চলনবিলের বিস্তীর্ণ জলরাশি, নদী-খাল আর সবুজ প্রান্তরের বুক থেকে যুগে যুগে জন্ম নিয়েছে বহু কৃতী মানুষ। তবে কিছু মানুষ থাকেন, যারা শুধু একটি অঞ্চলকে প্রতিনিধিত্ব করেন না, তারা হয়ে ওঠেন একটি জনপদের আত্মপরিচয়। অধ্যক্ষ সরদার মোহাম্মদ আবদুল হামিদ ছিলেন তেমনই একজন মানুষ। শিক্ষা, গবেষণা, সাহিত্য, সাংবাদিকতা ও সমাজসেবার মাধ্যমে তিনি যে আলোর পথ তৈরি করে গেছেন, তা আজও চলনবিলের মানুষের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস।
১৯৩০ সালের ১ মার্চ নাটোর জেলার গুরুদাসপুর উপজেলার খুবজীপুর গ্রামের এক সাধারণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। শৈশব থেকেই ছিলেন অসাধারণ কৌতূহলী ও জ্ঞানপিপাসু। যখন গ্রামের অন্য শিশুরা খেলাধুলায় ব্যস্ত, তখন ছোট্ট হামিদ জ্ঞানের সন্ধানে ছুটে বেড়াতেন।
দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র থাকাকালে একদিন নানার বাড়িতে তার চোখ আটকে যায় একটি পত্রিকার পাতায়। সেটিই ছিল সংবাদপত্রের সঙ্গে তার প্রথম পরিচয়। নানার কাছ থেকে জানতে পারেন, পত্রিকা মানুষকে জ্ঞানী করে, পৃথিবীকে চিনতে শেখায়। সেই একটি কথাই তার জীবনের গতিপথ বদলে দেয়।
এরপর শুরু হয় জ্ঞান অর্জনের এক অসাধারণ যাত্রা। প্রতি সপ্তাহে খুবজীপুর থেকে ছয় মাইল পথ হেঁটে গুরুদাসপুর পোস্ট অফিসে যেতেন পত্রিকা সংগ্রহ করতে। প্রতিটি লেখা মন দিয়ে পড়তেন। সেই ছোট্ট বালকের মধ্যেই লুকিয়ে ছিল ভবিষ্যতের এক জ্ঞানসাধক মানুষের বীজ।
শিক্ষা ও কর্মজীবনের পথচলা
প্রতিকূল পরিবেশকে জয় করে তিনি এগিয়ে যান শিক্ষার পথে। খুবজীপুরের প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে গুরুদাসপুর জিসিএমই স্কুল ও চাঁচকৈড় নাজিমুদ্দিন হাইস্কুলে পড়াশোনা করেন। ১৯৪৫ সালে তিনি গুরুদাসপুর অঞ্চলের প্রথম ম্যাট্রিকুলেশন উত্তীর্ণ শিক্ষার্থী হিসেবে কৃতিত্ব অর্জন করেন।
পরবর্তীতে রাজশাহী সরকারি কলেজ থেকে আইএসসি ও বিএসসি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়নশাস্ত্রে এমএসসি ডিগ্রি অর্জন করেন। মেধা ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে তিনি উচ্চশিক্ষায় বিশেষ কৃতিত্ব দেখান।
১৯৫৩ সালে শিক্ষকতার মাধ্যমে শুরু হয় তার কর্মজীবন। দেশের বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তিনি শিক্ষকতা করেছেন। পাবনা এডওয়ার্ড কলেজ, কারমাইকেল কলেজ, মাইকেল মধুসূদন কলেজ, বগুড়া সরকারি আজিজুল হক কলেজসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে তিনি দায়িত্ব পালন করেন।
তিনি ছিলেন শুধু একজন শিক্ষক নন, একজন শিক্ষানুরাগী নির্মাতা। যে প্রতিষ্ঠানে গেছেন, সেখানেই পরিবর্তনের ছাপ রেখে গেছেন। তার কাছে শিক্ষকতা ছিল শুধু পেশা নয়, মানুষের জীবন গড়ার এক মহান দায়িত্ব।
সাহিত্য, সাংবাদিকতা ও গবেষণায় অবদান
অধ্যক্ষ এম এ হামিদের কলম ছিল সমাজ পরিবর্তনের অন্যতম হাতিয়ার। তিনি ছিলেন একজন বিশিষ্ট লেখক, গবেষক ও সাংবাদিক। তার রচিত গ্রন্থের সংখ্যা ২৬টি।
তার অমর সৃষ্টি ‘চলনবিলের ইতিকথা’ একটি ঐতিহাসিক গবেষণাগ্রন্থ, যা একটি অঞ্চলের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও মানুষের জীবনকে ধারণ করেছে। দীর্ঘ গবেষণা ও তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে তিনি এই গ্রন্থ রচনা করেন। আজও এটি গবেষক ও পাঠকদের কাছে মূল্যবান সম্পদ।
এছাড়া তিনি লিখেছেন বিজ্ঞান, ভ্রমণ, ইতিহাস, সমাজ ও সংস্কৃতিভিত্তিক নানা গ্রন্থ। রসায়ন শিক্ষাকে সহজ করার জন্য লিখেছেন ‘রসায়নের তেলেসমাতি’। শিশুদের জন্য লিখেছেন জ্ঞান ও শিক্ষামূলক বই।
সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও তার অবদান ছিল স্মরণীয়। তার পৃষ্ঠপোষকতায় ১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘চলনবিল প্রেসক্লাব’। তিনি বিভিন্ন পত্রিকা ও সাহিত্য প্রকাশনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং তরুণ লেখক ও সাংবাদিকদের উৎসাহিত করেছেন।
বাংলা সন সংস্কারে ঐতিহাসিক ভূমিকা
বাংলা সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতি তার ভালোবাসার এক উজ্জ্বল উদাহরণ হলো বাংলা সন সংস্কারে তার অবদান। বাংলা মাসের দিনসংখ্যা নির্ধারণ ও ক্যালেন্ডার ব্যবস্থাকে সহজ করার লক্ষ্যে তিনি ১৯৫৯ সালে বাংলা একাডেমিতে একটি প্রস্তাব উপস্থাপন করেন। দীর্ঘ আলোচনা ও গবেষণার পর তার প্রস্তাব গৃহীত হয়।
বর্তমানে বাংলা সনের যে আধুনিক হিসাব প্রচলিত আছে, তার পেছনে অধ্যক্ষ এম এ হামিদের চিন্তা ও গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এটি তার দূরদর্শী চিন্তার এক ঐতিহাসিক স্বাক্ষর।
চলনবিলের উন্নয়নে এক নিবেদিত প্রাণ
অধ্যক্ষ এম এ হামিদের হৃদয়ে সবসময় ছিল চলনবিলের মানুষের জন্য গভীর ভালোবাসা। তিনি বিশ্বাস করতেন, শিক্ষা ছাড়া কোনো সমাজের প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়।
এই বিশ্বাস থেকেই তিনি একের পর এক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। খুবজীপুর হাই স্কুল, খুবজীপুর মোজাম্মেল হক কলেজ, বিলচলন ড. শহীদ শামসুজ্জোহা কলেজসহ বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠায় তার ভূমিকা রয়েছে।
চলনবিলের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের জন্য তার উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় চলনবিল জাদুঘর, যা পরবর্তীতে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আওতায় আসে। তার স্বপ্ন ছিল একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ চলনবিল। তিনি চলনবিল জেলা গঠনের পরিকল্পনাও করেছিলেন। যদিও তার সেই স্বপ্ন এখনো বাস্তবায়িত হয়নি, তবে তার চিন্তা আজও মানুষের মনে বেঁচে আছে।
একজন মানুষ, একটি আদর্শ
ব্যক্তিজীবনে অধ্যক্ষ এম এ হামিদ ছিলেন অত্যন্ত সাদামাটা, বিনয়ী ও মানবিক। বড় পদে থেকেও তিনি কখনো সাধারণ মানুষ থেকে দূরে সরে যাননি। মানুষের সঙ্গে সহজভাবে মিশতেন, দরিদ্র শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়াতেন এবং নীরবে সমাজের জন্য কাজ করে যেতেন।
তিনি বিশ্বাস করতেন মানুষের জীবনের প্রকৃত সার্থকতা নিজের জন্য নয়, অন্যের জন্য কিছু করার মধ্যে। তার কর্ম ও অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি বহু পুরস্কার ও সম্মাননা লাভ করেছেন। তবে তার সবচেয়ে বড় অর্জন ছিল মানুষের ভালোবাসা।
অধ্যক্ষ এম এ হামিদ ছিলেন চলনবিলের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তিনি দেখিয়ে গেছেন, একজন মানুষ যদি জ্ঞান, সততা ও মানবিকতা নিয়ে এগিয়ে যান, তবে একটি পুরো জনপদের ভাগ্য পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখা সম্ভব।
চলনবিল তাকে মনে রাখবে, একজন শিক্ষাবিদ হিসেবে, একজন গবেষক হিসেবে, একজন স্বপ্নদ্রষ্টা হিসেবে এবং সর্বোপর।