জুলাই সনদ নিয়ে আপস করতে চায় না জামায়াত

আপডেট : ০৫ আগস্ট ২০২৬, ০২:০৩ এএম

আন্দোলন শুরু হয়েছিল সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে, চব্বিশের জুলাইয়ের শেষভাগে সেটাই পরিণত হয় সরকার পতনের এক দফায়। ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ‘নতুন দেশ’ গড়ার স্বপ্ন দেখার শুরু। সব ধরনের বৈষম্য দূর করে নতুন বন্দোবস্তের আকাঙ্ক্ষা থেকে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রণীত হয় ‘জুলাই জাতীয় সনদ’।

তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর এই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকার গড়িমসি করছে বলে অভিযোগ তুলছে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী। দলটির নেতারা বলছেন, জুলাই আন্দোলনে শহীদদের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে এই সনদ বাস্তবায়নের কোনো বিকল্প নেই। বর্তমান সরকার ব্যবস্থাটি ফ্যাসিবাদ তৈরি হওয়ার উর্বর ক্ষেত্র। তাই কাঠামোগত সংস্কার না করে ফ্যাসিবাদের প্রবণতা নির্মূল করা সম্ভব নয়।

জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা-১২ আসনের সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বর্তমান সরকারি ও বিরোধী দলের প্রায় সবাই আওয়ামী লীগ আমলে নির্যাতিত ছিলেন। ফাঁসির আসামিও এখন সংসদ সদস্য হয়েছেন। এই সংসদ, সরকারি দল, বিরোধী দল- এর সবই জুলাইয়ের অবদান।’

তিনি বলেন, ‘বর্তমান সরকার কাঠামোতে প্রধানমন্ত্রীকে অগাধ ক্ষমতা দেওয়া আছে। তিনি যা চাইবেন, তাই হবে। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন হলে ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরি হবে। কেউ চাইলেও আর স্বৈরাচার হতে পারবে না। বিএনপিও এই সনদে স্বাক্ষর করেছিল। অথচ তারা ক্ষমতায় গিয়েই সুর বদলে ফেলেছে। তারা সংসদে সরকারের কাঠামো সংস্কারের বিল না এনে উল্টো জুলাই সনদকে অন্তহীন প্রতারণার দলিল হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।’

সাইফুল আলম খান বলেন, ‘বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনের আগে হ্যাঁ এর পক্ষে ভোট চেয়েছেন। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করা তাদের কর্তব্য ছিলো। মানুষ যখন হ্যাঁ-এর পক্ষে স্বতঃস্ফূর্ত ভোট দিয়েছে, তখনই এই জুলাই সনদ তাদের হক হয়ে গেছে।  বিএনপি নির্বাচনের আগে ৩১ দফা ঘোষণা করেছে। অনেকেই তাদের প্রতিশ্রুতি দেখে আকৃষ্ট হয়েছেন। তাদের ৩১ দফায় সংবিধান সংস্কারের কথা থাকলেও এখন গঠন করা হয়েছে সংবিধান সংশোধন কমিটি।’

সরকারি দলের বিরুদ্ধে দ্বিচারিতার অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, ‘হবিগঞ্জে এনসিপির এক ছেলের চোখ নষ্ট করে দেওয়া হলো। আবার উল্টো মিথ্যা মামলা দেওয়া হলো এনসিপি নেতাদের নামে। মোংলায় একজন কৃষককে গুম করার খবর শোনা যাচ্ছে। এখনও হাদি হত্যা মমলার চার্জশিট দেওয়া হয়নি। এখন তো আমাদেরও ভয় হয়, কখন জানি ধরে নিয়ে যায়। তাহলে কি জুলাই আন্দোলনের আগে যে অত্যাচারের রাজ্য ছিলো- সেটা আবার ফিরে আসছে?’

এদিকে জুলাই অভ্যুত্থান স্মরণে সারাদেশে নানা কর্মসূচি পালন করছে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট। এসব কর্মসূচিতে নেতারা জুলাই সনদ বাস্তায়নের জন্য সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করছেন। সনদ বাস্তবায়ন না হলে কঠোর কর্মসূচি দেওয়ার হুঁশিয়ারিও দিচ্ছেন তারা। 

জামায়াতের নায়েবে আমির ও রাজশাহী-১ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক মুজিবুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গণতন্ত্রের মূল কথাই হলো সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মতের মূল্যায়ন ও সম্মান করা। অথচ বর্তমান সরকারের কর্মকা-ে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার পূর্ণ প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। বিশেষ করে নির্বাচন ও গণভোটের মতো মৌলিক বিষয়গুলোতে জনগণের রায়কে তোয়াক্কা না করার একটি প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। যতদিন পর্যন্ত সরকার জনগণের ভোট ও রায়কে সম্মান না জানাবে, ততদিন পর্যন্ত তাদেরকে গণতান্ত্রিক হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।’

দলের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘জুলাই সনদের ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবে বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল সই করেছিল। তবে বর্তমানে সেই অঙ্গীকার থেকে তারা সরে এসেছে। কেবল আইনের আংশিক সংশোধন নয়, গণভোটের গণরায় অনুযায়ী সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর সংস্কার প্রয়োজন। এ সংস্কার বাস্তবায়ন হলে রাষ্ট্রক্ষমতা এককভাবে কোনো সরকারের হাতে কেন্দ্রীভূত থাকবে না।’

বিএনপি ক্ষমতায় গিয়ে জুলাইয়ের চেতনাকে ভুলে গেছে অভিযোগ করে তিনি বলেন, ‘তারা প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে দলীয় লোকজন নিয়োগ দিচ্ছে। জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রশ্নে কোনো আপস করা হবে না। সংসদে জনগণের দাবি উপেক্ষা করা হলে রাজপথে আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।’

জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও ১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক ড. হামিদুর রহমান আজাদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দীর্ঘ সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের বিনিময়ে দেশের মানুষ নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিল। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছাত্র-জনতা সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের লক্ষ্যেই রাজপথে নেমেছিল। কিন্তু আজও জনগণ দারিদ্র্যমুক্ত, বৈষম্যহীন ও সুশাসনভিত্তিক রাষ্ট্র পায়নি। সেই আন্দোলনের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তিতে দেশের প্রতিটি বিভাগে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হচ্ছে এবং সবার একটাই দাবি, গণভোটের রায়ের ভিত্তিতে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে হবে।’

 জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগর উত্তরের আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এক সময় আওয়ামী লীগ মনে করত তারা তারা ২০৪১ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকবে। তারা বাংলাদেশকে একটি আধিপত্যবাদী শক্তির করদরাজ্যে বানিয়ে দিয়েছিল। আমাদের এখানে এখানে রেললাইন হলে শ্রমিক নিতে হবে বিশেষ একটি দেশের। তারা আমাদের রাস্তা ব্যবহার করবে, ট্রেন লাইন নেবে আমাদের বন্দর ব্যবহার করবে। এ অবস্থা থেকে আপাতত দেশ মুক্তি পেয়েছে। এটা আমাদের জুলাইয়ের প্রাপ্তি।’

তিনি বলেন, ‘সামগ্রিকভাবে প্রত্যাশা ছিল, জুলাইয়ের চেতনার আলোকে ফ্যসিবাদমুক্ত, ইনসাফের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা। মানুষকে আর দুর্নীতির সম্মুখীন হতে হবে না, ঘুষ দিতে হবে না, দেশটা চলবে সবার পরামর্শের ভিত্তিতে। কিন্তু বর্তমান সরকারের কর্মকা-ে মানুষ আশাহত হচ্ছে। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করার যে দায়িত্ব ছিল বর্তমান সংসদের বা সরকারি দলের, তারা তাতে গড়িমসি করছে। দেশ এখন আরেকটা ফ্যাসিবাদের দিকে যাচ্ছে কিনা- তা নিয়ে মানুষের মধ্যে আশঙ্কা রয়েছে। এ আশঙ্কার জায়গাটা সরকারকে দূর করতে হবে। কোনো ধরনের সংবিধানের ব্যাখ্যার নামে মূল স্পিরিট থেকে সরে যাওয়া যাবে না।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত