চব্বিশের জুলাইয়ের রক্তাক্ত অধ্যায় পেরিয়ে ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার সংগ্রামের যে ফসল দেশ-জাতির ঘরে উঠে তা একদিকে বেদনার, অন্যদিকে বিজয়ের ঐতিহাসিক স্মারক। বেদনার এ জন্য যে, অনেক প্রাণ বিসর্জনে-রক্তগঙ্গা সাঁতরিয়ে যে চেতনার আলোকে ঘটেছিল গণঅভ্যুত্থান সেই প্রত্যয়ের পূর্ণতা মেলেনি আজও। তবে আমরা বিশ্বাস করি, গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে মতভিন্নতার মধ্যেও জাতীয় স্বার্থে, নাগরিক সমাজের কল্যাণে গড়ে উঠতে পারে জাতীয় ঐক্য। জুলাই গণঅভ্যুত্থান যে শিক্ষা দিয়ে গেছে তা ঐক্যের স্মারক হয়ে সামনে থাকুক।
আমরা বিশ্বাস করি, কোনো নিপীড়নের কাছেই বিপ্লবী চেতনা মাথা নত করে না। বিশে^র দেশে দেশে এর বিস্তর নজিরও আছে। এই প্রেক্ষাপটে স্মরণে আসেন ওপার বাংলার দ্রোহী ও প্রতিষ্ঠান-বিরোধী কবি নবারুণ ভট্টাচার্য। তিনি তার ‘শেষ ইচ্ছে’ কবিতায় বলেছেন, ‘... সমস্ত মৃত্যুকে অতিক্রম করে/সমস্ত অন্ধকার অস্বীকার করে/বিপ্লব দীর্ঘজীবী হয়েছে/বিপ্লব চিরজীবী হয়েছে’। আমরা গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করি জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আত্মত্যাগী সবাইকে। সহমর্মিতা জানাই ক্ষত নিয়ে বেঁচে থাকা যন্ত্রণাকাতরদের ও অভিনন্দিত করি গণঅভ্যুত্থানের সব অংশীজনকে। আমরা জানি, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা হলো এমন একটি ব্যবস্থা, যা জনগণের ভোটের অধিকার তো বটেই, একই সঙ্গে সবার সমতার নীতির ওপর তৈরি একটি ভিত্তি। অনেকেরই জিজ্ঞাসা, জুলাইয়ের প্রত্যয়-চেতনা বাস্তবায়ন কতটা হলো। গণঅভ্যুত্থানের ফসলস্বরূপ যে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়েছিল সেই শাসন-অধ্যায় জনপ্রত্যাশা পূরণে কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রশ্নবোধক চিহ্ন দাঁড় করিয়ে গেছে। তবে আমাদের প্রত্যাশা, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ফিরে আসা এবং জনগণের রায়ে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত সরকার জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অঙ্গীকার বাস্তবায়নে সক্ষমতার স্বাক্ষর রাখতে সমর্থ হবে।
আমরা হতাশা-নিরাশা নয়, বরং আশার পরিসর বৃহৎ থেকে বৃহত্তর করার কাতারে। ভিন্নমত-ভিন্ন ধর্ম ও ভিন্ন জীবনযাপনে বিশ্বাসী সবার অধিকারের ভূমি সমতল ও নিষ্কণ্টক করার লক্ষ্যে সরকার তো বটেই, প্রতিটি রাজনৈতিক দলের নীতিনির্ধারকদের সমান্তরালে দাঁড়াতে হবে। বৈষম্যের ছায়া সরাতে হবে। সুশাসন, ন্যায়বিচার এবং জনগণের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার মাধ্যমেই কাক্সিক্ষত দেশ গড়ে তোলা সম্ভব। জুলাইয়ের চেতনা কোনো দলীয় সংকীর্ণতার মধ্যে গণ্ডিবদ্ধ করার কোনো অবকাশ নেই, বরং তা জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে টিকিয়ে রাখতে হবে। জননিরাপত্তাসহ জীবনযাপনের পথ করতে হবে মসৃণ। জুলাই গণঅভ্যুত্থান এই বার্তাগুলো স্পষ্ট করে দিয়েছে। বিস্মৃত হলে চলবে না, রাজনৈতিক সংস্কার ও দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন গড়া এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। মনে রাখতে হবে, জনমানুষের কাক্সিক্ষত বৈষম্যহীন সমাজ ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রকাঠামো প্রতিষ্ঠিত করতে দীর্ঘমেয়াদি ও আন্তরিক উদ্যোগ প্রয়োজন এবং এসব ক্ষেত্রে বিভাজন নয়, ঐক্যেই বড় শক্তি। শহীদ ও আহতদের পরিবারের পুনর্বাসন নিশ্চিত করার মাধ্যমে জুলাইয়ের প্রত্যাশা পূরণ করতে হবে। বহুমুখী সংস্কারে সরকারের মনোযোগ গভীর করতে হবে।
আমরা প্রত্যাশা করব, ব্যক্তি কিংবা দলীয় সংকীর্ণতার কারণে বিভাজন ও স্বৈরতন্ত্রের পথ আর তৈরি হবে না। কেন অনিবার্য হয়ে উঠেছিল জুলাই গণঅভ্যুত্থান তা সচেতন সবাইকে বিশেষ করে রাজনীতিকদের আত্মস্থ করা খুব জরুরি। মনে রাখা উচিত সাম্য, সামাজিক ন্যায়বিচার, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির আকাক্সক্ষা থেকে স্বাধীন বাংলাদেশে ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে গণক্ষোভের প্রকাশ ফিরে ফিরে গণবিস্ফোরণের আভাস হিসেবে রাজনীতিবিদদের সতর্ক করে এলেও, দুখঃজনক যে, এই বার্তা রাজনীতির অনেক নীতিনির্ধারকই আমলে নেননি। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করে বিশ্বের বুকে আমরা এই বার্তা দিয়েছিলাম, নিপীড়নকারী শাসকগোষ্ঠীর প্রতি তীব্র ঘৃণা কীভাবে উগরে দিতে হয়, কীভাবে প্রতিষ্ঠা করতে হয় জনঅধিকার। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপট ও রূপান্তর স্বাধীন দেশে বার্তা দিয়েছে, রাষ্ট্র পরিচালকদের প্রভুর ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ার সুযোগ নেই, বরং জনমতকে শ্রদ্ধা করে নাগরিকদের ভোটার নয়, সর্বাগ্রে মানুষ হিসেবে গণ্য করতে হবে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক ঐতিহাসিক মাইলফলক জুলাই গণঅভ্যুত্থান। এই অধ্যায় রাষ্ট্র বিনির্মাণের যে সুযোগ করে দিয়েছে তা কাজে লাগাতেই হবে। শুদ্ধাচারের রাজনীতির পথ করতে হবে নিষ্কণ্টক। বাকস্বাধীনতা, আইনের চোখে সমতা, প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা, শাসনব্যবস্থার মতো জরুরি বিষয়গুলো যেন আর প্রশ্নবিদ্ধ না হয়।