী থেকে অবসরে যাওয়ার পর দেশের বিভিন্ন অঞ্চল ঘুরে কৃষি ও মৎস্য চাষে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন মেজর (অব.) মো. সোলায়মান। ১৯৯২ সালে সোনাগাজীর মুহুরী প্রকল্প এলাকায় মাত্র ৬ একর জমিতে তিনি পারিবারিক সমন্বিত খামার গড়ে তোলেন। সোনাগাজী সোয়াস এগ্রো কমপ্লেক্স নামে এ খামারে ৬ হাজার গাছের এই আমের বাগান।

তিনি বলেন, বিদেশে না গিয়ে আম চাষ করেও দেশের যুবকরা স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ রয়েছে। শুধু আমের মৌসুমে নয়, ১২ মাসই আম পাওয়া যায় এ বাগানে। আম কিনতে প্রতিদিন জেলা শহর ও দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষরা ছুটে আসেন এ বাগানে।

কৃষি বিপ্লবের এ সাফল্য কেবল উদ্যোক্তার জীবন বদলায়নি, দেখিয়েছে নতুন প্রজন্মের সামনে স্বাবলম্বী হওয়ার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রংপুর, রাজশাহী, দিনাজপুর, নওগাঁসহ দেশের সব অঞ্চলের আম রয়েছে এ বাগানে। এ ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র, স্পেন, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, নেপাল, ভারত, ভুটান, চীনসহ বিদেশি বাহারি নানা স্বাদের আমও রয়েছে এখানে। সব মিলিয়ে ১০২ জাতের আম মিলছে এই আম বাগানে।

মো. সোলায়মান ১৯৮৬ সালে সেনাবাহিনীর চাকরি থেকে অবসরে যান। এরপর দেশের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে আম, মৎস্য চাষ, গবাদিপশু পালন, মধু, সরিষা উৎপাদন ও নার্সারি তৈরির বিষয়ে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। পরে ১৯৯২ সালে তিন লাখ টাকা পুঁজি নিয়ে পারিবারিক জমিতে খামার প্রতিষ্ঠা করেন। সেনাবাহিনী থেকে অবসরে এসে

কৃষিতে শ্রম ও মেধা দিয়ে তিনি সফল হয়েছেন।

নিজে শ্রমিকদের সঙ্গে বাগান ও খামার পরিচর্যার কাজ করেন বলে বৃদ্ধ বয়সেও সুস্থ, সবল আছেন। কৃষিতে সময় দিলে কৃষি ভালো ফল দেয়, এমনটাই দাবি তার।

চলতি মৌসুমে এ বাগান থেকে ৯০-১০০ টন আম উৎপাদন হবে বলে তিনি জানান। সাধারণ জাতের আমগুলো প্রতি কেজি ৮০-১০০ টাকায় বিক্রি হয়। ব্যানানাসহ কয়েকটি জাতের আম বিক্রি হয় প্রতি কেজি ১৫০ টাকায়।

খামারের মালিক মেজর (অব.) সোলায়মান বলেন, এসব আম বাজারে নিয়ে বিক্রি করতে হয় না। খামারে এসেই ক্রেতারা কিনে নিয়ে যান। এ ছাড়া ঢাকা-চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কিছু ক্রেতা রয়েছেন, যারা কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে আম সংগ্রহ করেন। মোবাইল ব্যাংকিংয়ে টাকা পাঠিয়ে দেওয়ার পরে ঠিকানায় পৌঁছে যায় অর্ডার করা আম।

সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা জানান, বাগানে কীটনাশক বা রাসায়নিক সার ব্যবহার করেন না। কেবল আমের মুকুল আসার দুই মাস আগে একবার কীটনাশক ছিটানো হয়। আর সারা বছর ব্যবহার করেন জৈবসার। বাগানে স্থায়ী কর্মচারীর সংখ্যা ২৫ জন। আর দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে আছেন আরও ১০ জন। তারাই বাগান পরিচর্যা করেন, ফল তোলেন এবং বিপণন করেন।

তিনি জানান, এ খামারটির শুরু করেছিলেন মাত্র ৬ একর জমিতে। বাড়তে বাড়তে এখন সেটি ৬৫ একরের সমন্বিত খামার।

চট্টগ্রামের মিরসরাই থেকে আসা ক্রেতা বেলাল হোসেন বলেন, এ খামারের আমগুলো পোকা ও ফরমালিনমুক্ত। তাই আমার সন্তানদের খাওয়াতে কিনতে এসেছি। খামার কর্মচারী মো. নাহিদ বলেন, এ খামারে প্রতিদিন ৮০-১০০ কেজি আম বিক্রি হচ্ছে। খামার থেকেই ক্রেতারা আম সংগ্রহ করছেন।

খামার ম্যানেজার সাবেক সেনা সদস্য হেলাল হোসেন বলেন, সম্পূর্ণ জৈবিক পদ্ধতিতে চাষকৃত আম বাজারজাত করা হচ্ছে। ফরমালিনমুক্ত আমগুলো খামারেই প্রচুর বিক্রি হচ্ছে।

উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. হানিফ বলেন, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সার্বিক সহযোগিতায় এ খামারে জৈবিক ও ব্যাগিং পদ্ধতিসহ না প্রক্রিয়ায় আম উৎপাদন করা হয়েছে। আগামীতে এ খামারের আম বিদেশে রপ্তানি করতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ফেনীর উপ-পরিচালক কৃষিবিদ মো. আতিক উল্যাহ বলেন, সোয়াস এগ্রোতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্যোগ দুটি প্রদর্শনী প্লটে ভাগ করা হয়েছে। এবারের মৌসুমে ১শ টন আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ খামার থেকে উৎপাদিত আম বিদেশে রপ্তানির প্রক্রিয়া হাতে নেওয়া হয়েছে।