শহীদদের স্বপ্ন বাস্তবায়নে ছাড় দেবে না বিএনপি

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের আত্মত্যাগ এবং জনগণের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাকে পূর্ণমাত্রায় ধারণ করে বর্তমান সরকার কাজ করে যাচ্ছে বলে দাবি করছেন বিএনপি নেতারা। তারা বলছেন, গণঅভ্যুত্থানের শহীদরা যে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচারের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নে বিএনপি বদ্ধপরিকর।

২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তি উপলক্ষে গত কয়েক দিন ধরেই বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনগুলো নানা কর্মসূচি পালন করছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আজ জুলাই স্মৃতি জাদুঘর উদ্বোধন করবেন।

বিএনপি নেতারা বলছেন, জুলাই শহীদ পরিবারের পাশাপাশি ১৭ বছর আওয়ামী লীগ সরকারবিরোধী আন্দোলনে নিহতদের স্বজনের পাশে থাকবে তাদের দল। জুলাই অভ্যুত্থানের খুনিদেরও কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে সবার বিচার নিশ্চিত করা হবে।

বিরোধী দলের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হচ্ছে, বিএনপি জুলাই আন্দোলনের আকাক্সক্ষা ও গণভোটের রায়কে পাশ কাটিয়ে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করছে। সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দলীয় লোকদের বসানো হচ্ছে। তবে এসব অভিযোগ উড়িয়ে দিতে চান বিএনপি নেতারা। তারা বলছেন, বিরোধী দলের অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই, বরং বিএনপি জুলাই জাতীয় সনদ অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করবে। বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতারা দেশ রূপান্তরকে জানান, রাষ্ট্র পরিচালনায় ক্ষমতার ভারসাম্য আনা এবং এক ব্যক্তিকেন্দ্রিক শাসন পদ্ধতির অবসান ঘটাতে বিএনপি বহু আগেই ‘৩১ দফা রাষ্ট্র মেরামতের রূপরেখা’ ঘোষণা করেছে। এটি জুলাইয়ের গণআকাক্সক্ষার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। পাশাপাশি বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী এবং প্রশাসনকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করে জনকল্যাণমুখী ও নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার কাজ চলছে। জনগণের মৌলিক অধিকার, বাকস্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এবং আইনের শাসন সুনিশ্চিত করতে বিএনপির অঙ্গীকারের কোনো ঘাটতি নেই বলেও দাবি করছেন তারা।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের আত্মত্যাগ ও জনগণের গণতান্ত্রিক আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নে কাজ করছে সরকার। জুলাই সনদ অনুযায়ী জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং শহীদদের স্বপ্নের আধুনিক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ বিনির্মাণে বিএনপি সব সময় আপসহীন থাকবে।’

বিএনপি মহাসচিব এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনা এবং রাষ্ট্র সংস্কারের অংশ হিসেবে সই হওয়া জুলাই সনদের প্রতিটি অক্ষর ও প্রতিশ্রুতি পুরোপুরি বাস্তবায়নে বিএনপি বদ্ধপরিকর। এই সনদে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যের বিষয়গুলো এবং জনগণের অধিকার ও রাষ্ট্র সংস্কারের যেসব প্রতিশ্রুতি রয়েছে, তা বিএনপি পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন করবে। কোনো ধরনের বিভ্রান্তি বা বিতর্ক তৈরি না করে আলোচনার মাধ্যমে সব কিছু সমাধান করা হবে।’

তিনি বলেন, ‘জুলাইয়ের প্রকৃত চেতনা প্রতিষ্ঠা করতে হলে প্রতিশোধ বা প্রতিহিংসার রাজনীতি পরিহার করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ ধরনের রাজনীতির বিরুদ্ধে। এর পরিবর্তে জাতীয় ঐক্য, সুশাসন, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই কেবল জুলাইয়ের কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনা সম্ভব।’

গণঅভ্যুত্থানের পর সমাজ ও প্রশাসনে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন না আসায় আক্ষেপ করে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘শুধু সরকার বা রাজনৈতিক নেতৃত্ব বদলালেই চলবে না, সমাজের প্রতিটি মানুষের মন-মানসিকতার পরিবর্তন ঘটাতে হবে। পাশাপাশি যারা অতীতে দুর্নীতি বা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, তাদের মধ্যে ভোল পাল্টে জুলাই-যোদ্ধা হিসেবে নিজেদের জাহির করার যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।’

বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘জুলাইয়ের আত্মত্যাগ ও গণঅভ্যুত্থানের অর্জনকে কোনো ব্যক্তিগত বা সংকীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা যাবে না। তরুণদের এই আত্মত্যাগের মূল চেতনাকে ধারণ করে একটি গণতান্ত্রিক, বৈষম্যহীন ও দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়াই মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।’

বিএনপি জুলাই আন্দোলনের আকাঙ্ক্ষা ও গণভোটের রায়কে পাশ কাটিয়ে প্রতারণা করছে বিরোধী দলের এমন অভিযোগ নাকচ করেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। পাল্টা অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, ‘বিরোধী দল আওয়ামী লীগের ভাষায় কথা বলছে। একটি মহল জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে বিএনপির বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে। এটি ঠিক হচ্ছে না। পুরোপুরি ভ্রান্ত ধারণা দেওয়া হচ্ছে। আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে বিএনপি সরকার সব সমস্যার সমাধান করতে চায়।’

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘ছাত্র-জনতা একটি বৈষম্যহীন, শোষণমুক্ত ও গণতান্ত্রিক সমাজের স্বপ্ন থেকে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে রাজপথে রক্ত দিয়েছে। দীর্ঘ ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান ঘটিয়ে জনগণের বাকস্বাধীনতা, ভোটের অধিকার এবং আইনের শাসন ফিরিয়ে আনাই এই অভ্যুত্থানের মূল স্বপ্ন ছিল। এটি যেকোনো মূল্যে বিএনপি বাস্তবায়ন করবে।’

সতর্ক করে দিয়ে তিনি বলেন, ‘জুলাইয়ের স্বপ্ন বাস্তবায়নে দেরি হলে গণতন্ত্রবিরোধী অপশক্তি সুযোগ নিতে পারে। তাই দেশের স্বার্থে সব পক্ষকে ঐক্যবদ্ধ থেকে জনগণের প্রকৃত অধিকার ও ক্ষমতার মালিকানা ফিরিয়ে দেওয়ার কাজ দ্রুত শেষ করার চেষ্টা করছে বিএনপি সরকার। জুলাই গণঅভ্যুত্থান কোনো নির্দিষ্ট দল বা ব্যক্তির একক অর্জন নয়; এটি পুরো জাতির, বিশেষ করে তরুণ সমাজের সম্মিলিত বিপ্লব। তাই এই বিপ্লবের স্বপ্নকে কোনো সংকীর্ণ দলীয় স্বার্থে ব্যবহার না করে একটি সমৃদ্ধ, সাম্যভিত্তিক এবং দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গঠনে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।’

অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন বলেন, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদরা যে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচারের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে বর্তমান সরকার বদ্ধপরিকর। জুলাই গণহত্যার বিচারও অবশ্যই নিশ্চিত করা হবে।’

এ বিষয়ে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জুলাই শহীদসহ দেশের সব গণতান্ত্রিক আন্দোলনের শহীদদের অবদান জাতি কখনো ভুলবে না। তাদের আত্মত্যাগের স্বীকৃতি তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন একটি কার্যকর সংসদের মাধ্যমে জনগণের অধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। বিএনপি সরকার সেই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।’

বিএনপি নেতারা বলছেন ছাত্র-জনতার রক্তে ভেজা জুলাই অভ্যুত্থানের খুনিদের ক্ষমা করা বা ছাড় দেওয়ার অর্থ হবে শহীদদের আত্মার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা। তাই আন্দোলন দমনে যারা নির্বিচারে গুলি চালিয়ে মানুষ হত্যা করেছে তাদের সবাইকে আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল বা প্রচলিত আইনের মাধ্যমে বিচারের আওতায় আনা হবে। অপরাধীদের রাজনৈতিক বা অন্য কোনো পরিচয়ে বাঁচানোর সুযোগ নেই। আন্দোলন চলার সময়ে যারা সরাসরি বা নেপথ্যে থেকে ফ্যাসিস্ট সরকারকে সহযোগিতা করেছে তাদের বিরুদ্ধেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা চাই জুলাই গণঅভ্যুত্থান দেশপ্রেমিক মানুষের মনের মধ্যে জাগরূক থাকুক। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর দৃষ্টি রয়েছে বাংলাদেশের ওপর। আমরা চাই বিএনপি সরকারের সবার আগে বাংলাদেশ নীতি অটুট থাকুক। দীর্ঘদিন দুর্নীতি হয়েছে, এই দুর্নীতি বন্ধ হোক। দীর্ঘদিন আমরা গণতান্ত্রিক অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিলাম। এখন সেই অধিকার ফিরে পেয়েছি। এখন আমরা যেন কিছু না করি যাতে বিতাড়িত শক্তি ফিরে আসতে পারে এবং আমরা আবার গণতান্ত্রিক অধিকার হারিয়ে ফেলি।’