জুলাই বিপ্লবকে অনেকেই অনেকভাবে ব্যাখ্যা করেন। আমার কাছে এটি একটি নিছক বিপ্লব নয়, যার মধ্য দিয়ে কেবল একটি স্বেচ্ছাচারী সরকারের পতন ঘটিয়ে মুখরোচক কিছু বন্দোবস্তের প্রতিশ্রুতি দেওয়া। বরং এটি মানুষের দীর্ঘ আকাক্সক্ষার একটি স্বতঃস্ফূর্ত বিস্ফোরণ, যার মধ্য দিয়ে যা কিছু পুরনো, যা কিছু অচল এবং যা কিছু অকার্যকর, এর স্থলে নতুন, সচল এবং কার্যকর একটি বন্দোবস্তের মধ্য দিয়ে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের আকাক্সক্ষাকে বাস্তবায়ন করার একটি সুযোগ। পাকিস্তান রাষ্ট্র থেকে পৃথক হয়ে যখন থেকে আমরা বাংলাদেশ হিসেবে যাত্রা শুরু করলাম, অনেক চড়াই-উতরাই পার হয়ে স্বাধীনতাপ্রাপ্তির ৫৫ বছর সময়ে অনেক বিসর্জনের ভারে সবচেয়ে বড় যে অর্জনটা এখনো আমাদের মধ্যে জ্বলজ্বল করে কাজ করে, তা হচ্ছে আমরা স্বাধীন, আমরা চাইলেই আমাদের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটাতে পারি। বৈষম্যের গন্ডি অতিক্রম করে সাম্যের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সুযোগ আছে। কিছু প্রাপ্তি ঘটেছে, এর পাল্লাটা আরও ভারী হতে পারত, তবে অপ্রাপ্তির পাল্লা নিঃসন্দেহে অনেক বেশি ভারী। এই বোঝা বছরের পর বছর বহন করতে করতে আমরা আসলেই অনেক বেশি ক্লান্ত হয়ে উঠেছিলাম। আর এই ক্লান্তি আর অবসাদের চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যাশায় বিশাল বিস্ফোরণ। একটি স্বাধীন দেশে এতটা বিস্ফোরণের ইতিহাস বিশ্বে খুব একটা নেই।
সাম্য, সামাজিক ন্যায়বিচার, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির আকাক্সক্ষা থেকে স্বাধীনতার পর থেকে বেশ কয়েকটি গণবিস্ফোরণ ঘটেছিল, যা বড় ধরনের বিস্ফোরণের আভাস হিসেবে রাজনীতিবিদদের বারংবার সতর্ক করেছিল। দুর্ভাগ্য, এই বার্তা সবাই সচেতনভাবে এড়িয়ে গেছেন। ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করতে গিয়ে ভিন্ন মতাবলম্বীদের দমন, সুযোগ বুঝে অস্তিত্বহীন করে দেওয়ার প্রচেষ্টা আর যাই হোক, সাধারণ মানুষের পক্ষ থেকে কখনো সমর্থিত হয়নি। এ সবই ছিল জুলাই বিপ্লবের মূল চেতনা। এক কথায় এটি সারা দেশের মানুষের ব্যক্ত-অব্যক্ত সমস্ত আকাক্সক্ষাকেই যেন ধারণ করেছিল। জুলাই বিপ্লবের দুবছর পূর্তিকে সামনে রেখে আমরা প্রতিটি মানুষই যেন আত্মজিজ্ঞাসা এবং আত্মসমালোচনার সম্মুখীন হচ্ছি। বিপ্লব-উত্তর আজকের এই সময়ে এসে এটি যেন বৃত্তবন্দি হয়ে গেছে! এই চেতনাটির অর্থ হয়ে গেছে ভিন্ন, যা থেকে অনেকের মধ্যেই আজ এই বোধোদয় ঘটতে শুরু করেছে যে আমরা আসলে জুলাই চেতনাকে মন এবং মেজাজে সেই অর্থে ধারণ করতে পারিনি। বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে বৈষম্যকেই কি আবার নতুন ফরমেটে প্রতিষ্ঠা করছি কি না, এই প্রশ্ন বারবার উঁকি দেয় মনের ভেতর। একদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থার অবসান ঘটাতে গিয়ে আমরা কি দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতিকেই বিনষ্ট করছি কি না সেটাও একটা প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। অথচ জুলাই পরবর্তী সময়ে সমগ্র জাতির তো ঐক্যবদ্ধ থাকার কথা ছিল। এতটা বিভাজন নিয়ে প্রতীক্ষিত বিপ্লবের সুফল বাস্তবায়ন করে ‘নতুন বন্দোবস্ত’ নামক বিষয়টি এখন কেবল কাগুজে সেøাগান বৈ আর কিছুই মনে হয় না।
একটি কোটাবিরোধী আন্দোলন নিয়ে সরকারের গোঁয়ার্তুমিকে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষের জেগে ওঠার নেপথ্যে কি কখনো এমনটা কল্পিত ছিল যে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে এর মধ্য দিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ হতে হবে? এটা কি কাক্সিক্ষত ছিল যে বিচারের নামে ‘মব’ করে বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে নতুন করে জাগিয়ে তুলতে হবে? মুক্তিযোদ্ধারা দেশের সূর্যসন্তান, তারাও অপরাধের কারণে বিচারের ঊর্ধ্বে নন, তাই বলে কি তাদের গলায় জুতার মালা পরিয়ে বিকৃত উল্লাস করতে হবে? জাতি হিসেবে আমরা কি নিজেদের খুব বেশি হাস্যকর করে ফেলছি না? প্রশ্ন আছে অনেক এবং রাজনৈতিক মেরূকরণের বহুমুখী প্রশ্নের সমীকরণও আছে। ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শকে সম্মান না করা যদি বিগত সরকারের অন্যতম অপরাধ হয়ে থাকে, তবে ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে দেশের অসংখ্য রাজনৈতিক নেতার নামে হামলা, মামলা, ঘরবাড়ি পুড়ানো, সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন, বিচারবহির্ভূত হত্যাসমূহ– এসবের দায় কে নেবে? রাষ্ট্র একটি জড়বস্তু হয়েও অনেক রাজনৈতিক যন্ত্রণাকে ধারণ করে আছে। ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর যে উদ্দেশ্য নিয়ে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠত হয়েছিল, সেই উদ্দেশ্যের কতটা বাস্তবায়ন হয়েছে? কথা ছিল তিনি তার নির্দিষ্ট সময়কালে একটি সংস্কার প্রক্রিয়া চালু করে পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করে বিদায় নেবেন। এই লক্ষ্যে গঠন করেন ৭টি কমিশন। কমিশনগুলোর পেছনে সরকারের কোটি কোটি টাকা অর্থ ব্যয় করার পর এর প্রতিবেদনগুলো সম্পর্কে মানুষের মধ্যে স্পষ্ট ধারণা নেই। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের মধ্যে কী ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা হয়েছে তা আমরা প্রত্যক্ষ করলাম। বর্তমান সরকার সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল হিসেবে অনেক মৌলিক বিষয়ে দ্বিমত করলেও একতরফাভাবে কমিশনের প্রতিবেদন তৈরি হলো, তাদের প্রতিবাদকে পর্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হলো না। জাতীয় নির্বাচন এবং গণভোট একই দিনে অনুষ্ঠিত হলেও চারটি প্রশ্নের ওপর ভিত্তি করে এই গণভোটের ফলাফল আসলে জাতিকে কী দিল, সেটাও কেউ বুঝতে পারল না। সরকার গঠনের পর সংবিধান সংস্কার নিয়ে বিরোধীদের সঙ্গে সরকারের মতপার্থক্য দূরীকরণে দিনশেষে বর্তমান সংবিধানকেই অবলম্বন করতে হচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে সংবিধান সংস্কার কমিশনের সদস্য হিসেবে নতুন সাংসদের একাংশের শপথের আইনগত ভিত্তি নিয়েও রয়ে গেছে বিস্তর প্রশ্ন।
বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের কর্মকান্ড সম্পাদন করতে গিয়ে একাধিক উপদেষ্টার নাম জড়িয়েছে দুর্নীতিতে। কারও কারও বিরুদ্ধে হাজার কোটি টাকা অনিয়মের অভিযোগ পর্যন্ত উঠেছে। অতীতের আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের অন্যতম কারণ ছিল লাগামহীন দুর্নীতি। এই দুর্নীতির বিরুদ্ধে যদি জিরো টলারেন্স দেখানো হয়, তাহলে বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের অপরাধকে কেন আড়াল করা হবে? অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্বে থাকা অবস্থায় মাত্র ১৮ মাস সময়ে প্রধান উপদেষ্টা ১৪ থেকে ১৫টি দেশ সফর করে দেশের কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে কী অর্জন করলেন দেশের জন্য, সে হিসাব কষা একটা দরিদ্র দেশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভাবতে কষ্ট হয়, স্বাধীনতার সাড়ে ৫ দশক পর সাম্প্রতিক সময়ে এসে আমাদের আত্মপরিচয় আজ গভীর সংকটে নিমজ্জিত। স্বাধীনতাবিরোধীরা বুক ফুলিয়ে ৭১-কে যেমন চ্যালেঞ্জ করছে, সম্ভাব্য প্রতিহিংসার মুখোমুখি এবং সম্মান হারানোর ভয়ে অনেক মানুষ মুখ বন্ধ রেখেছেন। সবচেয়ে বড় সংকটটি এখন বিরাজ করছে দেশের অর্থনীতিতে। বিগত দুই বছর সময়ে রাজনৈতিক দলাদলি, যেমন আওয়ামী লীগকে দেশের রাজনীতি থেকে চিরতরে বিলীন করে দেওয়ার প্রচেষ্টার পেছনে বর্তমানে সক্রিয় দলগুলো যে সময় ব্যয় করেছে এর বিপরীতে অর্থনৈতিক উন্নয়ন, বৈদেশিক বিনিয়োগ এবং দেশের মানুষের কর্মসংস্থানের পরিবেশ সৃষ্টিতে সে রকম উদ্যোগ লক্ষণীয় হয়নি। ফলত এই সময়ের মধ্যে অনেক বিদেশি বিনিয়োগকারীরা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। যদিও বর্তমান সরকার সাম্প্রতিক সময়ে এই বিষয়টিতে মনোযোগী হয়েছে। সমস্যা শুরু হয়েছে নতুন করে তরুণদের সঙ্গে, যারা জুলাই বিপ্লবের নেতৃত্ব দিয়ে এককভাবে এর সাফল্য দাবি করছে।
সাম্প্রতিক সময়ে হবিগঞ্জ এবং সিলেটের ঘটনার পেছনে সরকার এবং আক্রান্ত তরুণদের নিজ নিজ বক্তব্য রয়েছে। একটি কথা নির্মোহভাবে বলা আবশ্যক মনে করছি ৫ আগস্ট পূর্ববর্তী সময়ে তখনকার বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের নামে তরুণরা যেভাবে সমবেত হয়েছিলেন, সত্যিকার অর্থেই মানুষের মনে ব্যাপক আশার সঞ্চার হয়েছিল। দেশের যেকোনো অন্যায়, অবিচার, জুলুম এবং নির্যাতনের বিরুদ্ধে তাদের ভ্যানগার্ড হিসেবে ভাবতে শুরু করেছিলেন সবাই। তবে এর পরবর্তী সময়ে লেখাপড়ার পাট কোনো রকমে চুকিয়ে বা না চুকিয়েই অনেকে যেভাবে রাজনীতিতে নিজেদের সম্পৃক্ত করেছেন, দল গঠন করেছেন, সাংসদ হয়েছেন সেটা যেন জুলাই বিপ্লবের চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক! মানুষের ভাবনাগুলো এখন অনেক পরিশীলিত হতে শুরু করেছে। এখন এই ভাবনার জায়গায় এমন অপ্রিয় বিষয়গুলো ঠাঁই পেতে শুরু করেছে যে জুলাই বিপ্লবটি ছিল একটি সুচিন্তিত পরিকল্পনার বাস্তবায়ন। এমনটা মানুষ বিশ্বাস করতে না চাইলেও এই বিপ্লবের কুশীলবদের অনেকের কথার মধ্য থেকেই বিভিন্ন সময় বিষয়টি উঠে এসেছে। তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা তো অকপটেই যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে ক্লিনটন সেন্টারের অনুষ্ঠানে এটিকে একটি ‘মিটিকিউলাস ডিজাইন’ বলে অভিহিত করেছেন। কেউ কেউ ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে বিপ্লবী সরকার গঠন করতে না পেরে একে অপরকে দোষারোপ করছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের একজন ছাত্র উপদেষ্টা তো বলেই ফেলেছিলেন যে নির্দিষ্ট সময়ে হাসিনা সরকারের পতন না হলে তাদের সশস্ত্র আন্দোলনের প্রস্তুতি ছিল। তেমনটা থাকলে তাহলে সেই অস্ত্রগুলো কোথায়, এই প্রশ্নের উত্তর আজও মেলেনি। অনেক কথাই বলার ছিল। একদিনে এত কথা হয়তো অনেকের জন্য ভালো লাগবে না। পরিবেশ পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে আরও কথা হবে। আর সে রকম না থাকলে তবে এগুলোই হোক শেষ কথা।
লেখক : রাজনীতি-কূটনীতি বিশ্লেষক। অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
mfulka@yahoo.com