আজব রঙের কল বসাইছে

জরাজীর্ণ টিনের বাড়িতে ঢুকতেই চোখে পড়ে এক মায়াময় দৃশ্য। শতবর্ষী বাউল আব্দুল গফুরের সাদা চুল আঁচড়ে দিচ্ছেন তার স্ত্রী রোকেয়া বেগম। ১০৯ বছর বয়সী মানুষটির চোখে-মুখে ক্লান্তির ছাপ। কিন্তু পাশে থাকা একতারাটি হাতে তুলে নিতেই যেন বদলে গেল সবকিছু। কাঁপা কণ্ঠে ভেসে ওঠে বাউল সুর। বোঝা যায়, শরীর ক্লান্ত হলেও সাধনা থেমে নেই।

ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার সাখুয়া গ্রামের বাউলশিল্পী মো. আব্দুল গফুর। প্রায় ৯৪ বছর ধরে তিনি সুরে নিমগ্ন। মাত্র ১৫ বছর বয়সে গৌরীপুর উপজেলার প্রখ্যাত সাধক গুরু উমেদ আলী ফকিরের শিষ্যত্ব গ্রহণের মাধ্যমে তার বাউলজীবন শুরু। দীর্ঘ সংগীতজীবনে তিনি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তিন শতাধিক পালাগান ও বাউল গানের আসরে অংশ নিয়েছেন। তিনি ৩৫টি গান রচনা করেছেন। গানগুলো লিখিত পর্যায়ে নেই। তবে বিভিন্ন শিল্পীরা তার মুখে শুনে শুনে গানগুলো গেয়ে থাকেন।

আব্দুল গফুর বলেন, ‘গান আমার সাধনা। যত দিন শ্বাস থাকবে, তত দিন গান গেয়ে যেতে চাই।’ তার গানে উঠে আসে মানবদেহ, আত্মশুদ্ধি, সৃষ্টিকর্তার সন্ধান ও মানবতার দর্শন। তার বহুল পরিচিত গানের মধ্যে রয়েছে ‘কি রে মন কলের ঢেঁকি/কেন ধান ভানলে না,/ সারা দিন ভানলেও তুষ ছাড়া চাল দেখি না ...।’ আবার কখনো গেয়ে ওঠেন ‘আজব রঙের কল বসাইছে মানুষের দেহায়,/করিয়াছে আজব কাণ্ড,/এই কাণ্ড অখণ্ড ...।’ তার আরেকটি বিখ্যাত গান ‘জাতি জোতি ফুল মালতি তুলবে যদি আয়রে আয়, এই দেহের বাগিচায় ...।’

ব্যক্তিগত জীবনেও রয়েছে তার নানা উত্থান-পতনের গল্প। প্রথম স্ত্রী মমজান বেগমের সঙ্গে দীর্ঘ সংসার ছিল তার। প্রথম স্ত্রী মারা যাওয়ার পর দ্বিতীয় রোকেয়া বেগমকে বিয়ে করেন। প্রথম সংসারের ছেলে মিজানুর রহমান ঢাকায় একটি গার্মেন্টস কারখানায় চাকরি করেন। দ্বিতীয় সংসারের ছেলে রিয়াদ মিয়াও একই পেশায় কর্মরত। বয়সের ভারে শারীরিক নানা জটিলতায় ভুগলেও অর্থাভাবে নিয়মিত চিকিৎসা করাতে পারেন না।

রোকেয়া বেগম বলেন, ‘বয়সের কারণে তিনি আর আগের মতো দূর-দূরান্তে গিয়ে গান গাইতে পারেন না। ফলে অভাব-অনটনের মধ্যেই আমাদের সংসার চলছে। বৃষ্টি এলে ঘরের চাল দিয়ে পানি পড়ে, অনেক কষ্টে দিন কাটাতে হয়।’

সাখুয়া আদর্শ বিদ্যানিকেতনের প্রধান শিক্ষক হাসিম উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘আব্দুল গফুর শুধু সাকুয়া গ্রামের গর্ব নন, তিনি বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের লোকসংস্কৃতির এক জীবন্ত ইতিহাস। একই গ্রামের প্রতিবেশী হিসেবে ছোটবেলা থেকেই তাকে দেখে আসছি। তার কণ্ঠে শুধু গান নয়, বাংলার লোক ঐতিহ্য, মানবতা ও আধ্যাত্মিক দর্শনের এক অমূল্য ভাণ্ডার সংরক্ষিত আছে। তার মতো গুণী শিল্পীকে রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মাননা, চিকিৎসাসহ সার্বিক সহায়তা এবং তার গান সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া উচিত।’

ঈশ^রগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সানজিদা রহমান বলেন, ‘শতবর্ষী বাউলশিল্পী আব্দুল গফুরের বর্তমান অবস্থা জেনেছি। আমরা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখব।’